সংকট যেখানে চরম: ভোগান্তিতে ৬০০ ছাত্রী
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ৬০০ ছাত্রী অধ্যয়নরত এই বিদ্যালয়ে বর্তমানে একজনও নারী শিক্ষক নেই। সর্বশেষ কর্মরত একমাত্র নারী শিক্ষকটি তিন বছর আগে প্রয়াত হওয়ার পর থেকে এখানে আর কোনো নারী শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। বর্তমানে ১৯টি শিক্ষক পদের মধ্যে ৬টি পদই শূন্য, এমনকি বিদ্যালয়ে কোনো স্থায়ী প্রধান শিক্ষকও নেই।
নারী শিক্ষক না থাকায় ছাত্রীরা বয়ঃসন্ধিকালীন শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন, বিশেষ করে মাসিক সংক্রান্ত জরুরি ও সংবেদনশীল সমস্যাগুলো পুরুষ শিক্ষকদের সঙ্গে শেয়ার করতে পারছে না। হঠাৎ কোনো ছাত্রী সমস্যায় পড়লে লজ্জা ও সংকোচে তা গোপন রাখতে বাধ্য হচ্ছে, যা তাদের পাঠদানে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে এবং বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হার কমিয়ে দিচ্ছে। বর্তমানে ছাত্রীদের একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছেন বিদ্যালয়ের আয়া এবং উচ্চ শ্রেণির কয়েকজন শিক্ষার্থী।
যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা: শিক্ষার্থীদের আকুতি:
বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী শারদীয়া মল্লিক বলে, "আমি চার বছর ধরে এই স্কুলে আছি। তিন বছর আগে আমাদের একমাত্র নারী শিক্ষিকা মারা যাওয়ার পর থেকে আমরা চরম সমস্যায় আছি। বিশেষ করে নিচু ক্লাসের (ষষ্ঠ-সপ্তম) মেয়েরা হঠাৎ পিরিয়ডের সমস্যায় পড়লে দিশেহারা হয়ে যায়। পুরুষ শিক্ষকদের কাছে লজ্জায় স্যানিটারি ন্যাপকিন বা অন্য কোনো সহায়তার কথা বলা যায় না। এখানে একজন নারী শিক্ষক থাকা অত্যন্ত জরুরি।"
আরেক শিক্ষার্থী বৈশাখী পাল জানায়, পুরুষ শিক্ষকরা তাদের যথেষ্ট আন্তরিকতার সঙ্গেই পাঠদান করান, কিন্তু মেয়েদের এমন অনেক ব্যক্তিগত কথা থাকে যা শুধু একজন নারী শিক্ষককেই বলা সম্ভব। এছাড়া নারী শিক্ষকের (কমিশনার) অভাবে বিদ্যালয়ের 'গার্লস গাইড' কার্যক্রম ও এর প্রশিক্ষণ সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়েছে।
অভিভাবক ও শিক্ষকদের উদ্বেগ:
শিক্ষার্থীর অভিভাবক আব্দুর রহিম ও দিলিপ কৈরী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যেখানে পুরো স্কুলের সব শিক্ষার্থী মেয়ে, সেখানে একজনও নারী শিক্ষক না থাকা অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা। মেয়েদের নিরাপত্তা, মানসিক বিকাশ এবং স্বাস্থ্য সচেতনতার জন্য দ্রুত নারী শিক্ষক প্রয়োজন।
বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক মো. কামাল উদ্দিন জানান, পাঠদানে সমস্যা না হলেও ছাত্রীদের সহশিক্ষা কার্যক্রম (কো-কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিস) যেমন—জেলা, বিভাগীয় বা জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় পুরুষ শিক্ষকদের সাথে যেতে ছাত্রীরা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। ফলে তাদের নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ ব্যাহত হচ্ছে।
চিকিৎসকদের পরামর্শ:
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক ডা. সত্যকাম চক্রবর্তী এ বিষয়ে বলেন, "বয়ঃসন্ধিকাল মেয়েদের জীবনের অত্যন্ত সংবেদনশীল সময়। এই সময়ে শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের কারণে তাদের একজন নারী শিক্ষকের পরামর্শ ও সহমর্মিতা খুব প্রয়োজন। একটি বালিকা বিদ্যালয়ে নারী শিক্ষক না থাকা মোটেও কাম্য নয়।"
লাল ফিতার দৌরাত্ম্য ও প্রশাসনিক উদাসীনতা
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. জহির আলী জানান, নারী শিক্ষক পদায়নের জন্য তারা অধিদপ্তরে একাধিকবার লিখিত আবেদন করেছেন। সর্বশেষ চলতি বছরের ১০ মার্চও চিঠি পাঠানো হয়েছে।
নথিপত্র অনুযায়ী:
২২ এপ্রিল ২০২৫: সিলেট বিভাগীয় উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভায় এই বিদ্যালয়ে নারী শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়।
২১ মে ২০২৫: সিদ্ধান্তটি মাউশিতে পাঠানো হয়।
২০ মে ২০২৬: মাউশি সিলেটের পরিচালক ঢাকার মহাপরিচালক বরাবরে পুনরায় জরুরি আবেদন জানান।
জনপ্রতিনিধির সুপারিশ: স্থানীয় সংসদ সদস্য মো: মুজিবুর রহমান চৌধুরীও দ্রুত ২/৩ জন নারী শিক্ষক পদায়নের জন্য ডিও লেটার (অনুরোধপত্র) দিয়েছেন। এত কিছুর পরও মাউশির সাম্প্রতিক বদলি আদেশে এই বিদ্যালয়ের নাম না থাকা সবাইকে হতাশ করেছে।
এ বিষয়ে মাউশির সহকারী পরিচালক এস এম জিয়াউল হায়দার হেনরী (যাঁর স্বাক্ষরে বদলির প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে) জানান, "এটি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের বিষয়। আমার কাজ শুধু আদেশ বাস্তবায়ন করা। উপর মহল থেকে নির্দেশনা পেলে আমি তা কার্যকর করব।"
অন্যদিকে, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (মাধ্যমিক শাখা) মো. ইউনুছ ফারুকী বলেন, "নতুন নিয়োগ বা পদায়নের সুযোগ তৈরি হলে আমরা শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে নারী শিক্ষক দেওয়ার চেষ্টা করব। মূল সমস্যা হলো, এই এলাকায় বদলি হওয়ার জন্য কোনো নারী শিক্ষকের আবেদন পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক সময় পদায়ন করা হলেও শিক্ষকরা সেখানে থাকতে চান না।"
ঐতিহ্যের অন্তরালে ক্ষোভ ১৯ Lotto (১৯৩০) সালে শ্রীমঙ্গলের ঐতিহ্যবাহী রাধানাথ দেব চৌধুরী তাঁর মায়ের স্মৃতি রক্ষার্থে ‘দয়াময়ী বালিকা বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে ১৯৮৫ সালে বিদ্যালয়টি সরকারি করা হয়। এসএসসি পরীক্ষায় প্রতিবছর প্রায় ৯৮ শতাংশ পাসের গৌরব ধরে রাখা এই ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠটি এখন শুধু প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতার কারণে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের আস্থার সংকটে ভুগছে। দ্রুত এখানে স্থায়ী প্রধান শিক্ষকসহ কয়েকজন নারী শিক্ষক নিয়োগের দাবি পুরো শ্রীমঙ্গলবাসীর।