গত ৭ জুলাই থেকে রাঙামাটি টানা বর্ষণে ও উজানের ঢলের পানিতে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি, বিলাইছড়ি, বরকলসহ জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়| বিভিন্ন নদীর পানি বৃদ্ধিসহ উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে এই বন্যার সৃষ্টি হয়| বন্যার পানি কমে আসার পর স্পষ্ট হচ্ছে ক্ষয়ক্ষতি চিত্র |
জেলা প্রশাসন ও জেলার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের রিপোর্ট অনুযায়ী, রাঙামাটি জেলায় এবারের বন্যায় আনুমানিক মোট ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক লক্ষ আট হাজার ৭১৭ জন| জেলার মধ্যে বন্যার সবচেয়ে বেশি প্রকোপ দেখা গেছে বাঘাইছড়ি ও বিলাইছড়ি উপজেলায়| এর মধ্যে বাঘাইছড়ি উপজেলার তিনটি ইউনিয়ন এবং বিলাইছড়ি উপজেলার ফারুয়া ইউনিয়ন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে| একই সঙ্গে ভয়াবহ ভূমিধসের কারণে বহু গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাঘাট আংশিক ও সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে জেলা সদরের সাথে আন্তঃজেলা উপজেলার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এখনও অনেক জায়গায় |
জেলার ১০টি উপজেলায় প্রাথমিকভাবে ৩ হাজার ৬৭৫ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হয়েছে বলে জানান মোঃ মনিরুজ্জামান, উপ পরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, রাঙামাটি|
প্রাকৃতিক এই দুর্যোগে জেলার ১০ উপজেলার ২৬টি ইউনিয়নের হাজারো প্রান্তিক খামারি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, পশুখাদ্য ও চারণভূমির ক্ষয়ক্ষতিসহ প্রাণিসম্পদ খাতে মোট ১ কোটি ৫৪ লাখ ৪২ হাজার টাকা ক্ষতির হিসাব করেছে জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম প্রতিবেদককে তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন,"ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের তালিকা প্রস্তুত করে জেলা প্রশাসন ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। মাঠপর্যায়ে ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম টিকাদান, চিকিৎসাসেবা ও জরুরি সহায়তা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।"
এছাড়া সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সবুজ চাকমা জানান, সড়ক ও জনপথ বিভাগ রাঙামাটির আওতাধীন সড়কের ২৬টি স্থানে প্রায় আড়াই কিলোমিটার সড়ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে| প্রাথমিক হিসাবে সড়ক বিভাগের ক্ষতি প্রায় ৯ কোটি টাকা|
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্মিত ৫০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে সংলিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেন। প্রাণিসম্পদ খাতে ক্ষতি হয়েছে দেড় কোটি টাকা | মৎস্যখাতে ক্ষতি হয়েছে তিন কোটি টাকা|
এ বিষয়ে রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা দিতে কাজ করছে প্রশাসন| আমরা বন্যা উত্তর ক্ষয়-ক্ষতি সেক্টর ওয়ারী প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে নিরুপন করে তাদেরকে সাধ্যমত সহযোগিতার একান্তভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আশা রাখি সরকারের সহযোগিতায় আবারো ঘুরে দাঁড়াবে বানভাসী এবং পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষরা এমনটাই প্রত্যাশা করছি।
উল্লেখ্য যে, উপজেলাভিত্তিক হিসেবে রাঙামাটি সদরের ৩টি, নানিয়ারচরের ৪টি, লংগদুর ২টি, কাউখালীর ১টি, বরকলের ৫টি, বিলাইছড়ির ১টি, রাজস্থলীর ২টি এবং বাঘাইছড়ির ৮টি ইউনিয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে ২৬টি ইউনিয়ন এই দুর্যোগের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পাহাড়ের চলমান এই দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত প্রান্তিক খামারিদের পুনর্বাসন এবং তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে সরকারের সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি।
টানা অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও বন্যায় রাঙামাটির কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে দুর্গম পাহাড়ি এলাকার প্রান্তিক খামারিরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দ্রুত সরকারি আর্থিক সহায়তা, পশুখাদ্য, পুনর্বাসন প্যাকেজ এবং সহজ শর্তে প্রণোদনা নিশ্চিত করা গেলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জীবিকা পুনরুদ্ধার সহজ হবে এবং পাহাড়ের অর্থনীতি আবারও সচল হতে শুরু করবে।#