সম্প্রতি আলীনগর এলাকায় যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে সশস্ত্র হামলার ঘটনায় আবারও আলোচনায় এসেছে ইয়াসিন বাহিনী। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, অন্তত ৩০০ জনের সশস্ত্র দল পরিকল্পিতভাবে এ হামলা চালায় এবং এতে একে-৪৭সহ অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয়।
কে এই ‘জামাই ইয়াসিন’?
স্থানীয় সূত্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, মো. ইয়াসিন মূলত নোয়াখালীর বাসিন্দা। ২০০৩ সালে চট্টগ্রামে এসে প্রথমে একটি জুট মিলে চাকরি করলেও পরে জঙ্গল আলীনগর এলাকায় বসবাস শুরু করেন। জঙ্গল সলিমপুরে বিয়ে করার কারণে এলাকায় তিনি ‘জামাই ইয়াসিন’ নামে পরিচিতি পান।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি অপরাধ জগতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। পাহাড় কেটে প্লট বাণিজ্য, ভূমি দখল, অবৈধ বসতি নিয়ন্ত্রণ এবং অপরাধীদের আশ্রয় দেওয়ার মাধ্যমে গড়ে তোলেন নিজস্ব সশস্ত্র বাহিনী। ধীরে ধীরে পুরো এলাকাকে পরিণত করেন সন্ত্রাসীদের নিরাপদ ঘাঁটিতে।
গ্রেফতার হলেও থামেননি
২০২২ সালের জুলাইয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের বহরে হামলা ও ইউপি সদস্যকে মারধরের অভিযোগে ইয়াসিনকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। তার বিরুদ্ধে অস্ত্র, গুম, নাশকতা ও সন্ত্রাসসহ ১৫টির বেশি মামলা রয়েছে।
তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জামিনে মুক্তি পেয়ে আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় থেকেই তিনি এলাকায় আধিপত্য বজায় রেখেছেন।
পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা অপরাধ সাম্রাজ্য
জঙ্গল সলিমপুরের ৩ হাজার ১০০ একর খাসজমি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি পাহাড় কেটে অবৈধ প্লট তৈরি, বসতি স্থাপন এবং ইউটিলিটি সেবা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে ইয়াসিন বাহিনী।
এলাকাটিতে প্রবেশের জন্য পর্যন্ত বিশেষ পরিচয়ের প্রয়োজন হয়। পাহাড়ি রাস্তাজুড়ে থাকে সশস্ত্র পাহারা। স্থানীয়দের দাবি, কার্যত সেখানে আলাদা এক ‘সন্ত্রাসী প্রশাসন’ চালু রয়েছে।
রাজনৈতিক পরিচয় বদলের অভিযোগ
স্থানীয় সূত্র বলছে, ইয়াসিন সুযোগ বুঝে রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন করেন। একসময় তিনি আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বর্তমানে নিজেকে বিএনপির সাবেক যুগ্ম মহাসচিব আসলাম চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে পরিচয় দেন।
তবে আসলাম চৌধুরী প্রকাশ্যে এ ধরনের সম্পর্ক অস্বীকার করেছেন। একইভাবে প্রতিদ্বন্দ্বী রোকন বাহিনীও নিজেদের বিএনপির অনুসারী বলে দাবি করে।
র্যাব কর্মকর্তা হত্যা ও যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে হামলা
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান চালাতে গেলে ইয়াসিন বাহিনীর হামলায় র্যাব-৭-এর উপসহকারী পরিচালক মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন। ওই ঘটনায় প্রধান আসামি করা হয় ইয়াসিনকে।
সবশেষ ২৪ মে গভীর রাতে আলীনগরে যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে আবারও হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, হামলায় অংশ নেওয়া সন্ত্রাসীরা পাশের ঘরের টিন ফুটো করে গুলি চালায় এবং বুলডোজার দিয়ে নির্মাণাধীন ক্যাম্প গুঁড়িয়ে দেয়। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে থেমে থেমে গোলাগুলির ঘটনায় পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
‘কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না’
র্যাব ও পুলিশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইয়াসিন ও রোকন বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে আইনের আওতায় আনতে যৌথ অভিযান চলছে।
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা কোটি টাকার প্লট বাণিজ্য ও আধিপত্য ধরে রাখতেই সন্ত্রাসীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলা চালাচ্ছে।
অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জঙ্গল সলিমপুর পরিদর্শন শেষে বলেছেন, “রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করার দুঃসাহস যারা দেখিয়েছে, তাদের সম্পূর্ণ নির্মূল করা হবে।”
বর্তমানে সেনাবাহিনী, র্যাব ও পুলিশের সমন্বয়ে জঙ্গল সলিমপুরে ইয়াসিন বাহিনীকে ধরতে সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।