রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬ ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
Channel18

সারা দেশ

গাইবান্ধায় এক টাকার মাস্টার লুৎফর রহমান পেলেন রাষ্ট্রীয় সম্মাননা

গাইবান্ধায় এক টাকার মাস্টার লুৎফর রহমান পেলেন রাষ্ট্রীয় সম্মাননা

এক টাকার শিক্ষক লুৎফর রহমান। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীরেও থামেনি পাঠদান। প্রায় পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন লুৎফর রহমান। পড়াশোনার পাশাপাশি শিশুদের নৈতিক শিক্ষাও দেন তিনি। প্রতিদিন বই -খাতা নিয়ে তার সামনে দেখা যায় অনেক শিশুকেই। আর এর বিনিময়ে পান তিনি মাত্র এক টাকা। ৫ দশকের এই শিক্ষাসেবা তাকে পরিচিতি করেছে এক টাকার মাস্টার হিসেবে। এই শিক্ষাসেবার নিরলস প্রচেষ্টার রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দীর্ঘ ৫২ বছরে জীবনের । জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত শিশুদের পড়াতে চান এক টাকার মাস্টার লুৎফর রহমান। গত ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দেশের ১০০ জন গুনি শিক্ষকদের সঙ্গে লুৎফর রহমানকে সম্মাননা দেওয়া হয়। আর পুরস্কার হিসেবে পান ২ লক্ষ টাকা, ক্রেস ও সম্মাননাপত্র। এছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে তাকে সরকারি অবসর ভাতা দেয়ার ঘোষণা দেন শিক্ষামন্ত্রী। ওই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সামনে নিজের অনুভূতি ও প্রকাশ করেন লুৎফর রহমান। এই স্বীকৃতির পরেও তার ইচ্ছা, যতদিন সুস্থ শরীরে বেঁচে থাকবেন, ততদিন শিশুদের পড়িয়ে যাবেন তিনি।

গাইবান্ধা জেলা শহর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে সদর উপজেলার ইউনিয়নের বাগুড়িয়া গ্রামে তার বসত। ব্রহ্মপুত্র নদের নতুন বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের পাশে এই জনপদে নদী ভাঙ্গনে নিঃস্ব হওয়া অনেক পরিবারের বসবাস ।এমনই এক এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন এক টাকার মাস্টার লুৎফর রহমান। ১৯৪৮ সালে ২৩ নভেম্বর ফুলছড়ি উপজেলা উড়িয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। চরের সম্পদশালী পরিবারে তার জন্ম। চর এলাকায় প্রায় ১০০ বিঘার বেশি ছিল আবাদি জমি আর ৪ বিঘার উপর বসতভিটা ভাঙ্গনে কবলে বিলীন হয় । পরে তারা ডাকাতিয়ার চরে আশ্রয় নেয়। সেখানের বসতবাড়ি ও ভিটেমাটি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার পর লৎফর রহমান গাইবান্ধা সদর উপজেলার বগুড়িয়া গ্রামে বসবাস শুরু করেন। সেখানে মাত্র তিন শতাংশ জমির ওপর তার বসবাস। জন্ম তারিখ অনুযায়ী লুৎফার রহমানের বয়স ৭৮ বছর । তার বাবা মৃত ফইম উদ্দিন ও মা মৃত নছিয়ম নেছার পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিনি একমাত্র ছেলে এবং সবার ছোট। স্ত্রী লতিফুন বেগমের সঙ্গে তার সংসারে দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। মেয়েদের বিয়ে হয়েছে। দুই ছেলের একজন লাভলু ইজিবাইক চালান, অন্যজন মশিউর একটি মাদরাসায় কর্মরত। নিজস্ব সম্পত্তি বলতে তেমন কিছুই নেই তার।

শনিবার ( ১০ অক্টোবর) সকালের দিকে বাগুড়িয়া এলাকা সারেজমিনে ঘুরে জানা যায়, শমসের আকন্দের বারান্দায় বিছানা বিছিয়ে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর কয়েকজন শিশুকে পড়াচ্ছেন লুৎফার রহমান । বিভিন্ন বিষয়ে পড়ার পাশাপাশি শিশুদের ধরছিলেন শিখাচ্ছিলেন লেখা শিশুরাও আনন্দের সঙ্গে পড়াশোনায় অংশ নিতে দেখা যায়।

এলাকাবাসী জানায় ঝড় বৃষ্টি কিংবা বয়সের ভারে দমাতে পারেনি তাকে। বৈরী আবহাওয়া অপেক্ষা করে নিয়মিত পাঠদান করেন তিনি। কখনো বাইসাইকেল কখনো পায়ে হেঁটে শিক্ষার্থীদের পড়াতে যান লুৎফর রহমান। ১৯৭৪ সাল থেকে পাঠ দান শুরু করেন লুৎফর রহমান। তখন সুবিধাবঞ্চিত ঝরে পডা শিশুদের বাড়িতে গিয়ে পড়াতেন তিনি। পড়ালেখার বিনিময়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রতিদিন এক বা দুই মুঠো চাল নিতেন। পরে চালের পরিবর্তে প্রত্যেক শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেয়া শুরু করেন ১ টাকা তখন থেকে তার পরিচয় এক টাকার মাস্টার ।

