শনিবার (৯ অক্টোবর) গভীর রাত থেকে রবিবার ভোরের এসব ঘটনায় দগ্ধদের জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নেওয়া হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক আবদুল্লাহ আল আরেফিনের দেওয়া প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, কাঁচপুরে সিলিন্ডার এবং দেওভোগে তিতাসের পাইপলাইনের লিকেজ ছিল। ফতুল্লার গুদামে রাসায়নিক গ্যাস জমেছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গত ১০ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত ফায়ার সার্ভিসের তথ্যে সিলিন্ডারের লিকেজ থেকে ৯২০টি অগ্নিকাণ্ড এবং ‘গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ’ শ্রেণিতে ১২১টি অগ্নিকাণ্ড নথিভুক্ত হয়েছে। পাইপলাইনের লিকেজ থেকে আগুন লেগেছে আরও ৫৬২টি ঘটনায়। আবার এই পরিসংখ্যান বাজারে থাকা কত শতাংশ সিলিন্ডার অনিরাপদ, সেটিও জানায় না।
লিকেজজনিত আগুন অবশ্য বাড়ছে। ২০২৪ সালে সিলিন্ডারের লিকেজ থেকে অগ্নিকাণ্ড ছিল ৭০৪টি; ২০২৫ সালে তা বেড়ে ৯২০টি হয়েছে। এ জাতীয় ঘটনা বেড়েছে প্রায় ৩১ শতাংশ। একই সময়ে পাইপলাইনের লিকেজজনিত আগুন ৪৬৫ থেকে ৫৬২টিতে পৌঁছেছে। অর্থাৎ ঝুঁকি শুধু বোতলজাত গ্যাসে সীমাবদ্ধ নয়।
পুরোনো পাইপলাইন, সংযোগের ত্রুটি এবং বদ্ধ ঘরে গ্যাস জমার বিষয়ও নিরাপত্তার আলোচনায় রাখতে হবে। তবে ব্যবহারকারী ও সিলিন্ডারের সংখ্যা কতটা বেড়েছে, তা ছাড়া ব্যক্তিপ্রতি ঝুঁকির পরিবর্তন নির্ণয় করা যাবে না।
২০২৫ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণাতেও গ্যাস লিকেজ, অপর্যাপ্ত বায়ু চলাচল এবং ত্রুটিযুক্ত সরঞ্জামকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষকেরা ২০১৪ থেকে ২০২৩ সালের ঢাকার দুর্ঘটনার সংবাদভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। এটি দেশের সব সিলিন্ডার পরীক্ষা করে তৈরি জরিপ নয়; সংবাদে আসা ঘটনার ভৌগোলিক বিশ্লেষণ। তাই গবেষণার ফল থেকে সারা দেশে কতটি সিলিন্ডার মেয়াদোত্তীর্ণ বা মানহীন, সেই সংখ্যা দাবি করার সুযোগ নেই।
তাহলে দেশে ব্যবহৃত সিলিন্ডার কি নিরাপদ? গত ১৭ মে বিইআরসিতে আয়োজিত আলোচনায় বুয়েটের রাসায়নিক প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ইয়াসির আরাফাত খান বলেন, সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা হলে এলপিজি নিরাপদ জ্বালানি। তার ব্যাখ্যায়, গ্যাস বেরিয়ে জমে যাওয়ার পর আগুনের উৎসের সংস্পর্শ দুর্ঘটনার বড় কারণ। তিনি ব্যবহারকারী থেকে বিক্রেতা পর্যন্ত প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। অর্থাৎ নিরাপত্তা সিলিন্ডারের ধাতব পাত্রের মানের পাশাপাশি ভালভ, রেগুলেটর, সংযোগ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ব্যবহারের পরিবেশের ওপরও নির্ভর করে।
সরবরাহব্যবস্থার আরেকটি ঝুঁকি অবৈধভাবে গ্যাস ভরা। এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক অনুমোদিত কারখানার বাইরে ‘ক্রসফিলিং’ বন্ধের ওপর জোর দেন। এক সিলিন্ডার থেকে অন্যটিতে গ্যাস স্থানান্তরের এই প্রক্রিয়ায় নিরাপত্তার নিয়ম মানা হয় না বলে তাঁর অভিযোগ।
