এই ম্যাচে ইসলামবিরোধী আপত্তিকর স্লোগান দেয়া হয়েছে, যা বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি করেছে। রয়্যাল স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশন এই ঘটনার নিন্দা জানায়। একইভাবে ইজিপশিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন এবং বার্সেলোনার মুসলিম খেলোয়াড় লামিনে ইয়ামালও ‘অসম্মানজনক ও অসহনীয়’ বলে প্রতিবাদ জানান।
ম্যাচের প্রথমার্ধে গ্যালারি থেকে মুসলিমবিরোধী স্লোগান শোনা যায়। স্লোগানগুলো সরাসরি ইয়ামালকে লক্ষ্য করে না হলেও তিনি বিষয়টিকে ব্যক্তিগতভাবেই নিয়েছেন। এরপর বাংলাদেশ সময় বুধবার (১ এপ্রিল) সন্ধ্যার দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে কড়া প্রতিক্রিয়াও জানান ইয়ামাল।
ইয়ামাল তার পোস্টে লেখেন, ‘আমি মুসলিম, আলহামদুলিল্লাহ। স্টেডিয়ামে “তুমি যদি লাফ না দাও, তবে তুমি মুসলিম”—এ ধরনের স্লোগান দেওয়া হচ্ছিল। আমি জানি, এগুলো প্রতিপক্ষকে লক্ষ্য করে বলা হয়েছে, ব্যক্তিগতভাবে আমাকে নয়। তবু একজন মুসলিম হিসেবে এটি অসম্মানজনক এবং সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।’
ইয়ামাল আরও লেখেন, ‘আমি বুঝি, সব সমর্থক এমন নয়। কিন্তু যারা এ ধরনের স্লোগান দেয়, তাদের বলব—স্টেডিয়ামের ভেতরে অন্যদের নিয়ে উপহাস করতে ধর্মকে ব্যবহার করা অজ্ঞতা ও বর্ণবাদী আচরণ।’ ইয়ামাল যোগ করেন, ‘ফুটবল উপভোগ করার জন্য, নিজের দলকে সমর্থন দেওয়ার জন্য। অন্যের পরিচয় বা বিশ্বাসকে অসম্মান করার জন্য নয়।’
বার্সেলোনায় জন্ম নেওয়া ইয়ামালের বাবা মরোক্কান, আর মা ইকুয়েটোরিয়াল গিনির। মরক্কোর আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও ছোটবেলা থেকেই তিনি স্পেনের হয়ে খেলছেন। মাত্র ১৮ বছর বয়সেই ইয়ামাল স্পেন দলের অন্যতম তারকা। ইউরো ২০২৪ জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তাঁর এবং এ গ্রীষ্মে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় অনুষ্ঠেয় বিশ্বকাপেও দলের বড় ভরসা তিনি।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এ ঘটনাকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে নিন্দা জানান। তিনি লেখেন, ‘আমরা কোনোভাবেই একটি অসভ্য সংখ্যালঘু গোষ্ঠীকে বৈচিত্র্যময় ও সহনশীল দেশ হিসেবে স্পেনের বাস্তবতাকে কলঙ্কিত করতে দিতে পারি না।’
স্পেনের আইনমন্ত্রী ফেলিক্স বোলানিওস বলেন, ‘বর্ণবাদী গালি ও স্লোগান আমাদের লজ্জায় ফেলে। উগ্র ডানপন্থীরা তাদের ঘৃণা ছড়াতে কোনো জায়গা ফাঁকা রাখবে না। আর যারা আজ নীরব থাকবে, তারা এর সহযোগী হিসেবে বিবেচিত হবে।’
মিসরীয় ফুটবল ফেডারেশন এক বিবৃতিতে কিছু দর্শকের ‘অত্যন্ত ঘৃণিত ও বর্ণবাদী আচরণের’ নিন্দা জানিয়েছে।
কাতালুনিয়ার ক্রীড়ামন্ত্রী বার্নি আলভারেজ এ ঘটনায় ইয়ামালকে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘স্বাভাবিকভাবেই যা হয়েছে, তা ইয়ামালকে প্রভাবিত করেছে। আমরা তাকে সহায়তা করার চেষ্টা করব। এ ঘটনা নিন্দনীয়। এটি অত্যন্ত গুরুতর বিষয়, যা আমরা স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করছি। এটি বড় ধরনের পশ্চাৎপদতার ইঙ্গিতও।’
বার্নি আলভারেজ আরও বলেন, ‘আমার মনে হয়েছে সবকিছু পরিকল্পিতভাবেই হয়েছে। যারা স্লোগান দিয়েছে, তারা যেন ঘৃণামূলক বক্তব্য ছড়াতেই মাঠে এসেছিল। তাদের অনেকেরই খেলাধুলার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক আছে বলে মনে হয় না।’