লুৎফর রহমান বলেন, ১৯৭৪ সালের অভাব অনটনের সময় গ্রামে ঝরে পড়া ও সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের ধরে ধরে এনে পড়াতাম। এর কিছুদিন পর শিক্ষার্থী প্রতি এক টাকা করে নেওয়া শুরু করি। তখন থেকেই মানুষ আমাকে এক টাকার মাস্টার বলে ডাকা শুরু করে। দীর্ঘ ৫২ বছর এক টাকায় পড়ানো গাইবান্ধা লুৎফর রহমান পেলেন রাষ্ট্রীয় সম্মাননা অভাবের আধারে শিক্ষার আলো ছড়ান এক টাকার মাস্টার লুৎফর রহমান ফি- মাত্র এক টাকা এমন প্রশ্নের উত্তরে বলেন বিনামূল্যে পড়ালে অনেক শিক্ষার্থী পড়াশুনা করতে আগ্রহ থাকবে না। অন্যদিকে দরিদ্র পরিবারের অভিভাবকদের পক্ষে বেশি টাকা দিয়ে সন্তানদের পড়ানো কঠিন। তাই এক টাকা নির্ধারণ করি।

সময় বদলেছে, গোদরে সে টাকার মূল্য ও, তবে তার পাঠ দানের পদ্ধতি বদলায়নি। এখনো সকাল ও সন্ধ্যায় বিভিন্ন দফায় শিশুদের পড়ান তিনি।

সময় বদলেছে, বদলেছে টাকার মূল্যও বদলেছে। তবে তার পাঠদানের পদ্ধতি বদলায়নি। এখনো সকাল ও সন্ধ্যায় বিভিন্ন দফায় শিশুদের পড়ান তিনি। তিনি বলেন, এ টাকা আমার কাছে এখন কোন পারিশ্রমিক নয়, এটা শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার সঙ্গে যুক্ত রাখার একটি উপায় বা কৌশল। নিজের জীবনের অভাব অনটনের অভিজ্ঞতাই লুৎফর রহমানকে অন্য শিশুদের শিক্ষার প্রতি দায়িত্বশীল করে তোলে। আর্থিক সংকটের কারণে বেশিদূর পড়াশোনা করতে পারেননি তিনি সেই আক্ষেপ থেকে তার অভিজ্ঞতা অভাবের কারণে কোন শিশু পড়াশোনা যেন বন্ধ না করে। বেশিদূর পড়তে পারিনি আমি। সেটাই আমার বড় দুঃখ। যখন অভাবে কারণে এলাকার শিশুদের পড়াশোনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে অভিভাবকেরা উনি নিরুপায় তখনই যুদ্ধে নামি। তার কাছে পড়তে আসা শিশুদের অনেকেই পরিবার নিম্ন ও নিম্ন মধ্যবিত্ত। এসব পরিবারের সন্তানদের জন্য এক টাকার বিনিময়ে পড়ার সুযোগ বাড়তি সহায়তা হিসেবে কাজ করছে।

দীর্ঘ পাঁচ দশকের বেশি সময় অসংখ্য শিশুকে পড়িয়েছেন তিনি। তার কাছে পড়েছেন এমন শিক্ষার্থীদের সন্তানেরাও এখন তার সামনে বসে পড়াশোনা করছে। ফলে তার পাঠ দান শুধু একটি প্রজন্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। লুৎফর রহমান বলেন, ৫২ বছরের শিক্ষার সেবায় তার অনেক শিক্ষার্থী বর্তমানে শিক্ষক, চিকিৎসক, পুলিশ, বিজিবি, সাব রেজিস্টারসহ বিভিন্ন দপ্তরে চাকরি করছেন।

লুৎফর রহমান সরকারি বা বেসরকারি কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক নন। ব্যক্তিগত উদ্যোগেই দীর্ঘদিন ধরে শিশুদের পড়িয়ে আসছেন তিনি। ১৯৭০ সালে ফুলছড়ি উপজেলার গুণভড়ি উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। চাকরি না পেলেও শিক্ষার সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি। বরং শিশুদের পড়ানোই হয়ে ওঠে তার জীবনের অন্যতম প্রধান কাজ। দীর্ঘদিনের এই শিক্ষাসেবার স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছে তার গল্প। এবার বিশ্ব শিক্ষক দিবসে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পাওয়ায় সেই স্বীকৃতি নতুন মাত্রা পেয়েছে।
সম্মাননা পাওয়ার পর সাঘাটার আর রাহমা ফাউন্ডেশন ও স্পোর্টস একাডেমির পক্ষ থেকে তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা ও সংবর্ধনা জানাতে আসেন সংগঠনটির একদল তরুণ স্বেচ্ছাসেবী।

