ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন শেখ হাসিনা। এরপর আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের বহু নেতা দেশ ছাড়েন। অনেকে কারাগারে, আবার কেউ আত্মগোপনে রয়েছেন। ফলে আকস্মিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দলটি নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক সংকটে পড়ে।
এর মধ্যেও ভার্চুয়াল মাধ্যমে নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন শেখ হাসিনা। গত জুলাইয়ে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার বিষয়ে সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিলেন তিনি। তার এ বক্তব্যে আওয়ামী লীগের মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে আশাবাদ তৈরি হলেও, ঘোষণার পর এখন পর্যন্ত দেশে ফেরার বাস্তব কোনো প্রস্তুতি দৃশ্যমান হয়নি।
ফেরার ঘোষণা, নেই দৃশ্যমান প্রস্তুতি
বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের একাধিক নীতিনির্ধারক নেতা জানিয়েছেন, নেতাকর্মীদের চাঙ্গা রাখা এবং দলের রাজনৈতিক অস্তিত্ব জানান দিতে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বার্তা দেওয়া হয়েছিল। তবে এখন দলীয় পর্যায়ে তাকে ঘিরে বড় ধরনের কোনো প্রস্তুতি নেই।
দলের একজন সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যের ভাষ্য, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা অনেকটাই তার নিজের সিদ্ধান্ত। কিন্তু মামলা, গ্রেপ্তার ও নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের দেশে ফেরার আগের নির্দেশনাও বাস্তবায়িত হয়নি। তার ভাষায়, ‘নেত্রী ফিরতে চান; কিন্তু এখন বিষয়টি শুধু তার চাওয়ার ওপর নির্ভর করছে না।’
দলের সম্পাদকমণ্ডলীর দুই নেতার একজন বলেন, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সঙ্গে কূটনৈতিক, আন্তর্জাতিক ও আইনি নানা বিষয় জড়িয়ে গেছে। অন্যজনের মতে, ডিসেম্বরের মধ্যে তিনি দেশে না ফিরলেও নেতাকর্মীদের মধ্যে তার ফেরার প্রত্যাশা ধরে রাখার চেষ্টা করবে দল।
ঢাকার চাওয়া, ভারতে থেকেও রাজনীতি নয়
শেখ হাসিনার ফেরার সম্ভাবনা কমে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সরকারের পক্ষ থেকে দিল্লিকে এমন বার্তা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে—ভারত চাইলে শেখ হাসিনাকে সেখানে রাখতে পারে, তবে ভারতীয় ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়া বা কোনো ধরনের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দেওয়া উচিত নয়।
ঢাকার আশঙ্কা, ভারতে অবস্থান করে শেখ হাসিনা নিয়মিত রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা কিংবা দলীয় কর্মকাণ্ডে নির্দেশনা দেওয়া অব্যাহত রাখলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় প্রভাব পড়তে পারে।
এ কারণে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আলোচনায় শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্রত্যর্পণ এখন ভারতের সিদ্ধান্তের ওপর
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকলেও শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর বিষয়টি এখন শুধু ঢাকার সিদ্ধান্তে নির্ধারিত হওয়ার সুযোগ নেই। তিনি ভারতের মাটিতে অবস্থান করায় ভারতের নিজস্ব আইনি প্রক্রিয়া, কূটনৈতিক বিবেচনা এবং দুই দেশের সম্পর্কের ওপর বিষয়টি নির্ভর করছে।
ফলে ডিসেম্বরের মতো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তাকে ভারত থেকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর কোনো নিশ্চয়তাও নেই।
আইনি চাপও বড় বাধা
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পথে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি আইনি জটিলতা। জুলাই-আগস্টের আন্দোলন ঘিরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার বিচার হয়েছে এবং একটি মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায়ও হয়েছে।
ফলে দেশে ফিরলে তাকে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে। এই পরিস্থিতিতে স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দুর্বল আওয়ামী লীগ, নিরাপত্তাঝুঁকিও বড় প্রশ্ন
৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বড় অংশ ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েছে। বহু নেতা কারাগারে, অনেকে বিদেশে বা আত্মগোপনে। মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরাও মামলা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।
এ অবস্থায় শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাকে ঘিরে বড় ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচি সংগঠিত করার সক্ষমতা আওয়ামী লীগের কতটা রয়েছে, সেটিও প্রশ্নের মুখে।
এর পাশাপাশি তার প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ, পাল্টা কর্মসূচি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কাও রয়েছে। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর তাকে ঘিরে যে জনক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, তা পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি বলেও মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
কট্টরপন্থীদের আশা ভিন্ন
তবে আওয়ামী লীগের একটি অংশ এখনো শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাবনা দেখছে। দলটির একজন কট্টরপন্থী সম্পাদক দাবি করেন, তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বাড়লে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার রাজনৈতিক ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে বলেও মনে করেন তিনি।
তবে দলটির এই অংশের রাজনৈতিক হিসাব ডিসেম্বরের মধ্যে বাস্তবে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্লেষকদের চোখে ডিসেম্বরের সম্ভাবনা ক্ষীণ
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, ডিসেম্বরের মধ্যে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাবনা নেই। তার মতে, শেখ হাসিনা বিদেশে অবস্থান করেই বাকি জীবন কাটাতে চান—এমন বক্তব্যও এর আগে তার পরিবারের পক্ষ থেকে এসেছে। তাই ডিসেম্বরের মধ্যে ফেরার ঘোষণা বাস্তবায়িত হওয়ার সম্ভাবনা কম।
অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়টি এখন আর তার একক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে না। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক, দুই দেশের স্বার্থ, ভূরাজনীতি এবং ভারতের আইনি বিষয়ও এর সঙ্গে যুক্ত।
তার মতে, ডিসেম্বর খুব বেশি দূরে নয়। কিন্তু এই স্বল্প সময়ের মধ্যে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার কোনো দৃশ্যমান আলামত এখনো দেখা যাচ্ছে না।
সব মিলিয়ে, ডিসেম্বরের মধ্যে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা এখনো রাজনৈতিকভাবে আলোচনায় থাকলেও বাস্তব পরিস্থিতি বলছে, তার প্রত্যাবর্তনের পথ এখনো আইনি, কূটনৈতিক, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত নানা জটিলতায় আটকে আছে।