সার ডিলার তাইফুর রহমান মুকুল বলেন, বুধবার সকালে ইউএনও অমৃত দেবনাথ, কৃষি অফিসার আব্দুল জব্বার, উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আলাউদ্দিন মন্ডল, সদস্য সচিব শহিদুল ইসলাম এবং পুলিশের উপস্হিতিতে ৪৩৪ বস্তা ইউরিয়া সার কৃষকদের মাঝে ন্যায্যমুল্যে বিতরণ করা হয়।
ভূরুঙ্গামারী উপজেলার ইউএনও অমৃত দেবনাথ বলেন, গত রোববার ভূরুঙ্গামারীর শিলখুড়ি ইউনিয়নে সার ডিলার মেসার্স শাহ আমানত এন্টারপ্রাইজের গুদামের বেড়া ভেঙে বিক্ষুব্ধ কৃষকরা ২০২ বস্তা সার নিয়ে যায়। এ
ঘটনায় গঠিত পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে সার ডিলারের বিরুদ্ধে গাফিলাতি, সার বিক্রির রসিদ প্রদান না করা, রেজিস্টার ঘষা-মাজা ও সিন্ডেকেটসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ করা হয়েছে। তদন্ত রিপোর্ট পেয়ে সংশ্লিষ্ট ডিলারকে শোকজ করা হয়েছে। শোকজের জবাবও পেয়েছি। সবকিছু মিলে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে রংপুর বিভাগীয় কমিশনারের কাছে পাঠানো হয়েছে। পরবর্তী উর্ধতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মোতাবেক ব্যবস্হা নেয়া হবে। আপাতত বন্ধ থাকা সার ডিলার পয়েন্ট আজ খুলে দেয়া হয়েছে। কৃষকরা সুশৃঙ্খলভাবে বুধবার সারাদিন সার নিয়েছে। সার সংকট পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
সহকারী কমিশনার (ভূমি) আমিনুল হক তারেকের নেতৃত্বে গঠিত পাঁচ সদস্যের কমিটি গত সোমবার রাতে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নিকট এই তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। মঙ্গলবার ডিলারকে শোকজ করার পর জবাবও পেয়েছেন। উপজেলা নির্বাহী অফিসার মঙ্গলবার রাতেই আইনগত ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য উর্ধতন কর্তৃপক্ষের দিক নির্দেশনা চেয়ে পত্র পাঠিয়েছেন ।
এদিকে রিপোর্ট নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। লুটের ঘটনার উস্কানীদাতা এবং ঘটনার নেতৃত্বদাতাদের সনাক্ত করা হয়নি। পুলিশ এবং কৃষি বিভাগের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে রিপোর্টে কিছুই উল্লেখ করা হয়নি। ঘটনার একদিন পূর্বে বিএনপি নেতা ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে সবাইকে সমবেত হবার আহ্বান জানান। সংশ্লিষ্ট ডিলার থানায় এবং কৃষি কর্মকর্তাকে বিষয়টি অবহিত করেও প্রশাসন কোন উদ্যোগ নেয়নি। ফলে একতরফা তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে স্থানীয় জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, গত শনিবার (২২/০৮/২৬) সার লুট ঘটনার আগেরদিন শিলখুড়ি ইউনিয়নের জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক তার ফেসবুকে সার সংক্রান্ত একটি স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তিনি লেখেন
“শিলখুড়ি ইউনিয়নে যারা সারের ডিলার নিয়েছেন তাদেরকে বলছি আগামীকাল নিরপেক্ষ তদন্ত করে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে। গুপ্ত, সুপ্ত হয়ে (বিএনপির) তথা তারেক জিয়া সরকারকে নিয়ে তামাশা.....আমরা শিলখুড়ির নেতা, কর্মী ও জনগণ মেনে নেবো না। দোকানদারদের কাছে সার বিক্রি..... দেখা হবে খোলা মাঠে। আমার জানামতে দেশে সারের কোনো সংকট নেই। আগামীকাল শিলখুড়ি ইউনিয়ন শাখার কৃষকদলের সকল নেতা-কর্মীকে সকাল নয়টায় উপস্থিত থাকার জন্য বলা হইল। আদেশ ক্রমে মো. এনামুল হক সদস্য সচিব কৃষকদল শিলখুড়ি ইউনিয়ন শাখা। সবার আগে বাংলাদেশ।”
অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, শিলখুড়ি ইউনিয়ন বিএনপির একজন প্রভাবশালী নেতার ভাই ইউনিয়নটির বিএডিসির অনুমোদিত সার ডিলার। সেখানে আরো কিছু খুচরা সার বিক্রেতা রয়েছে। তাদেরকে এই সার ডিলার সার প্রদান না করায় তারাও ক্ষুব্ধ ছিল মেসার্স শাহ আমানত এন্টারপ্রাইজ এর উপর।
স্থানীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি আনোয়ারুল হক বলেন, রোববার রাতে ইউএনওর সভা কক্ষে সার বিতরণ সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে জরুরি আলোচনা সভায় পুলিশের এক কর্মকর্তা দাবি করেছিলেন, সার বিতরণকে কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খলা ঘটতে পারে এরকম একটি তথ্য তাদের কাছে ছিল। সেই লক্ষ্যে তিনি একটি টিম প্রস্তুত রেখেছিলেন। তবে তিনি বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে জানাননি। পুলিশ অবহিত হওয়ার পরও কেন উর্ধতন কর্তৃপক্ষের নজরে আনেন নি এ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
শিলখুড়ি ইউনিয়নের বিসিআইসি সার ডিলার তাইফুর রহমান মুকুল বলেন, রোববার সার বিতরণের কথা ছিল। এর আগের দিন শনিবার রাতে শিলখুড়ি ইউনিয়ন কৃষক দলের সদস্য সচিব এনামুল হক ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। রোববারের ঘটনার সাথে ওই পোস্টের যোগসূত্র রয়েছে। সার লুটের ঘটনার সময় তাদের নেতাকর্মীরা নেতৃত্ব দেন। এটা সবাই দেখেছে। তার মব করে সার লুটের ঘটনা ঘটিয়েছে।
এসব ঘটনা তদন্ত প্রতিবেদনে না আসায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এটা সাজানো রিপোর্ট। সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ আছে একটি দুষ্ট চক্র আমাকে ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পরিকল্পিতভাবে এসব ঘটনা ঘটিয়েছেন ।
উপজেলা কৃষক দলের আহ্বায়ক সুরুজ্জামান বলেন, ইউনিয়ন কৃষক দলের সদস্য সচিবকে ফেসবুক পোস্টের ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। ইতোমধ্যে পোস্টটি ডিলিট করা হয়েছে।
কৃষক দলের সদস্য সচিব এনামুল হক তার ফেসবুকে পোস্ট দেয়ার কথা স্বীকার করলেও সার লুটের ঘটনায় তার সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছেন। তিনি কৃষকদের সচেতন করতে পোস্ট দিয়েছেন। কিন্তু পরে এটি নিয়ে নেতিবাচক আলোচনা হওয়ায় তিনি পোস্ট ডিলিট করেছেন।
তদন্ত কমিটির সভাপতি আমিনুল হক তারেক জানান, ফেসবুক পোস্টের বিষয়টি আমার জানা ছিল না। কৃষকদের সাক্ষ্য প্রমাণর ভিত্তিতে তদন্ত রিপোর্ট প্রদান করা হয়েছে।
ভূরুঙ্গামারী থানার ওসি আজিম উদ্দিন বলেন, আব্দুল লতিফ নামের একব্যক্তিকে আসামি করে সাধারণ ডায়েরি করেছে সার ডিলার। এবিষয়ে আইনগত পদক্ষেপ নেয়া হবে। তবে পুলিশ আশংকার কথা জানবার পরও কেন আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়নি সে বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।