মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টা। পল্লবীর ৩৯ নম্বর বাড়ির তিনতলার উত্তর পাশের ফ্ল্যাট থেকে বড় বোন রাইসার সঙ্গে স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল রামিসা। দরজার বাইরে পা রাখতেই পাশের ফ্ল্যাটের রিকশা মেকানিক সোহেল রানা (৩২) তাকে টেনে নিয়ে যায় নিজের ঘরে। পুলিশ জানায়, ঘরে ঢোকানোর পরই শিশুটির ওপর চালানো হয় পাশবিক নির্যাতন। সেই পৈশাচিকতার কথা জানাজানি হওয়ার ভয়ে সোহেল বেছে নেয় চরম পথ—খুন।
লাশ গুম করার নেশায় মত্ত সোহেল প্রথমে গলা কেটে রামিসাকে হত্যা করে এবং পরে হাত কাটার চেষ্টা চালায়। কিন্তু দরজায় রামিসার মায়ের কড়া নাড়ানি আর সন্দেহের মুখে কাজ শেষ করতে না পেরে পালিয়ে যায় ঘাতক। খাটের নিচে পড়ে থাকে রামিসার নিথর দেহ, আর বাথরুমের এক বালতি জলে মিলেছে সেই ছোট্ট মাথাটি, যা কিছুক্ষণ আগেও হাসিখুশি গল্পে মেতে ছিল।
রামিসার মা পারভীন আক্তার দরজার বাইরে মেয়ের একটি জুতা পড়ে থাকতে দেখে আতকে ওঠেন। মেয়ের কোনো সাড়া না পেয়ে সন্দেহ বাড়ে পাশের ফ্ল্যাটের দিকে। অনবরত দরজায় নক করলেও কেউ খুলছিল না। পরে পুলিশ ও স্থানীয়রা মিলে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকলে উন্মোচিত হয় এক বীভৎস দৃশ্য। পপুলার মডেল স্কুলের সেই ছোট্ট শিক্ষার্থী, যার চোখে ছিল উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, সে তখন নিথর রক্তমাখা লাশে পরিণত হয়েছে। রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা ও মা পারভীন আক্তার এখন বাকরুদ্ধ, তাদের দুই মেয়ের মধ্যে ছোট রামিসা ছিল ঘরজুড়ে প্রাণচাঞ্চল্য।
পুলিশ জানিয়েছে, মূল অভিযুক্ত সোহেল রানা একজন পেশাদার অপরাধী এবং মাদকাসক্ত। তার বিরুদ্ধে আগে থেকেই একাধিক মামলা রয়েছে। হত্যাকাণ্ডের মাত্র সাত ঘণ্টার মধ্যেই ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ থেকে সোহেল এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, হত্যার সময় সোহেলের স্ত্রী ঘুমিয়ে থাকার অভিনয় করলেও তার ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুলিশ আরও জানায়, ময়নাতদন্তের পর ধর্ষণের বিষয়টি পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যাবে।
পল্লবীর সেই ১১ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের ৭ নম্বর রোডে এখন কেবলই দীর্ঘশ্বাস। ১৭ বছর ধরে যে বাড়িতে হান্নান মোল্লার পরিবার নিরাপদ আশ্রয় খুঁজেছিলেন, সেই প্রতিবেশীর ঘরেই রামিসার জন্য অপেক্ষা করছিল যমদূত। একটি রিক্রুটিং এজেন্সির সাধারণ কর্মচারী আব্দুল হান্নান কোনোদিন ভাবেননি, তাঁর ছোট্ট কলিজার টুকরোকে এভাবে হারিয়ে যেতে হবে।
শহরের বুক থেকে আরও একটি ফুল ঝরে গেল, রেখে গেল বিচার আর ইনসাফের এক কঠিন দাবি।