প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞরা অনভিজ্ঞ কর্মী দিয়ে সংযোগ দেওয়া এবং নিম্নমানের পাইপ ও রেগুলেটর ব্যবহারের ঝুঁকিও তুলে ধরেন। ফলে গ্রাহকের হাতে সিলিন্ডার পৌঁছানোর আগের সরবরাহ ও স্থাপনের ধাপগুলোও দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপত্তা যাচাইয়ে এগুলো বাদ দিলে সমস্যার চিত্র পাওয়া যাবে না।
মেয়াদ নিয়ে তাই শুধু উৎপাদনের বছর দেখলেই বিচার সম্পূর্ণ হয় না। নির্ধারিত সময়ে পুনঃপরীক্ষা হয়েছে কি না, তার রেকর্ডও গুরুত্বপূর্ণ। পরীক্ষার সময় পেরিয়ে যাওয়া আর সিলিন্ডারের সম্পূর্ণ ব্যবহারকাল শেষ হওয়া এক বিষয় নয়। তবে পরীক্ষা বাকি থাকা অবস্থায় সেটিকে নিরাপদ ধরে ব্যবহার করা চলে না।
অন্যদিকে দৃশ্যমান ক্ষয়, ক্ষতিগ্রস্ত ভালভ বা অজানা পরীক্ষার ইতিহাসও উপেক্ষার সুযোগ নেই। এই প্রতিবেদনের জন্য পর্যালোচনা করা সাম্প্রতিক উন্মুক্ত নথিতে বাজারের এলপিজি সিলিন্ডারের মেয়াদ ও পরীক্ষার অবস্থা নিয়ে জাতীয় প্রতিনিধিত্বশীল জরিপ পাওয়া যায়নি।
পরীক্ষার ঘাটতি যে বাস্তব সমস্যা, তার সাম্প্রতিক উদাহরণ আশুলিয়ার প্রিটি গ্রুপের কারখানা দুর্ঘটনার তদন্ত। শনিবার জেলা প্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্যে নির্ধারিত সময়ে পুনঃপরীক্ষা না করা, ত্রুটিপূর্ণ সিলিন্ডার ও ভালভ এবং অননুমোদিত পরিবহনের বিষয় এসেছে। কমিটি কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও সরকারি দপ্তরের দায়িত্ব পালনে শৈথিল্যও চিহ্নিত করেছে। তবে সেখানে মূল আলোচ্য উচ্চচাপের সিএনজি সিলিন্ডার; এ ফল দিয়ে রান্নার এলপিজি সিলিন্ডারের জাতীয় নিরাপত্তা বিচার করা যাবে না।
কর্তৃপক্ষও নজরদারির সীমাবদ্ধতা স্বীকার করেছে। ১৭ মের একই আলোচনায় বিস্ফোরক পরিদপ্তরের সহকারী পরিদর্শক মুহাম্মদ মেহেদী ইসলাম খান বলেন, সীমিত জনবল দিয়ে দেশজুড়ে গ্যাস ও দাহ্য পদার্থের কার্যক্রম তদারকি কঠিন। বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ নিরাপত্তা নিয়ে জাতীয় প্রচার ও প্রশিক্ষণের কথা বলেন। এসব বক্তব্যে বোঝা যায়, গ্রাহকের সচেতনতা বাড়ানোর সঙ্গে সরবরাহকারী, পরিবহনকারী ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায়িত্ব যাচাইও প্রয়োজন।
আশুলিয়ার তদন্ত কমিটি ক্ষতিগ্রস্ত, ক্ষয়প্রাপ্ত, মেয়াদ শেষ কিংবা পরীক্ষার ইতিহাস নেই—এমন সিলিন্ডার বাতিল এবং নিয়মিত যৌথ পরিদর্শনের সুপারিশ করেছে। এলপিজির ক্ষেত্রেও কোন সিলিন্ডার কবে পরীক্ষা হয়েছে, ত্রুটি পাওয়া কতটি বাজার থেকে সরানো হয়েছে এবং অবৈধভাবে গ্যাস ভরা বন্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—এসব তথ্য প্রকাশ করলে তদারকি মূল্যায়ন সহজ হবে। নারায়ণগঞ্জের ঘটনাগুলোর দায় নির্ধারণে তদন্ত প্রয়োজন; কিন্তু প্রতিরোধের আলোচনা শুধু ‘অসাবধানতা’য় আটকে রাখলে নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি অদৃশ্যই থেকে যাবে।