রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬ ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
Channel18

গুড নিউজ

পথচারীদের জন্য ১১ যাত্রীছাউনি বানালেন দিনমজুর বাবুল

পথচারীদের জন্য ১১ যাত্রীছাউনি বানালেন দিনমজুর বাবুল

দিনমজুরি করে চলে সংসার। বয়স ৫৫ বছর। নাম মো. বাবুল শেখ। অন্যের জমিতে কৃষিকাজ করে যা আয় করেন, তা দিয়েই চলে পরিবারের খরচ। সেই আয়ের টাকা জমিয়ে মানুষের সুবিধার জন্য নির্মাণ করেছেন ১১টি যাত্রীছাউনি ও একটি শৌচাগার। শুধু নির্মাণ করেই দায়িত্ব শেষ করেননি, নিয়মিত সেগুলোর দেখভাল ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাও করেন নিজ হাতে।

বাবুল শেখ গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নের বড়সিট গ্রামের বাসিন্দা। অন্যের জমিতে কৃষিকাজ করার পাশাপাশি বাড়ির সামান্য জায়গায় একটি পোলট্রির শেড তৈরি করে সেখানে মুরগি পালন করেন তিনি। তার এই উপার্জন দিয়েই চলে সংসার ও তিন সন্তানের পড়াশোনা। অথচ সেই সীমিত আয়ের একটি বড় অংশ ব্যয় করছেন অপরিচিত মানুষের উপকারে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাবুলের এই উদ্যোগের শুরু ২০২৪ সালের শেষ দিকে। কাপাসিয়া-জয়দেবপুর সড়কের পাশে একটি শৌচাগারের কাছে দুই নারীকে ছোট ছোট সন্তান নিয়ে গাড়ির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন তিনি। তাদের সঙ্গে ছিল ব্যাগপত্র। এর মধ্যে বৃষ্টি শুরু হলে তাদের দুর্ভোগ দেখে মন খারাপ হয় বাবুলের। ভাবতে থাকেন, গাড়ির অপেক্ষায় থাকা মানুষগুলোর বসার এবং বৃষ্টি-রোদ থেকে বাঁচার কোনো ব্যবস্থা করা যায় কি না। সেই ভাবনা থেকেই তৈরি করেন প্রথম যাত্রীছাউনি। এরপর দুই মাসের মধ্যে একই স্থানে আরও একটি ছাউনি নির্মাণ করেন। ২০২৫ সালের শুরুতে সেখানে তৈরি করেন একটি শৌচাগার।

এরপর থেকে সুযোগ ও সামর্থ্য অনুযায়ী বিভিন্ন সড়কের পাশে যাত্রীছাউনি নির্মাণ করে যাচ্ছেন তিনি। বর্তমানে কাপাসিয়া-জয়দেবপুর সড়কে আটটি, কাপাসিয়া-কালীগঞ্জ সড়কে একটি এবং পাতলা-বড়সিট সড়কে দুটি মিলিয়ে তার তৈরি যাত্রীছাউনির সংখ্যা ১১টি। এর মধ্যে চারটি তৈরি করেছেন ২০২৫ সালে। বাকি ছাউনিগুলো নির্মাণ করেছেন ২০২৬ সালের বিভিন্ন সময়ে।

বাবুলের তৈরি যাত্রীছাউনিগুলো বাঁশ, কাঠ, মোটা পলিথিন ও দড়ি দিয়ে নির্মিত। আকারভেদে একেকটির দৈর্ঘ্য প্রায় সাত ফুট এবং প্রস্থ পাঁচ ফুট। কোনো ছাউনিতে একটি, আবার কোনোটিতে চার-পাঁচটি বেঞ্চ রয়েছে। সামর্থ্য অনুযায়ী কোনো বেঞ্চ তৈরি করেছেন বাঁশের ফালি দিয়ে, আবার কোনোটি কাঠের তক্তা দিয়ে। ছাউনির ওপর বাঁশের চাটাই বিছিয়ে তার ওপর ব্যবহার করেছেন মোটা পলিথিন, যাতে বৃষ্টি ও রোদ থেকে যাত্রীরা কিছুটা সুরক্ষা পান।

বাবুল জানান, ছোট আকারের একটি যাত্রীছাউনি নির্মাণে খরচ হয় দেড় থেকে দুই হাজার টাকা। বড় ছাউনির ক্ষেত্রে বাঁশ ও কাঠ বেশি প্রয়োজন হওয়ায় খরচ পড়ে তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা। তার তৈরি সবচেয়ে বড় যাত্রীছাউনিটি নির্মাণে খরচ হয়েছে প্রায় সাড়ে চার হাজার টাকা। তবে এসব নির্মাণকাজে নিজের শ্রমের কোনো মূল্য হিসাব করেন না তিনি। সব কটি যাত্রীছাউনি নিজ হাতেই তৈরি করেছেন।

