বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন-২০২৬’-এর ১৮(ক) ধারা অনুযায়ী সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (এসআইবিএল) ও এক্সিম ব্যাংক একীভূতকরণ প্রক্রিয়া থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আবেদন করেছে। ব্যাংক দুটির কয়েকজন সাবেক উদ্যোক্তা এগুলো আলাদাভাবে পরিচালনার আগ্রহ দেখালেও নিয়ন্ত্রক সংস্থা তাতে সম্মত নয়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আবেদনপত্রে পর্যাপ্ত তথ্য ও বাস্তবসম্মত আর্থিক পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের পাওনা পরিশোধে ১০ বছর সময় চাওয়াকে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে দেখা হয়েছে। ফলে ব্যাংক রেজল্যুশন বিভাগ আবেদন প্রত্যাখ্যানের পক্ষে মত দিয়েছে এবং একীভূতকরণ কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সুপারিশ করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, পাঁচ ব্যাংকের একীভূতকরণ প্রক্রিয়া এখনও চলমান। যদিও এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। দেশি-বিদেশি কোনো বিনিয়োগকারী এগিয়ে না আসায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগের সিদ্ধান্তেই অটল রয়েছে।
সম্প্রতি গভর্নরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে একীভূতকরণ প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানা গেছে।
স্বতন্ত্রভাবে পরিচালনায় লাগবে ২৫-৩০ হাজার কোটি টাকা
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, আইন অনুযায়ী ব্যাংক পুনরায় আগের মালিকানায় নিতে হলে প্রাথমিকভাবে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা জমা দিতে হবে। পরবর্তী দুই বছরে বাকি অর্থ ও প্রভিশন ঘাটতি মিলিয়ে মোট ২৫ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু এসআইবিএল ও এক্সিম ব্যাংকের আবেদনে এ বিষয়ে কার্যকর কোনো রূপরেখা নেই।
তিনি আরও বলেন, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় চালিয়ে যেতে হলে আগামী বাজেটে বড় অঙ্কের বরাদ্দ প্রয়োজন হবে। সেটি বাস্তবসম্মত কি না, তা সরকার বিবেচনা করবে।
এদিকে সংশোধিত ব্যাংক রেজল্যুশন আইনে যুক্ত হওয়া ১৮(ক) ধারা ভবিষ্যতে বাতিল হতে পারে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
আগামী সপ্তাহেই এমডি নিয়োগের সম্ভাবনা
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগ প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয় যৌথভাবে দুই দফায় প্রায় ১১ জন ব্যাংকারের সাক্ষাৎকার নিয়েছে। আগামী সপ্তাহেই নতুন এমডি নিয়োগ দেওয়া হতে পারে।
ব্যাংক খাত সংস্কারের অংশ হিসেবে ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ জারি করে। পরে সেটি সংশোধন করে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন-২০২৬’ হিসেবে কার্যকর করা হয়।
এই আইনের আওতায় ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংককে একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’ নামে নতুন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের লাইসেন্স দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।
ব্যাংকটির অনুমোদিত মূলধন ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা এবং আমানত বিমা তহবিল থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়ার কথা ছিল ১৫ হাজার কোটি টাকা, যদিও এখন পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে ১২ হাজার কোটি টাকা।
তবে ব্যাংকে সরকারি তহবিল জমা, আমানত আকর্ষণে বিশেষ মুনাফা সুবিধা কিংবা ঋণ আদায়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি এখনও হয়নি।
আমানত ফেরত নিয়ে বাড়ছে ক্ষোভ
পাঁচ ব্যাংকে বর্তমানে প্রায় ৭৫ লাখ আমানতকারী রয়েছেন। তাদের জমা অর্থের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংক আমানত ফেরতের জন্য একটি স্কিম চালু করলেও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ঘোষিত নির্দেশনা অনুযায়ী অর্থ পাওয়া যাচ্ছে না। স্কিম অনুযায়ী প্রথমে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা ফেরত দেওয়ার কথা। এরপর বাকি অর্থ ২৪ মাসে কিস্তিতে তোলার সুযোগ রাখা হয়েছে।
এদিকে সাবেক গভর্নর আহসান মনসুর ঘোষিত ‘হেয়ার কাট’ পদ্ধতিতে ২০২৩-২৪ সালের সুদের অংশ কেটে রাখার সিদ্ধান্তও এখন পর্যন্ত বাতিল হয়নি। এতে আমানতকারীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
ভুক্তভোগী ব্যাংক আমানতকারী অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য সচিব আলিফ রেজা বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত গাইডলাইন অনুযায়ী আমানত ফেরত মিলছে না। ফলে অনেক সাধারণ আমানতকারী চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন। দাবি আদায়ে আগামী মাসে আবারও কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।