কয়েকদিন আগে রাজধানীর আদ-দ্বীন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুর্ঘটনায় ৬ শিশুর মৃত্যুর ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। অবহেলা নাকি অন্য কোনো কারণে এত দ্রুত শিশুদের প্রাণ গেল, তা নিয়ে সাধারণ মানুষ ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলো সোচ্চার হয়েছে। জনদাবি উঠেছে, এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও দায়ীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার।
কিন্তু চিকিৎসকদের একাংশ ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, আদ-দ্বীনের ঘটনাটি গণমাধ্যমে যেভাবে গুরুত্ব পেয়েছে, তার আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে সারা দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন মারা যাওয়া অসংখ্য শিশুর করুণ বাস্তবতার গল্প। এই শিশুদের মৃত্যুর খবর অনেক সময় লোকচক্ষুর অন্তরালেই থেকে যায়।
স্বাস্থ্য খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বর্তমান এই সংকটের মূলে রয়েছে সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টার কিছু ভুল নীতি ও টিকাদান কর্মসূচিতে চরম উদাসীনতা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনাকালীন এবং পরবর্তী সময়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিয়মিত হামের টিকাদান কর্মসূচি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছিল, যা দূরীকরণে সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা কার্যকর কোনো বিশেষ ক্যাম্পেইন বা ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ নিতে ব্যর্থ হন। স্বাস্থ্য খাতের বাজেট বরাদ্দ এবং মাঠপর্যায়ে ভিটামিনে ক্যাপসুল ও হাম-রুবেলার বুস্টার ডোজ বিতরণে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভাব ছিল। আক্রান্ত এলাকাগুলোতে দ্রুত ‘রিং ভ্যাকসিনেশন’ বা জরুরি টিকাদানের ব্যবস্থা না করায় সংক্রমণটি মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছে।
নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের এই ভুলের খেসারত দিতে হচ্ছে দেশের হাজারো নিরীহ শিশুকে। এই প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারণী ব্যর্থতার জবাবদিহি কে করবে, তা নিয়ে এখন তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন ভুক্তভোগী অভিভাবকেরা।
হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে এবং শতভাগ প্রতিরোধযোগ্য রোগ। সঠিক সময়ে সঠিক ভ্যাকসিনেশন নিশ্চিত করা গেলে একটি শিশুরও এভাবে মারা যাওয়ার কথা নয়।
চলমান এই মৃত্যুর মিছিল থামাতে অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে এখনই যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। দেশের যে সমস্ত জেলা বা দুর্গম অঞ্চলে হামের প্রকোপ বেশি, সেখানে অবিলম্বে ৫ বছর বা তার কম বয়সী সব শিশুকে বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে হামের টিকা দিতে হবে। স্বাস্থ্য খাতের বিগত দিনের নীতিগত ভুলগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত সংস্কার করতে হবে। পাশাপাশি টিকাদানে অবহেলার জন্য দায়ী কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করা প্রয়োজন। আক্রান্ত শিশুদের ভিটামিন-এ ক্যাপসুল সরবরাহ এবং জটিল আকার ধারণ করার আগেই হাসপাতালে নেওয়ার জন্য মাঠপর্যায়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
আদ-দ্বীন হাসপাতালে ৬ শিশুর অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর যেমন সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দরকার, তেমনি হামের ভুল নীতির কারণে যে শত শত শিশুর প্রাণ ঝরে গেল, সেই ‘নীরব হত্যাকাণ্ড’গুলোরও দায় নির্ধারণ হওয়া জরুরি।