যাত্রীছাউনির পাশাপাশি উপজেলার পাতলা মোড়ে সড়কের দুই পাশে নির্মাণ করেছেন একটি শৌচাগার। এতে টিন, বাঁশ, রেডিমেড কংক্রিটের প্যানেলসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ব্যবহার করেছেন। শৌচাগারটি নির্মাণে তার খরচ হয়েছে আনুমানিক সাড়ে ১৩ হাজার টাকা। এ কাজেও অন্য কোনো শ্রমিক নেননি। নিজেই গর্ত খুঁড়ে সেফটিক ট্যাংকসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম স্থাপন করেছেন। শৌচাগার নির্মাণ করেই দায়িত্ব শেষ করেননি বাবুল। নিয়মিত এর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও রক্ষণাবেক্ষণ করেন নিজেই। সেখানে পানির ব্যবস্থা না থাকায় বোতলে পানি ভরে রাখেন।

বাবুল শেখ বলেন, বাথরুমের পাশে কিছু পানির বোতল রাখছি। এগুলা থেকে মানুষ পানি ব্যবহার করে। প্রতিদিন আমি নিজেই পানি ভরে রাখি। আবার নিজেই টয়লেট ওয়াশ করি। অনেক সময় মানুষ বিচ্ছিরি করে রাখে, তখন আমার পানি দিয়ে পরিষ্কার করতে হয়। বাথরুম আমি নিজেই তৈরি করছি। সেফটি ট্যাঙ্কিও নিজে গর্ত করে স্থাপন করছি। যাত্রীছাউনিগুলোসহ সবকিছু নিজ হাতে তৈরি করছি।

তিনি আরও বলেন, খরচের টাকাগুলো আমার নিজস্ব। নিজে যা আয় করি, তা থেকে কিছু টাকা বাঁচিয়ে কাজগুলো করি। কেউ কেউ তার কাজকে পাগলামি বলেন। তবে মানুষ দুনিয়াতে যদি সামান্য কিছু উপকার পায়, এই উপকারের বিনিময়ে আল্লাহ যদি আমারে আখেরাতে কিছু দেয়, এইটাই আমার পাওনা।

বাবুলের ছেলে মো. ইউসুফ বলেন, বাবা রাস্তার কোনো অংশ ভাঙা থাকলে নিজে কোদাল-উড়া নিয়ে সেখানে কাজ করতে থাকেন। এটা তার ভালো লাগে। তিনি কখনও কোনো কিছুর বিনিময়ে এগুলো করেন না। মানুষের কাছে বাবার সুনাম শুনলে তারও ভালো লাগে।

এলাকাবাসী বলেন, উদারতার জন্য এলাকায় তিনি সুপরিচিত। গ্রামের বিভিন্ন সড়কের পাশের ঝোপঝাড়ও পরিষ্কার করেন। সরল স্বভাবের এই মানুষ কারও সঙ্গে তর্কে জড়ান না। নিজের ইচ্ছায়, যখন সময় পান, তখনই এসব কাজ করেন। কোনো সমালোচনাও তাকে দমাতে পারে না। তিনি নিজে কৃষক এবং অন্যের জমিতে দৈনিক হাজিরায় কাজ করেন। এমন আয়ের একজন মানুষ অন্যের জন্য নিজের অর্থ ও শ্রম ব্যয় করছেন, এটি বিরল ঘটনা। তার মতো সহজ মানুষ সমাজে দরকার। প্রতিদিন অনেক মানুষকে তার তৈরি যাত্রীছাউনিতে বসে থাকতে দেখা যায়।

বাবুলের উদ্যোগ সম্পর্কে কাপাসিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হাফিজুল হক বলেন, নিঃসন্দেহে এটি একটি ভালো উদ্যোগ। তিনি ভালো মানসিকতার পরিচয় দিচ্ছেন। আমরা তার সঙ্গে যোগাযোগ করে তাকে সহযোগিতা করার চেষ্টা করব।

সূত্র: এশিয়া পোস্ট

আরও

৩৪ বছর ধরে নিজ উদ্যোগে গাছ লাগিয়ে গ্রামের চিত্র বদলে দিলেন ইমাম

গুড নিউজ

৩৪ বছর ধরে নিজ উদ্যোগে গাছ লাগিয়ে গ্রামের চিত্র বদলে দিলেন ইমাম

মানুষ বিচিত্রময়। বিচিত্রময় তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা, চিন্তাভাবনা ও কর্মকাণ্ড। এমনই এক ব্যক্তির ব্যতিক্রমী কর্মকাণ্ডের খোঁজ মি...

২০২৬-০৯-২০ ১২:৫১

সাতক্ষীরার গ্রামগুলোতে সোনালি আঁশের ব্যস্ততা, কৃষকের মুখে হাসি

গুড নিউজ

সাতক্ষীরার গ্রামগুলোতে সোনালি আঁশের ব্যস্ততা, কৃষকের মুখে হাসি

সকালের রোদ একটু চড়া হতেই গ্রামের সড়কের দুই পাশে ছড়িয়ে পড়ছে সোনালী রং। কোথাও পানিতে জাগ দেওয়া পাট থেকে আঁশ ছাড়াচ্ছেন ক...

২০২৬-০৯-১৮ ১০:০৪