এদিকে, কাতালান পুলিশ ইতোমধ্যে ঘটনাটির তদন্ত শুরু করেছে, যাতে আপত্তিকর স্লোগানের পেছনের পরিস্থিতি স্পষ্ট করা যায়। এ ঘটনা বিশ্বজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। একটি সূত্রের বরাত দিয়ে ইএসপিএন জানিয়েছে, ফিফাও বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করছে। ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থাটি ম্যাচের বিভিন্ন প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করবে। ফলে স্পেনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেয়া হতে পারে।
স্পেন, মরক্কো এবং পর্তুগাল যৌথভাবে ২০৩০ বিশ্বকাপ আয়োজনে যে বিড দিয়েছে, সেইসঙ্গে স্পেনে ফাইনাল আয়োজনের দাবিও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। কর্নেলিয়ায় যা ঘটেছে তা সব দিক থেকেই ক্ষতিকর এবং চার বছর পর বিশ্বকাপ আয়োজনে স্পেনের প্রচেষ্টার জন্য বড় ধাক্কা, বিশেষ করে স্প্যানিশ ফুটবলের জন্য।
এই ঘটনা বর্ণবাদবিরোধী লড়াই নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে, যে বিষয়টি দুই মৌসুম আগে জোর দিয়ে তুলে ধরেছিলেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। এবার পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর যে 'দুই-তিনজন দুষ্কৃতকারী' বলে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয় কারণ শত শত দর্শক একসঙ্গে বৈষম্যমূলক ও আপত্তিকর স্লোগান দিয়েছে।
ম্যাচের আগে রয়্যাল স্প্যানিশ ফেডারেশন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জানিয়েছিল যে বিশ্বকাপের ফাইনাল স্পেনেই হবে। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু পরিবর্তন হয়নি, তবুও কর্নেলিয়ার এই ঘটনা স্পষ্টতই নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে বেনফিকার মাঠে রিয়াল মাদ্রিদ ম্যাচে দেখা বর্ণবাদী আচরণ এবং মরক্কোতে অনুষ্ঠিত আফ্রিকা কাপ অব নেশন্স ফাইনালের ঘটনাগুলোর সঙ্গে।
এই ঘটনার পর নেয়া স্প্যানিশ ফেডারেশনের পদক্ষেপের প্রশংসা করেছে ফিফা, কারণ তারা নিয়ম অনুযায়ী রেফারিকে বিষয়টি জানায় এবং লিখিত ও মৌখিকভাবে ব্যবস্থা নেয়।
স্প্যানিশ ফেডারেশনের সভাপতি রাফায়েল লুজান ম্যাচের পর নিজেও বর্ণবাদী স্লোগানের নিন্দা জানান। এর আগে তিনি স্পেনে নিযুক্ত মিশরের রাষ্ট্রদূত ও ইজিপশিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তাদের কাছে ক্ষমা চান।
রেফারিকে ঘটনাটি জানানো হলেও, তিনি বর্ণবাদবিরোধী প্রোটোকল প্রয়োগ না করে ম্যাচ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, কারণ তার মতে পরিস্থিতি সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি এবং ম্যাচ চালিয়ে যাওয়াই সবার জন্য ভালো ছিল।
সবশেষে বলা হয়েছে, ফিফা এখনো স্পেনের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখছে। রেফারির রিপোর্টের ভিত্তিতে কোনো শাস্তি হলে তা জরিমানা বা ভবিষ্যতের কোনো ম্যাচ আংশিকভাবে দর্শকশূন্য করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। তবে ২০৩০ বিশ্বকাপ বা ফাইনাল আয়োজনে এর কোনো প্রভাব পড়বে না, ফাইনালের ভেন্যু হিসেবে রিয়াল মাদ্রিদের মাঠ সান্তিয়াগো বের্নাব্যুই এখনো নির্ধারিত রয়েছে।