কেন্দ্রের যুক্তি, সন্ত্রাস মোকাবিলায় প্রাদেশিক প্রশাসন ব্যর্থ। পিটিআই বলছে, নিরাপত্তার অজুহাতে বিরোধীদের শেষ প্রাদেশিক সরকারটিও কেড়ে নেওয়া হলো। ফলে সংকট এখন একজন নেতার মুক্তির দাবিতে সীমাবদ্ধ নেই।
প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের পরামর্শে প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারি এই সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেন। সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী, সংবিধানের ২৩২ ও ২৩৪ অনুচ্ছেদ প্রয়োগ করে মুখ্যমন্ত্রী, মন্ত্রিসভা ও উপদেষ্টাদের ক্ষমতা গভর্নরের হাতে দেওয়া হয়েছে। তার অধীনে কাজ করবে ১১ সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদ।
আইনমন্ত্রী আজম নাজির তারার জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে এই ব্যবস্থা ছয় মাস থাকবে। সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। নির্বাচিত প্রাদেশিক নেতৃত্বের জায়গায় কেন্দ্রনিয়ন্ত্রিত প্রশাসন বসানোই এই পদক্ষেপের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক তাৎপর্য।
বিক্ষোভের প্রথম কারণ ইমরানের দীর্ঘ কারাবাস। ২০২৩ সাল থেকে বন্দী সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে মুক্তি এবং তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ চাইছে পিটিআই। দলটির দাবি, তাঁকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আটকে রাখা হয়েছে। তবে আন্দোলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সীমান্তাঞ্চলে সামরিক অভিযান। মুখ্যমন্ত্রী সোহাইল আফ্রিদির নেতৃত্বে পদযাত্রায় অভিযানের কারণে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ও সম্পদ নষ্ট হওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে। অর্থাৎ দলীয় নেতার মুক্তির সঙ্গে স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তা ও জীবনযাপনের উদ্বেগ যুক্ত হয়েছে।
এই বিরোধ হঠাৎ তৈরি হয়নি। সন্ত্রাস দমন ও আফগানিস্তাননীতি নিয়ে কেন্দ্রের সঙ্গে আফ্রিদির মতপার্থক্য আগে থেকেই ছিল। অক্টোবরের শুরুতে আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর ৪ অক্টোবর পদযাত্রা শুরু হয়। ডনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কর্মসূচি বিভিন্ন জেলা ঘুরলেও জরুরি অবস্থা জারির আগপর্যন্ত খাইবার পাখতুনখাওয়ার মধ্যেই ছিল। আফ্রিদি সামরিক অভিযানসংক্রান্ত সিদ্ধান্তে চাপের মুখে সম্মতি না দেওয়ার কথাও বলেছেন। ফলে নিরাপত্তানীতি এবং রাজনৈতিক দাবির বিরোধ একই সময়ে তীব্র হয়েছে।
কেন্দ্রীয় সরকার বলছে, ইমরানের মুক্তির আন্দোলনে মনোযোগ দিতে গিয়ে প্রাদেশিক নেতৃত্ব সন্ত্রাস মোকাবিলার দায়িত্ব অবহেলা করেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভির অভিযোগ, সিদ্ধান্তে বিলম্ব ও দুর্বল সমন্বয়ে জঙ্গিরা সুবিধা পেয়েছে। পিটিআই এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, প্রয়োজনীয় অর্থ ও সরঞ্জাম দেয়নি ইসলামাবাদ। আফগান সীমান্তবর্তী এই প্রদেশের নিরাপত্তাসংকট বাস্তব হলেও দায় কার, তা নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য পরস্পরবিরোধী। কোনো পক্ষের অভিযোগকেই স্বাধীন যাচাই ছাড়া প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে নেওয়া যায় না।
