যশোরের শার্শার মাটি বহু রাজনৈতিক নেতা ও সংগ্রামী ব্যক্তিত্বের জন্ম দিয়েছে। তাদেরই একজন ছিলেন তবিবর রহমান সরদার-একজন নিবেদিতপ্রাণ সংগঠক, জননেতা এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের সাহসী সহযোদ্ধা। ১৯৩২ সালের ১ মে যশোর জেলার শার্শা থানায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার পিতা মতিয়ার রহমান সরদার ছিলেন একজন সম্মানিত ব্যক্তি, যার আদর্শিক প্রভাব তবিবরের জীবনে গভীর ছাপ ফেলেছিল।
শিক্ষাজীবনের শুরু নাভারন বুরুজবাগান স্কুলে। সেখান থেকেই তিনি ম্যাট্রিক পাস করেন। এরপর ১৯৫০ সালে খুলনার দৌলতপুর কলেজ থেকে আইএসসি সম্পন্ন করেন এবং একই কলেজে বিএসসি শেষ বর্ষ পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন।
ছাত্রজীবনেই তিনি রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হন। ১৯৪৭ সালে অল বেঙ্গল স্টুডেন্ট মুসলিম লীগের মাধ্যমে তার রাজনীতিতে হাতেখড়ি ঘটে-যা পরবর্তীতে তাকে জাতীয় রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে নিয়ে যায়। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে তিনি হয়ে ওঠেন যশোর অঞ্চলের একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক সংগঠক।
১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের শার্শা থানা আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫২ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত তিনি শার্শা থানা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। একইসঙ্গে ১৯৫৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত যশোর মহকুমা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। তার নেতৃত্বে সংগঠন যেমন শক্তিশালী হয়েছে, তেমনি তৃণমূল রাজনীতিতে গণসম্পৃক্ততা বেড়েছে। ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানের সময় থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত তিনি যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে ২০০২ সাল পর্যন্ত সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেন।
দীর্ঘ এই রাজনৈতিক জীবনে তিনি ছিলেন কর্মীদের আস্থার জায়গা এবং সাধারণ মানুষের নির্ভরতার প্রতীক। তবিবর রহমান সরদারের রাজনৈতিক জীবন শুধু সংগঠন পরিচালনায় সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি ছিলেন প্রতিটি গণআন্দোলনের সক্রিয় অংশীদার। ভাষা আন্দোলন, ৬ দফা আন্দোলন এবং বাঙালির স্বাধিকার সংগ্রামে তার ছিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
১৯৭০ সালের পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। একই বছর তিনি গণপরিষদের সদস্যও নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তার ভূমিকা ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
তিনি পেট্রাপোল-বনগাঁ অঞ্চলে মুক্তিবাহিনীর উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পাবলিসিটি কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। যুদ্ধকালীন সময়ে তার নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনা মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
স্বাধীনতার পরও তিনি জনগণের সেবায় অবিচল থাকেন। ১৯৭৩ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর তিনি প্রতিবাদী কণ্ঠ হিসেবে সামনে আসেন।পরবর্তীতে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালেও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি তার জনপ্রিয়তার প্রমাণ দেন। রাজনৈতিক জীবনে তিনি বহুবার কারারুদ্ধ হয়েছেন, কিন্তু কোনো বাধাই তাকে তার আদর্শ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি।
১৯৬০ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত তিনি শার্শা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়ে স্থানীয় উন্নয়ন ও জনকল্যাণে তার অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। পরবর্তীতে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তিনি জাতীয় সংসদের পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ২০১০ সালের ৩ এপ্রিল এই বরেণ্য নেতা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুতে যশোরের আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক শূন্যতার সৃষ্টি হয়। আজও শার্শার জনপদে তার স্মৃতি, কর্ম এবং অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।