১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত বিএনপির রাজনীতিতে এরই মধ্যে তিন প্রজন্মের নেতৃত্ব দেখা গেছে। প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের পর দলের হাল ধরেন তার স্ত্রী খালেদা জিয়া। তার নেতৃত্বে বিএনপি দুই দফা রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে। বর্তমানে দলের নেতৃত্বে রয়েছেন তারেক রহমান। তার নেতৃত্বে বিএনপি তৃতীয় প্রজন্মের রাজনৈতিক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।
প্রায় অর্ধশতাব্দীর এই পথচলায় বিএনপির সঙ্গে থাকা অনেক পুরোনো নেতা দল ছেড়েছেন, আবার নতুন নেতৃত্বও যুক্ত হয়েছে। সময়ের সঙ্গে দলের রাজনৈতিক কৌশল ও কর্মসূচিতে পরিবর্তন এলেও, টিকে থাকার প্রশ্নে বিএনপির অন্যতম শক্তি হিসেবে উঠে আসে জনগণকেন্দ্রিক রাজনীতি।
বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দলটি কখনোই দীর্ঘ সময় একই রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে থাকেনি। প্রতিষ্ঠার পরপরই ক্ষমতার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করে দলটি। এরপর নেতৃত্বের পরিবর্তন, সামরিক ও বেসামরিক রাজনৈতিক বাস্তবতা, গণআন্দোলন এবং নির্বাচনি রাজনীতির বিভিন্ন বাঁক পেরিয়ে বিএনপি নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, আওয়ামী লীগ বা জামায়াতের মতো শক্তিশালী সাংস্কৃতিক কিংবা বুদ্ধিবৃত্তিক রাজনৈতিক বয়ান বিএনপির নেই। সাংগঠনিক শক্তির ক্ষেত্রেও বিভিন্ন সময়ে দুর্বলতার অভিযোগ উঠেছে। তারপরও বিএনপির দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক উপস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে তারা দলটির জনগণের কাছে পৌঁছানোর সক্ষমতাকে দেখেন।
বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে উদার গণতান্ত্রিক মধ্যপন্থার একটি যোগসূত্র রয়েছে বলেও মনে করেন অনেকে। দলটির গঠনতন্ত্র, জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা, খালেদা জিয়ার ‘ভিশন ২০৩০’ এবং তারেক রহমানের ৩১ দফার মধ্যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার, জনগণের অংশগ্রহণ, জাতীয় ঐক্য ও গণতন্ত্রের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
বিএনপির রাজনৈতিক পরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হয়ে আসছে জিয়াউর রহমান ঘোষিত ১৯ দফা কর্মসূচি। ১৯ দফার মূল বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, জাতীয় ঐক্য, জনগণের অংশগ্রহণ, আত্মনির্ভরতা, কৃষি ও শিল্পের উন্নয়ন, মৌলিক চাহিদা পূরণ, শিক্ষা ও চিকিৎসার প্রসার, গ্রামীণ উন্নয়ন, প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ, দুর্নীতি দমন, মানবসম্পদ উন্নয়ন, শ্রমিকের অধিকার, ভূমি সংস্কার, নারী অধিকার ও যুবসমাজের ক্ষমতায়ন।
এ কর্মসূচিতে ধর্ম, বর্ণ ও মতাদর্শ নির্বিশেষে নাগরিক অধিকার সুরক্ষা এবং জাতীয় ঐক্য ও সংহতি জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। একই সঙ্গে কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা ও গ্রামীণ উন্নয়নকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে খালেদা জিয়ার ‘ভিশন ২০৩০’ এবং তারেক রহমানের ৩১ দফায় বিএনপির রাজনৈতিক ও রাষ্ট্র পরিচালনার পরিকল্পনায় নতুন বিষয় যুক্ত হয়েছে। দলটির নেতারা মনে করেন, সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে কর্মসূচিতে পরিবর্তন এলেও জনগণের অধিকার, গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জাতীয় স্বার্থের বিষয়গুলো মূল জায়গায় রয়েছে।
বিএনপির রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল গ্রামীণ অর্থনীতি ও উদীয়মান মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা। জিয়াউর রহমানের সময় কৃষি, গ্রামীণ উন্নয়ন ও বেসরকারি খাতকে গুরুত্ব দেয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কাঠামোয় পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয়া হয়।
এর ফলে গ্রামীণ অর্থনীতির পাশাপাশি শহরকেন্দ্রিক নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ ঘটেছে—এমন বিশ্লেষণও রয়েছে। এই শ্রেণির বিকাশ পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনেও প্রভাব ফেলে।
সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও জিয়াউর রহমানের সময় বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। চলচ্চিত্রসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা বাড়ানোর উদ্যোগও তার সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নব্বইয়ের দশকে বিএনপি আবারও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় এরশাদ সরকারের পতনের পর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিএনপি ক্ষমতায় আসে।