রকারের ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্নও রয়েছে। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে ইসলামাবাদভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সিআরএসএসের হিসাবে, ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে প্রদেশটিতে বেসামরিক মানুষ ও নিরাপত্তাকর্মীর নিহত হওয়ার সংখ্যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬ শতাংশ কমেছে। তবে ‘পরিস্থিতির অবনতি’ বোঝাতে সরকার কোন সময়সীমা ও সূচক ব্যবহার করছে, তার পরিষ্কার ব্যাখ্যা প্রয়োজন। প্রাণহানি কমা এবং হামলার সংখ্যা বাড়া একই সঙ্গে সম্ভব।
দমনমূলক ব্যবস্থায় আপাতত পদযাত্রার সংগঠন দুর্বল হয়েছে। এক্সপ্রেস ট্রিবিউন জানিয়েছে, সোয়াবিতে ৫৯ এবং খাইবার জেলায় ছয় পিটিআই কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সোয়াবিতে মোবাইল ও ইন্টারনেট সেবা বন্ধ এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়কে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়। সাবেক মুখ্যমন্ত্রী আলী আমিন গান্ডাপুর গৃহবন্দী থাকার দাবি করেছেন। রয়টার্সের হিসাবে, পদযাত্রার আগে শত শত কর্মী ও ইমরানের তিন বোনকে আটক করা হয়েছে। এসব ঘটনায় নেতৃত্ব, যোগাযোগ ও কর্মী সমাবেশ—তিন ক্ষেত্রেই বাধা তৈরি হয়েছে।
আফ্রিদির অবস্থান নিয়েও অনিশ্চয়তা আছে। তাঁকে গ্রেপ্তার করা হযেছে বলে দাবি করেছে তাঁর দল। জুনায়েদ আকবরের সামাজিক মাধ্যমের বক্তব্যেও একই দাবি রয়েছে। তবে সরকারি নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি; রয়টার্সকে আফ্রিদির এক সহযোগী বলেছেন, তাঁর চলাচলে বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছে। ‘গ্রেপ্তার’, ‘গৃহবন্দী’ ও ‘অবস্থান অজানা’ একই অবস্থা নয়। বিষয়টি স্পষ্ট না হলে নেতৃত্বের নির্দেশ এবং আন্দোলনের পরবর্তী গতিপথও অনিশ্চিত থাকবে।
জরুরি অবস্থার তাৎক্ষণিক ফল পিটিআইয়ের প্রশাসনিক ভিত্তি হারানো। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে নির্বাচিত প্রাদেশিক সরকার অপসারণ কেন্দ্রের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়াতে পারে। সন্ত্রাস দমনে স্থানীয় সহযোগিতা প্রয়োজন; রাজনৈতিক অবিশ্বাস বাড়লে সেই সহযোগিতা পাওয়াও কঠিন হতে পারে। গভর্নর শাসন তাই কেন্দ্রকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ দিলেও নিরাপত্তা সমস্যার সমাধান নিশ্চিত করে না। এখন প্রশাসন চালানো এবং মানুষের আস্থা ফেরানো—দুই দায়িত্বই কেন্দ্রের।
দেশজুড়ে আন্দোলন ছড়ানোর সিদ্ধান্তেও সতর্কতা দরকার। বিরোধী অন্য দলগুলোও গভর্নর শাসনের বিরোধিতা করেছে, যা পিটিআইকে বৃহত্তর সমর্থন দিতে পারে। কিন্তু সোয়াবিতে বড় জমায়েত না হওয়ার খবর দেখায়, ঘোষণা আর মাঠের শক্তি এক নয়। স্থানীয় বিক্ষোভ থাকলেও সমন্বিত জাতীয় আন্দোলনের প্রমাণ এখনো সীমিত।
অর্থনৈতিক প্রভাবও উপেক্ষার নয়। ইসলামাবাদের সড়কে কনটেইনার বসানোয় যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে; দীর্ঘ সংঘাত ব্যবসা ও সরবরাহে চাপ বাড়াতে পারে। সরকারের নিয়ন্ত্রণ বেড়েছে, সংকট মিটেছে বলা যাচ্ছে না। পরবর্তী পরিস্থিতি নির্ভর করবে আলোচনা ফেরে কি না, আটক ব্যক্তিদের বিষয়ে স্বচ্ছতা আসে কি না এবং নিরাপত্তার সঙ্গে রাজনৈতিক অধিকার রক্ষার ভারসাম্য রাখা হয় কি না।