শুক্রবার (২৬ জুন) দুপুরে ফেনী প্রেসক্লাবের সভাকক্ষে মতবিনিময় সভায় বক্তারা সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গঠনের জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা এবং জবাবদিহিতা- এই তিনটি স্তম্ভকে সমানভাবে শক্তিশালী করার প্রতি জোর দাবি জানান।
অধিকার, ফেনী ইউনিটের আয়োজনে মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রবীণ সাংবাদিক ফেনী প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি রবিউল হক রবি। অধিকার ফেনী’র ফোকাল পার্সন সাংবাদিক নাজমুল হক শামীমের সঞ্চালনায় মুলপ্রবন্ধ পাঠ করেন মানবাধিকার কর্মী গুলিবিদ্ধ ছাত্র আবুল হাসান শাহীন।
সভায় অতিথির বক্তব্য রাখেন ফেনী রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি ও দৈনিক ফেনীর সময় সম্পাদক মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন, বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় মহাসচিব মহিউদ্দিন খন্দকার, '২৪ এর জুলাই আন্দোলনে ছররা গুলিতে একচোখ হারানো মাইক্রোবাস চালক নুরুল করিম।
বক্তব্য রাখেন সাংবাদিক এস এম ইউসুফ আলী, শিক্ষক ও মানবাধিকার সংগঠক আব্দুস সালাম ফরায়েজী, বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয় মুহাইমিন তাজিম, আব্দুল কাইয়ুম সোহাগ প্রমুখ।
অতিথির বক্তব্যে ফেনী রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন বলেন, নির্যাতন প্রতিরোধ শুধু আইনগত বিষয় নয়, এটি রাষ্ট্রীয় ন্যায়বিচার, মানবাধিকার এবং গণতান্ত্রিক শাসনের ভিত্তি। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে আইন ও বাস্তবতার মধ্যে যে ব্যবধান রয়েছে, তা দূর করতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার অপরিহার্য।
ভিকটিমদের ন্যায়বিচার, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিত না হলে নির্যাতন প্রতিরোধ কার্যক্রম পূর্ণতা পাবে না। সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গঠনের জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা এবং জবাবদিহিতা- এই তিনটি স্তম্ভকে সমানভাবে শক্তিশালী করা জরুরি।
প্রবীণ সাংবাদিক ফেনী প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি রবিউল হক রবি বলেন, শেখ হাসিনা সরকার ভিন্নমতাবলম্বীদের ব্যাপকভাকে গুম করে তাদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছিল। বিচার বিভাগে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সুযোগ রেখে তা নির্যাতনের জন্য ব্যবহার করা হতো। আজ্ঞাবহ মানবাধিকার কমিশন নির্যাতন-সহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কোন কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। বর্তমান সরকার অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গৃহীত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলো বাতিলের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সাবেক ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলের আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানের আদলে ফিরিয়ে নেয়া হচ্ছে যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
মতবিনিময় সভা সাংবাদিক শাহজালাল ভূঁইয়া, নুরুল আফসার, মোস্তফা মুহিত, সাংবাদিক এম ডি মোশারফ, মোস্তফা কামাল বুলবুল, ফখরুল ইসলাম সজিব, মাসুম বিল্লাহ, মানবাধিকার সংগঠক জাফর আহমেদ ভূঁইয়া, আমিনুল ইসলাম শাহীন, মো. শহিদুল ইসলাম মিশু, আমার বাংলাদেশ (এবি) যুব পার্টি'র সদস্য সচিব ইব্রাহিম সোহাগ, থিয়েটার কর্মী সাজ্জাদ দোলনসহ শিক্ষক, সাংবাদিক, মানবাধিকার সংগঠক ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেন। মতবিনিময় সভা শেষে ফেনী প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে মানবাধিকার কর্মীরা।
নির্যাতিতদের সমর্থনে আর্ন্তজাতিক সংহতি দিবসের মুল প্রবন্ধে জানানো হয়, ১৯৮৪ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ নির্যাতন এবং অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক অথবা মর্যাদাহানিকর আচরণ বা শাস্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ নীতিগত অবস্থান গ্রহণ করে, যা আন্তৃর্জাতিক আইনে একটি বিধিবদ্ধ আইনি শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। এই নীতিগত অবস্থান ১৯৮৭ সালের ২৬ জুন কার্যকরী হয় এবং একই সঙ্গে সাধারণ পরিষদে গৃহীত প্রস্তাব অনুযায়ী প্রতিবছর ২৬ জুন এই দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত হয়। ১৯৮৮ সাল থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যাঁরা নিষ্ঠুর নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তাঁদের প্রতি সংহতি জানানোর দিন ২৬ জুন। এই দিনে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যাঁরা নির্যাতনসহ বিভিন্ন ধরনের নিষ্ঠুর ও অমানবিক আচরণ এবং সহিংসতার শিকার হয়েছেন অধিকার তাঁদের প্রতি সংহতি জানাচ্ছে।
অধিকার জানায়, ১৯৯৮ সালের ৫ অক্টোবর বাংলাদেশ জাতিসংঘ প্রণীত নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সনদে অনুস্বাক্ষর করেছে এবং এই কনভেনশন অনুমোদনকারী প্রতিটি রাষ্ট্রপক্ষ তাদের জাতীয় আইনে নির্যাতনকে একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে সম্মত হয়েছে। এই অনুযায়ী মানবাধিকার কর্মীদের চাপে ২০১৩ এর ২৪ অক্টোবর 'নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) বিল ২০১৩' জাতীয় সংসদে গৃহীত হয়। এই আইন জারি থাকার পরও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের দায়মুক্তি দেয়ার কারণে শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসানমলে ব্যাপকভাবে নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। এরই ধারাবাহিকতায় ২৪ এর জুলাইয়ে গণআন্দোলনের সময়ে তৎকালীন ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের ব্যবহার করে ছাত্র-জনতার ওপর ব্যাপক নির্যাতন চালায়। নির্যাতন বিরোধী এই কনভেনশন অনুমোদনের ২৮ বছর পর অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের ১৭ জুলাই কনভেনশন এগেইনস্ট টর্চার এর অপশনাল প্রোটোকল অনুমোদন করে। জাতিসংঘের এই দুইটি কনভেনশন অনুমোদন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের জন্য কৃতিত্ব হলেও নির্যাতন প্রতিরোধে এই অনুমোদন কোন কাজে আসেনি। কারণ নির্যাতন ও অমানবিক আচরণ এখনও অব্যাহত রয়েছে।
২০২৬ সালের নির্যাতন বিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস এমন এক সময় পালিত হচ্ছে যখন বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের তত্ত্ববধায়নে নির্বাচনের মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক সরকার গঠিত হয়েছে। শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে দেশের সমস্ত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিকল্পিতভাবে দলীয়করণের মাধ্যমে আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করা হয়েছিল। ফলে বিরোধী রাজনৈতিকদলের নেতা-কর্মী, ভিন্নমতাবলম্বী এবং সাধারণ নাগরিকরা বিচারিক হয়রানী, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনসহ বিভিন্ন ধরনের নিপীড়ণের শিকার হয়েছিলেন। ২০২৪ এর ছাত্র-জনতার অভ্যূত্থানের পর ড. ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত সংস্কারের জন্য ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করে। এরমধ্যে সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগের জন্য সুপ্রিম কোটের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ ও স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার জন্য সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ, দুর্নীতি দমন কমিশন অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশসহ ১৬টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ সংসদে বিল আকারে উত্থাপন না করায় তা বাতিল হয়ে যায়।