সূত্র অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় তিন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ও পেশাগত তথ্যসংবলিত নথি তলব করেছে। তাঁরা হলেন আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি হাসিব আজিজ, অপরাধ তদন্ত বিভাগের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি ব্যারিস্টার মোহাম্মদ মোশাররফ হোছাইন এবং স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের মহাপরিচালক অতিরিক্ত আইজিপি মো. আহসান হাবিব পলাশ।
তিনজনই ১৫তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের কর্মকর্তা। বর্তমান আইজিপিও একই ব্যাচের। সূত্রের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এই তিন কর্মকর্তা পদোন্নতি ও বিভিন্ন সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন। তবে সম্ভাব্য নিয়োগের আলোচনায় তাঁদের অতীত দায়িত্ব, পেশাগত সক্ষমতা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন বিবেচনায় নেওয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সূত্র জানিয়েছে, জাপান সফর শেষে বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশে ফেরার পর পুলিশ নেতৃত্বের বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে। তবে নিয়োগ সম্পূর্ণভাবে সরকারপ্রধানের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদের নামও আলোচনায় রয়েছে। ফলে বিবেচনায় থাকা তিন কর্মকর্তার মধ্য থেকেই পরবর্তী আইজিপি হবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই।
গত সোমবার পুরান ঢাকার চকবাজারে এক অনুষ্ঠানে আলী হোসেন ফকির বলেন, সরকার অনুমতি দিলে প্রয়োজনে পুলিশ ক্রসফায়ারে যেতে দ্বিধাবোধ করবে না। একই বক্তব্যে বলপ্রয়োগ করলে পুলিশকে ‘ফ্যাসিস্ট’ এবং নিষ্ক্রিয় থাকলে ‘দুর্বল’ বলা হয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত পরিবেশ দেওয়ার কথাও বলেন পুলিশপ্রধান।
তাঁর বক্তব্যের পর রাজনৈতিক মহলসহ বিভিন্ন পর্যায়ে সমালোচনা শুরু হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপির বক্তব্য ঠিক হয়নি। এ বিষয়ে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি রয়েছে বলেও জানান তিনি। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বক্তব্যটিকে সরকারের জন্য বিব্রতকর বলে অভিহিত করেন।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান জানিয়েছেন, দেশে ফেরার পর প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি বিবেচনা করবেন। এসব প্রতিক্রিয়ার মধ্যেই আইজিপি পদে পরিবর্তনের আলোচনা সামনে আসে।
তবে বক্তব্য দেওয়ার দিন রাতেই ব্যাখ্যা দেয় পুলিশ সদর দপ্তর। সেখানে বলা হয়, আইজিপি বিচারবহির্ভূত হত্যা বা শাস্তি বোঝাতে ‘ক্রসফায়ার’ বলেননি; অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ বোঝাতে রূপক অর্থে শব্দটি ব্যবহার করেছেন। এই ব্যাখ্যার পরও তাঁর বক্তব্য ঘিরে বিতর্ক থামেনি।
সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে আলোচনায় থাকা হাসিব আজিজ ১৯৯৫ সালে পুলিশে যোগ দেন। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের কমিশনার হন। পরে ২০২৬ সালের মার্চে এপিবিএন প্রধানের দায়িত্ব পান। এর আগে ডিটেকটিভ ট্রেনিং স্কুলের কমান্ড্যান্ট, ইন্টারপোল ডেস্কের প্রধানসহ বিভিন্ন পদে কাজ করেছেন তিনি।
মোহাম্মদ মোশাররফ হোছাইন গত ২৯ জুলাই সিআইডি প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন। এর আগে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক ছিলেন। মাঠপর্যায়ে পিরোজপুর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের পুলিশ সুপারসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন। অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রির পাশাপাশি যুক্তরাজ্যে আইনে উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে আহসান হাবিব পলাশ নবগঠিত এসআরবির প্রথম মহাপরিচালক। এর আগে র্যাবের মহাপরিচালক ও চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের এই সাবেক শিক্ষার্থী দেশ-বিদেশে পেশাগত প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। ডিএমপি, সিএমপি, এপিবিএন ও পিবিআইসহ বিভিন্ন ইউনিটে কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর।
আপাতত পুলিশ নেতৃত্বে পরিবর্তনের বিষয়টি সূত্রনির্ভর আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। তিন কর্মকর্তার নথি তলব এবং সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিক্রিয়া সম্ভাব্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিলেও আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত ছাড়া আইজিপি পদ হারাচ্ছেন বলে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরার পর এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট হতে পারে।