গত বুধবার সন্ধ্যায় বগুড়া শহরের বউবাজার এলাকায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় বাঁ পায়ে গুরুতর আঘাত পান ইরাম। পরে তাঁকে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরিবারের অভিযোগ, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর পায়ের আঙুল নড়াচড়া বন্ধ হয়ে গেলেও বিষয়টি যথাসময়ে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়নি। পরে ঢাকার জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা জানান, তাঁর পায়ের একটি নার্ভ ছিঁড়ে গেছে এবং পচন ধরেছে। শেষ পর্যন্ত গত রোববার রাতে অস্ত্রোপচার করে তাঁর বাঁ পা কেটে ফেলতে হয়েছে।
ইরামের বাড়ি বগুড়া শহরের রহমাননগর এলাকায়। বুধবার সন্ধ্যায় বন্ধুদের সঙ্গে মোটরসাইকেলে ঘুরতে বের হয়ে বউবাজার এলাকায় দুর্ঘটনার শিকার হন তিনি। বন্ধুরাই তাঁকে উদ্ধার করে শজিমেক হাসপাতালে নিয়ে যান।
ইরামের বাবা শাহাদৎ জামান মজনুর ভাষ্য, হাসপাতালে নেওয়ার পর এক্স-রে করে চিকিৎসকেরা জানান, তাঁর ছেলের হাঁটুর জোড় সরে গেছে এবং পায়ে ফ্র্যাকচার হয়েছে। এরপর পায়ে প্লাস্টার করে তাঁকে অর্থোপেডিক ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়।
তবে পরিবারের অভিযোগ, বুধবার রাতে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো চিকিৎসক ইরামকে দেখতে আসেননি। এ সময় নার্সরা তাঁর দেখভাল করেন। শুক্রবার সন্ধ্যার পর একজন ইন্টার্ন চিকিৎসক তাঁকে দেখেন। তখন ইরাম জানান, তিনি বাঁ পায়ের আঙুল নাড়াতে পারছেন না। এরপর তাঁকে দ্রুত ঢাকায় নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
শাহাদৎ জামান বলেন, ‘শুক্রবার রাতেই ছেলেকে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হই। শনিবার পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করার পর চিকিৎসা শুরু হয়। কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে।’
পরিবারের দাবি, ঢাকার চিকিৎসকেরা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানান, ইরামের পায়ের একটি নার্ভ ছিঁড়ে গেছে এবং সেখানে পচন ধরেছে। সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় পা কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গত রোববার রাতে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাঁর বাঁ পা কেটে ফেলেন চিকিৎসকেরা।
ছেলের পা হারানোর ঘটনায় ভেঙে পড়েছেন শাহাদৎ জামান। এর মধ্যেই আরেকটি ঘটনায় আরও বিপর্যস্ত হয়েছে পরিবারটি। ইরামকে হাসপাতালে নেওয়ার পর তাঁর চার বন্ধু বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।
পরিবারের ভাষ্য, ইরামকে ট্রলিতে করে ওয়ার্ডে নেওয়ার সময় ট্রলিম্যান ২০০ টাকা বকশিশ দাবি করেন। এ নিয়ে ইরামের বন্ধুদের সঙ্গে তাঁর বাগ্বিতণ্ডা হয়। পরে বিষয়টি শজিমেক হাসপাতালের আনসার সদস্যদের সঙ্গে বিরোধে গড়ায়। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীদের মারধরে চার আনসার সদস্য আহত হন বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।
ওই ঘটনায় করা মামলায় ইরামের চার বন্ধুকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তাঁদের জামিন শুনানির জন্য আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করেছেন আদালত।
শাহাদৎ জামানের কণ্ঠে এখন ক্ষোভের সঙ্গে অসহায়ত্বও। তিনি বলেন, ‘ট্রলিম্যানের বকশিশ দাবির প্রতিবাদ করায় আমার ছেলের বন্ধুরা এখন কারাগারে। আদালত তাঁদের জামিন দিচ্ছে না। আর চিকিৎসকের অবহেলায় আমার ছেলে পঙ্গু হয়ে গেল। একসঙ্গে এত বড় দুই আঘাত কীভাবে সহ্য করব?’
তবে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে শজিমেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মঞ্জুর-ই-মুর্শেদ বলেন, ‘চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ সঠিক নয়। হাসপাতালে ভর্তির পরপরই তাঁকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। শুক্রবার তাঁকে ঢাকায় পাঠানো হয়।’
ইরামের পা কেন কেটে ফেলতে হয়েছে, সে বিষয়ে অর্থোপেডিক বিভাগের চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে বিস্তারিত জানা যাবে বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে, ইরামের চার বন্ধুর জামিন আবেদনের শুনানি আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হবে। আদালত পুলিশের পরিদর্শক শহিদুল ইসলাম বলেন, চার শিক্ষার্থীর জামিনের আবেদন করা হয়েছিল। শুনানির জন্য ২৪ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করেছেন বিচারক।
একদিকে দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে তরুণ বয়সেই একটি পা হারানো, অন্যদিকে সেই দুর্ঘটনার পর হাসপাতালে ঘটে যাওয়া বিরোধের ঘটনায় বন্ধুদের কারাগারে যাওয়া—দুটি ঘটনায়ই এখন অনিশ্চয়তা ঘিরে ধরেছে ইরাম ও তাঁর পরিবারকে। তবে চিকিৎসায় কোনো ধরনের অবহেলা হয়েছিল কি না, আর হলে তার সঙ্গে ইরামের পা হারানোর সম্পর্ক কতটা—এ প্রশ্নের উত্তর পেতে প্রয়োজন চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি, সময়ভিত্তিক চিকিৎসা বিবরণী ও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের বক্তব্যের বিস্তারিত পর্যালোচনা।