বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ১৫ বছরের মধ্যে প্রথমবার এটি ৭ শতাংশের নিচে নেমেছে। অথচ উন্নয়ন ও মৌলিক সরকারি সেবা চালাতে একটি অর্থনীতির জন্য অন্তত ১৫ শতাংশ কর-জিডিপি অনুপাত প্রয়োজন বলে বিশ্বব্যাংক উল্লেখ করেছে।
এর অর্থ শুধু সরকার কর তুলতে পারছে না, তা নয়। বড় সমস্যাটি হলো—দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি বিশাল অংশ এমন জায়গায় সংঘটিত হচ্ছে, যার একটি বড় অংশ রাষ্ট্রের করব্যবস্থার পূর্ণ নজরদারির মধ্যে নেই।
বিশ্বব্যাংকের শ্রমবাজারবিষয়ক তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি জিডিপির প্রায় ৪৩ শতাংশ তৈরি করে এবং মোট কর্মসংস্থানের ৮৫ শতাংশের সঙ্গে যুক্ত। ছোট দোকান, হকার, পরিবহন, গৃহভিত্তিক ব্যবসা, ক্ষুদ্র উৎপাদন, নির্মাণশ্রম, বিভিন্ন ধরনের সেবা ও অঘোষিত ব্যবসার বিশাল অংশ এই অর্থনীতির মধ্যে পড়ে।
তবে শুধু অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির আকার দিয়েই বাংলাদেশের কম রাজস্বের পুরো ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বলছে, দেশের রাজস্ব আহরণ দীর্ঘদিন ধরে একটি সংকীর্ণ করভিত্তি, ব্যাপক কর-ছাড়, কম কর-অনুগত্য এবং কর প্রশাসনের কাঠামোগত দুর্বলতায় আটকে আছে। একই সঙ্গে রাজস্ব ব্যবস্থায় পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরতা বেশি।
২০২৫ অর্থবছরে কর আদায় জিডিপির ৭ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ৬ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে যাওয়ার পেছনে দুর্বল কর-অনুগত্য, ডিজিটালাইজেশনের ঘাটতি ও প্রশাসনিক সক্ষমতার সমস্যার কথাও বলেছে সংস্থাটি।
এখানে বাংলাদেশের রাজস্ব সমস্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসে। অর্থনীতি দুই ভাগে চলছে—একদিকে নিবন্ধিত ও দৃশ্যমান অর্থনীতি, যেখানে কর, ভ্যাট, আয়কর ও আমদানিশুল্ক আদায়ের ব্যবস্থা আছে; অন্যদিকে বিশাল অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি, যেখানে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ লেনদেন হলেও তার সবটুকু কর কাঠামোর মধ্যে আসে না।
ফলে রাষ্ট্র যখন রাজস্ব বাড়াতে চায়, তখন তুলনামূলকভাবে সহজে শনাক্ত করা যায় এমন ব্যবসায়ী ও চাকরিজীবীদের ওপর চাপ বাড়ে। এতে করদাতার সংখ্যা বাড়ার বদলে একই করদাতার ওপর করের বোঝা আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠার ঝুঁকি থাকে।
কিন্তু আরও অস্বস্তিকর প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রের করজালের বাইরে থাকা অর্থের একটি অংশ কোথায় যায়। অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির প্রতিটি টাকা দুর্নীতির টাকা নয়; বরং এর বড় অংশ বৈধ জীবিকা ও ব্যবসার অর্থ। সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন এই অর্থের একটি অংশ কর এড়িয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ঘুষ, চাঁদাবাজি, অবৈধ সুবিধা, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা বা ক্ষমতাসংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বণ্টিত হতে থাকে।
২০২৬ সালের জাতীয় খানা জরিপে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ জানিয়েছে, ২০২৫ সালে সরকারি সেবা নিতে গিয়ে দেশের ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবার কোনো না কোনো দুর্নীতির অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে এবং ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবার ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছে। জরিপের হিসাবে ওই বছর দেশজুড়ে ঘুষ লেনদেনের আনুমানিক মূল্য ছিল ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা, যা জিডিপির ০ দশমিক ২৩ শতাংশের সমান।