এ সময় সংগঠনটির সহদপ্তর সম্পাদক আরিফ আহমেদ বলেন, এমন একজন গুণী মানুষ আমাদের জেলায় আছেন, আমরা আগে জানতাম না। সত্যিই আমরা গর্বিত। আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা দিতে তার এলাকায় এসেছি। স্মারকের সঙ্গে একটি বই ও পোশাক উপহার দেওয়া হয়েছে।

লুৎফর রহমানের প্রাক্তন ছাত্র ও চন্দিয়া মহিলা কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রভাষক জাহিদুল ইসলাম, সেই ছোট্টবেলায় আমি তার কাছে পড়েছি। সে সময় প্রাইভেট শিক্ষক পাওয়া যেত না। পেলেও অভাবে সবাই পড়াতে পারতেন না। সেই সময় তিনি আমাকে পড়িয়েছেন।

তিনি বলেন, আজ আমিও একজন কলেজশিক্ষক। স্যারের শিক্ষাসেবার ৫২ বছর পর এসে গুণী শিক্ষক সম্মাননা আমাকে আনন্দিত করেছে। নিঃসন্দেহে স্যার আমাদের গর্ব, গাইবান্ধার গর্ব।
জয়েনপুর আদর্শ কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক আবুল আজাদ বলেন, লুৎফর রহমান একজন ব্যতিক্রমী শিক্ষক। এক টাকা হয়তো হিসাব করা যায়, কিন্তু তার বিনিময়ে যে শিক্ষা তিনি দিয়ে আসছেন, সেটি মাপা সম্ভব নয়। এ ধরনের নিবেদিতপ্রাণ মানুষকে মূল্যায়ন করায় তিনি সরকারকে ধন্যবাদ জানান।

লুৎফর রহমানের ছোট ছেলে মশিউর রহমান বলেন, শেষ বয়সে এসে হলেও তাকে সরকার সম্মানিত করেছে। এজন্য আমরা কৃতজ্ঞ। যদিও আমরা বিষয়টি কখনো আশা করিনি।
রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পাওয়ার অনুভূতি জানতে চাইলে লুৎফর রহমান বলেন, আমি খুব খুশি ও আনন্দিত। তবে সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে প্রধানমন্ত্রীকে কাছ থেকে দেখতে পেরে। সম্মাননা কিংবা অর্থপ্রাপ্তি আমার মূল প্রত্যাশা ছিল না। 

তিনি বলেন, সম্মাননার সঙ্গে পাওয়া অর্থ আমার উপকারে আসবে। আর সরকারি ভাতার ব্যবস্থা হলে বাকি জীবনটা কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্যে চলতে পারব।
লুৎফর রহমান বলেন, যত দিন সুস্থ থাকব, তত দিনই শিশুদের পড়িয়ে যাব। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত পড়ানোই আমার ইচ্ছা। আমার প্রতিষ্ঠিত শিক্ষার্থীদের প্রতিও অনুরোধ থাকবে, অর্থের অভাবে কোনো শিশুর লেখাপড়া যেন বন্ধ না হয়। 

লুৎফর রহমানের দীর্ঘদিনের শিক্ষাসেবাকে আরও সুসংগঠিত ও বিস্তৃত করতে তার বাড়িতে জেলা প্রশাসনের অর্থায়নে নির্মাণ করা হচ্ছে এক কক্ষবিশিষ্ট একটি পাঠশালা। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘এক টাকার স্কুল’। এখানে এলাকার দরিদ্র পরিবারের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিশুদের বিনা মূল্যে পড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। নির্মাণকাজ শেষ হলে পাঠশালাটি চালু করা হব । জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাব্বির আহমেদ বলেন, সেখানে একটি পাঠশালা ঘর নির্মাণ করা হচ্ছে। লুৎফর রহমান সেখানে স্কুলের শিক্ষার্থীদের পড়াবেন।

 

আরও

সোনারগাঁয়ে পরিবেশ রক্ষায় যুব সংস্থার ব্যতিক্রমী উদ্যোগ

সারা দেশ

সোনারগাঁয়ে পরিবেশ রক্ষায় যুব সংস্থার ব্যতিক্রমী উদ্যোগ

পরিবেশ দূষণ কমাতে পরিত্যক্ত প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্যের বিনিময়ে পরিবেশবান্ধব গাছ উপহার দিয়ে ব্যতিক্রমী সচেতনতামূলক কর্...

২০২৬-১০-১১ ১৯:০৮

জামায়াত ইসলামী এবং আওয়ামী লীগ ৯৬ বন্ধু তাদের ভালোবাসা দেখেছি- রাশেদ খান

সারা দেশ

জামায়াত ইসলামী এবং আওয়ামী লীগ ৯৬ বন্ধু তাদের ভালোবাসা দেখেছি- রাশেদ খান

বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খান বলেছেন, পতিত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ দিল্লিতে বসে আ...

২০২৬-১০-১১ ১৯:০৭