তবে নব্বইয়ের পর ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বিএনপির রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা নিয়ে ‘বিতর্ক’ তৈরি হয়। সমালোচকদের মতে, এতে দলটির উদার গণতান্ত্রিক অবস্থান প্রশ্নের মুখে পড়ে। অন্যদিকে বিএনপির নেতারা দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন, দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় জোটভিত্তিক রাজনীতি ছিল কৌশলগত প্রয়োজন।
বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসে আন্দোলন-সংগ্রাম একটি বড় অধ্যায়। ১৯৮০-এর দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলন, পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন এবং সর্বশেষ দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বিএনপি রাজপথে সক্রিয় ছিল।
দলটির নেতারা দাবি করেন, বিভিন্ন সময়ে বিএনপির অসংখ্য নেতাকর্মী মামলা, গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও দমন-পীড়নের শিকার হয়েছেন। তাদের মতে, দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও দলের নেতাকর্মীরা মাঠে থাকায় বিএনপি সাংগঠনিকভাবে টিকে থাকতে পেরেছে।
অন্যদিকে বিএনপির রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে সমালোচনাও কম হয়নি। ক্ষমতায় থাকার সময়ে প্রশাসন ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে আচরণ, জোট রাজনীতি এবং বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ফলে বিএনপির ইতিহাস কেবল সাফল্যের নয়; বিতর্ক ও সমালোচনারও।
বর্তমানে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা বিএনপির সামনে এখন নতুন বাস্তবতা। ক্ষমতার ছয় মাস অতিক্রম করলেও সরকারকে এখনো নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক সংস্কার, দুর্নীতি দমন এবং অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা—সবই সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
সরকারের কয়েকজন মন্ত্রীর বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড নিয়েও জনমনে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কেউ কেউ মনে করছেন। সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন থাকায় বিএনপিকে আরও সতর্কতার সঙ্গে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
বিএনপি নেতাদের ভাষ্য, দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা, ১৭ বছরের আওয়ামী লীগ সরকারের শাসন এবং পরবর্তী অন্তর্বর্তী সময়ের নানা সীমাবদ্ধতার পর তারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। ফলে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় জমে থাকা সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করা সহজ নয়।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতায় ফিরে আসা বিএনপির জন্য যেমন বড় রাজনৈতিক অর্জন, তেমনি এটি বড় দায়িত্বও। বিরোধীদলে থাকা অবস্থায় জনগণের কাছে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, সরকারে থেকে সেই প্রত্যাশা পূরণ করাই এখন বিএনপির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
বিএনপির ৪৮ বছরের ইতিহাসে ক্ষমতায় আসা ও ক্ষমতার বাইরে থাকার পাশাপাশি রয়েছে রাজনৈতিক অভিযোজনের দীর্ঘ ইতিহাস। সময়ের সঙ্গে নেতৃত্ব বদলেছে, কর্মসূচি বদলেছে, রাজনৈতিক মিত্র বদলেছে। কিন্তু দলটি টিকে রয়েছে।
এখন তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি কোন রাজনৈতিক দর্শন ও রাষ্ট্র পরিচালনার মডেল সামনে এগিয়ে নেয়, সেটিই হবে আগামী দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
দলটির প্রতিষ্ঠার সময় ঘোষিত ১৯ দফায় যেমন সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র, জাতীয় ঐক্য, আত্মনির্ভরতা, জনগণের অংশগ্রহণ ও সামাজিক ন্যায়বিচারের কথা বলা হয়েছিল, তেমনি বর্তমান নেতৃত্বও নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাষ্ট্র সংস্কার ও উন্নয়নের কথা বলছে।
৪৮ বছর আগে যে দলটি যাত্রা শুরু করেছিল, আজ সেটিই আবার রাষ্ট্রক্ষমতায়। ফলে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই মুহূর্তে বিএনপির সামনে অতীতের সাফল্য উদ্যাপনের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় দায়িত্ব, নিজের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব রাষ্ট্র পরিচালনায় রূপ দেয়া।
কারণ, বিরোধীদলে থেকে জনগণের আস্থা অর্জন এক ধরনের পরীক্ষা; আর ক্ষমতায় থেকে সেই আস্থা ধরে রাখা সম্পূর্ণ ভিন্ন পরীক্ষা। বিএনপির ৪৮ বছরের ইতিহাস এখন তাকে সেই দ্বিতীয় পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।