এই অর্থ সরাসরি রাষ্ট্রের রাজস্বে যায় না। বরং সরকারি সেবা পেতে নাগরিকের যে অতিরিক্ত ব্যয় হয়, তা অর্থনীতির ভিন্ন এক স্তরে চলে যায়। আরও বড় প্রশ্ন হলো, ঘুষের বাইরে রাজনৈতিক প্রভাব, চাঁদাবাজি ও ব্যবসার ওপর অনানুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কত অর্থ বণ্টিত হয় এবং এর কতটা শেষ পর্যন্ত করযোগ্য আয় হিসেবে আর ফিরে আসে না।
সরকারি ক্রয় ব্যবস্থার গবেষণাতেও রাজনৈতিক প্রভাব ও ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কের সঙ্গে বাজার নিয়ন্ত্রণের সম্পর্কের কথা এসেছে। টিআইবির ২০২৫ সালের ই-জিপি গবেষণায় দেখা যায়, শীর্ষ ৫ শতাংশ ঠিকাদার প্রায় ৩০ শতাংশ ই-চুক্তি নিয়ন্ত্রণ করছে। একই গবেষণায় আমলাতন্ত্র, ঠিকাদার ও রাজনৈতিক শক্তির পারস্পরিক প্রভাবের মাধ্যমে সরকারি ক্রয়বাজারে বাজার দখলের ঝুঁকি তুলে ধরা হয়েছে।
এখানে রাজস্বের সঙ্গে দুর্নীতির সম্পর্কটি সরাসরি বুঝতে হবে। কোনো ব্যবসা যদি রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবের কারণে সুবিধা পায়, কর ফাঁকি দিতে পারে, সরকারি কাজ পেতে পারে, লাইসেন্স বা অনুমোদন দ্রুত পায় অথবা প্রতিযোগিতা এড়িয়ে বাজার দখল করতে পারে, তাহলে শুধু একটি সরকারি রাজস্ব হারায় না। একই সঙ্গে সৎ ও নিয়ম মেনে চলা ব্যবসা পিছিয়ে পড়ে। অর্থাৎ কর না দেওয়া তখন শুধু রাজস্ব ক্ষতি নয়, বাজারের প্রতিযোগিতাকেও দুর্বল করে।
অন্যদিকে রাজস্ব কম থাকলে সরকার জনগণের ওপর আরও পরোক্ষ কর চাপাতে বাধ্য হয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাবে বাংলাদেশের রাজস্ব কাঠামোয় পরোক্ষ করের ভূমিকা এখনও বড়। এর অর্থ হলো আয় বা সম্পদের ওপর সরাসরি করের পরিবর্তে ভোক্তার কেনাকাটা, পণ্য ও সেবার ওপর কর সংগ্রহ করা তুলনামূলকভাবে সহজ। ফলে কর ফাঁকি দেওয়া বড় ব্যবসা বা অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির একটি অংশের পরিবর্তে শেষ পর্যন্ত ভোগের সময় সাধারণ মানুষ কর দিয়ে যায়।
এই ব্যবস্থায় তৈরি হয় একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য। দেশে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ে, কিন্তু সরকারের আয় সেই গতিতে বাড়ে না। যারা কর দেন, তাদের ওপর চাপ বাড়ে; যারা অর্থনীতির বড় অংশ অনানুষ্ঠানিকভাবে পরিচালনা করেন, তাদের একটি অংশ করের আওতার বাইরে থেকে যায়; আর প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে সরকারি সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রেও ঘুষ দিতে হয়। ফলে জনগণ একই অর্থনীতিতে তিনবার মূল্য দেয়—পণ্য ও সেবার ওপর কর দিয়ে, ঘুষ দিয়ে এবং দুর্বল সরকারি সেবার ক্ষতি বহন করে।
বাংলাদেশের রাজস্ব সংকট তাই শুধু করের হার কম বা বেশি হওয়ার প্রশ্ন নয়। মূল সংকট হলো রাষ্ট্র কতটা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে শনাক্ত করতে পারছে, কতটা করের আওতায় আনতে পারছে এবং করযোগ্য অর্থের কতটা পথেই হারিয়ে যাচ্ছে। সেই হারানো অর্থের একটি অংশ যদি কর ফাঁকি, ঘুষ, চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা কিংবা প্রভাবশালী ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কের মধ্যে আটকে যায়, তাহলে রাজস্ব কম থাকার সমস্যা আসলে অর্থনীতির কাঠামোগত সমস্যায় পরিণত হয়।
এই কারণেই বাংলাদেশের রাজস্ব বাড়ানোর আলোচনায় শুধু নতুন কর আরোপের কথা বললে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিকে ধীরে ধীরে করজালের মধ্যে আনা, কর প্রশাসনকে ডিজিটাল করা, কর-ছাড় পুনর্মূল্যায়ন করা, বড় ব্যবসা ও উচ্চ আয়ের করদাতার প্রকৃত আয় শনাক্ত করা এবং ঘুষ ও রাজনৈতিক প্রভাবের অর্থনৈতিক মূল্য পরিমাপ করা।