২০২৪ সালের ১৬ জুলাই দুপুর আড়াইটা থেকে তিনটার দিকে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। ছাত্রদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ শুরু করে। লাঠিচার্জের সময় ছাত্রদের সবাই সরে গেলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে আবু সাঈদ হাতে একটি লাঠি নিয়ে দুহাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে যান। এই অবস্থায় পুলিশ আনুমানিক মাত্র ৫০-৬০ ফুট দূর থেকে তার উপর ছররা গুলি ছুড়েন। এ গুলির আঘাতে আবু সাঈদ মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।
পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এই সংবাদ ছড়িয়ে পরলে উত্তপ্ত হতে থাকে রংপুর। আবু সাঈদের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ১৮ জুলাই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। নগরীর মডার্ন মোড়ে ছাত্র-জনতার সঙ্গে পুলিশের তুমুল সংঘর্ষ হয়। সেই সংঘর্ষে অটোরিকশা চালক ঘাঘট পূর্ব পাড়ার মানিক মিয়া শহীদ হন। এদিন জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ অফিস, জাতীয় শ্রমিক লীগ অফিস, মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিবি কার্যালয়, তাজহাট থানা, নবাবগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়িসহ কয়েকটি ভবনে ভাঙচুর ও আগুন দেয় বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা।
তিনদিনের ব্যবধানে দুইজনের মারা যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দিগুণ ক্ষোভ নিয়ে ফুঁষে উঠেন আন্দোলনকারীরা। পরের দিন ১৯ জুলাই ছিল শুক্রবার। সকাল থেকেই পুরো নগরীতে ছিল থমথমে অবস্থা। জুমার নামাজের পর ঘোষণা অনুযায়ী গায়েবানা জানাজা করতে না পেরে বিক্ষোভে ফেটে পরে আন্দোলনকারীরা। এরপরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উত্তাল ঢেউ ছড়িয়ে পরে রংপুরের নিউ মার্কেট, সিটি বাজার ও টাউনহল চত্বর এবং জিলা স্কুলের দিকে। এরপরে বিকেল ৩টা থেকে নগরীর বিভিন্ন স্থান থেকে বের হওয়া অসংখ্য মিছিল প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে জিলা স্কুলের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল।
নগরীতে মোতায়েন করা হয় অতিরিক্ত বিজিবি। তখন পুলিশ বাহিনীর শত শত সশস্ত্র সদস্য আর্মড পার্সোনাল ক্যারিয়ার (এপিসি) নিয়ে ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ মিছিলের বিপরীত দিক থেকে আক্রমণাত্মকভাবে ছুটে আসছিল। পুলিশের অস্ত্রের সামনে ইটপাটকেল নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে ছাত্র-জনতা। নগরীর টাউনহল থেকে পায়রা চত্বর পর্যন্ত রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। একপর্যায়ে পুলিশ সদস্যরা বলপ্রয়োগ করে এবং মারমুখী হয়ে দফায় দফায় গুলি ছোড়ে।
সেই দফায় দফায় সংঘর্ষে ঘটনাস্থলে নগরীর পূর্ব শালবন এলাকার সবজি বিক্রেতা সাজ্জাদ হোসেন, গণেশপুরের স্বর্ণ শ্রমিক মোসলেম উদ্দিন, ফল ব্যবসায়ী নিউ জুম্মাপাড়ার মেরাজুল ইসলাম ও ঢাকার বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব গ্লাস অ্যান্ড সিরামিকসের অষ্টম সেমিস্টারের ছাত্র আব্দুল্লাহ আল তাহিরের মৃত্যু হয়। রংপুরের সেদিনের এই রণক্ষেত্র অবস্থা রাতঅবধি চলতে থাকে।
এদিকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের মাঝে এখনও শংকা কাটেনি। স্বজন হারানোর দুই বছরেও এতটুকু শোক কাটেনি তাদের। বিচারের আশায় তাকিয়ে সরকারের দিকে সেই শহীদপরিবারগুলো। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ হত্যার দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দুইজনকে মৃত্যুদণ্ড ও ২৮ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ডের রায় দিলেও অন্যান্য শহীদের ক্ষেত্রে এখনও বিচারকাজ শুরুই হয়নি। দ্রুত কার্যক্রমের মাধ্যমে বিচার কাজ শেষে দায়ীদের বিচার হউক এই চাওয়া শহীদ পরিবারগুলোর।
আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন বললেন, ছেলে হত্যার ঘটনায় আদালত যে রায় দিয়েছে। ছেলে হত্যার রায় যদি বেঁচে থাকতে দেখতে পেতাম, তাহলে একটু হলেও মনটা সান্ত্বনা পাইতো। সাজ্জাদ হোসেনের স্ত্রী জিতু বেগম বলেন, দুই বছর ধরে স্বামী হারানোর শোক বয়ে বেড়াচ্ছি। এখনও স্বামী হারানোর বিচার পেলাম না। এখনও তদন্তই শেষ হয়নি, চার্জশীটও দাখিল হয়নি। বিচার কবে শুরু হবে তার ঠিক নাই। একই দাবী জানিয়ে শহিদ মেরাজুল ইসলামের স্ত্রী নাজনিন ইসলাম বলেন, স্বামীকে হারিয়ে আমরা অসহায় হয়ে পড়েছি। প্রতি মাসে সরকারের পক্ষ থেকে যা পাই তা দিয়ে কোনমতে সংসার চালাই। সন্তানরা প্রতিটি সময় তার বাবাকে মিস করে।