২০০৬ সালের বার্লিন—একসময় যা ছিল গৌরবের শিখর, আজ তা স্মৃতির দূর আকাশে ঝুলে থাকা এক তারা। দুই দশক পেরিয়ে গেছে, অথচ বিশ্বকাপের মঞ্চে ইতালির জয় এখন প্রায় বিস্মৃত এক অধ্যায়। ২০৩০ সালের আগে আর সেই স্বপ্ন দেখার সুযোগও নেই। ফলে দেশজুড়ে এখন কেবল শোক, ক্ষোভ আর হতাশার ঢেউ।
ইতালির বিখ্যাত ক্রীড়া দৈনিক গাজেত্তা দেলো স্পোর্ত যেন সেই হতাশারই প্রতিধ্বনি তুলেছে—“তুত্তি আ কাসা” অর্থাৎ ‘সবাই বাড়ি চলো’। তাদের প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, “এটা শুধু স্বপ্নভঙ্গ নয়, এটা এক মহাপ্রলয়। আগের দুবারের চেয়েও এবারের আঘাত অনেক বেশি গভীর। একটা পুরো প্রজন্ম বেড়ে উঠছে যারা কোনো দিন বিশ্বকাপ আসরে ইতালিকে দেখেনি। বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যাওয়াটাই এখন আমাদের জন্য স্বাভাবিক নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।” তুত্তোস্পোর্তের ভাষা আরও কঠোর, আরও নির্মম— ‘সবাই বিদায় হও’। তাদের মতে, “এই ব্যর্থতার দায় নিয়ে সর্বস্তরে পরিবর্তন আসা উচিত। রিসেট বা নতুন করে শুরু করাটাই এখন একমাত্র ওষুধ।”
শুধু মাঠের ব্যর্থতা নয়, এর পেছনে গভীর সংকট দেখছে কোরিয়েরে দেলো স্পোর্ত, “ইতালির ফুটবল প্রকল্পের ভিত্তিটাই নড়বড়ে হয়ে গেছে। পুরো ব্যবস্থাই আর কাজ করছে না। এই হার ইতালিয়ান ফুটবলের সাংগঠনিক ও সামাজিক দৈন্যকে নগ্ন করে দিয়েছে।” অন্যদিকে কোরিয়েরে দেলা সেরা যেন ক্লান্ত, শোকাভিভূত—“এবার আর আট বা চার বছর আগের মতো রাগ বা বিস্ময় নেই, আছে কেবল গভীর বিষাদ। গাত্তুসোর চোখের পানি যেন গোটা দেশের হাহাকার।” তাদের প্রশ্নে ফুটে ওঠে অসহায়তা—“সিনারের টেনিস বা আন্তোনেল্লির ফর্মুলা ওয়ান সাফল্য দিয়ে কি আর ফুটবল বিশ্বকাপের শূন্যতা পূরণ হয়!”
লা রিপাবলিকার চোখে এটি এক “জাতীয় লজ্জা”—“কোনো পরিকল্পনার অভাব নয়, বরং পরিকল্পনার সম্পূর্ণ অনুপস্থিতির কারণে এটা ঘটেছে। মধ্যম মানের ফুটবল খেলাটাই এখন আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। বার্লিন জয়ের ২০ বছর পর গাত্তুসোর দল যা উপহার দিল, তা স্রেফ অপমান।” আর এল মেসেজেরোর ভাষা যেন সবচেয়ে তীব্র—“নরকে ইতালি।” তাদের লেখায় ফুটে ওঠে যন্ত্রণার গভীরতা— “ছোট্ট বসনিয়া যখন উৎসবে মাতোয়ারা, ইতালি তখন ডুবেছে নরকের যন্ত্রণায়। টানা তিনবার দর্শক হয়ে বিশ্বকাপ দেখা এই দেশটির জন্য যেন এক সপাটে চড়। এক অন্তহীন দুঃস্বপ্নে নিমজ্জিত আজ্জুরিরা।”
লা স্টাম্পা বলছে—“বিপর্যয়! বার্লিনের সেই রাতের পর থেকে একের পর এক ধাক্কা। ইতালির ব্যর্থতা এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। এক পরিচয়হীন দলে পরিণত হয়েছে তারা।” আর কালচিওমেরকাতো যেন ভবিষ্যতের দিকেও তাকিয়ে কাঁদছে—“আবার বিদায় বিশ্বকাপ। সেই তরুণদের কথা ভাবুন, যারা কখনো ইতালিকে বিশ্বকাপে দেখেনি। আবার সেই প্রবীণদের কথাও ভাবুন, যাঁরা হয়তো আর কখনো আজ্জুরিদের বিশ্বমঞ্চে দেখবেন না। সবাই ভুল করেছে। কোনো ব্যতিক্রম নেই। এই ভুলের দায়ে গণপদত্যাগ হওয়া উচিত।”
সব মিলিয়ে, এটি কেবল একটি দলের পরাজয় নয়; এটি এক ঐতিহ্যের ক্ষয়, এক স্বপ্নের অবসান, এক দেশের ফুটবল আত্মার নিঃশব্দ কান্না। নীল জার্সির সেই গৌরব আজ যেন হারিয়ে গেছে সময়ের অন্ধকারে—ফিরে আসার অপেক্ষায়, নতুন কোনো সূর্যোদয়ের আশায়।