স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ১০ জুলাই পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৮১৫ জনে। এর মধ্যে ময়মনসিংহ বিভাগে আক্রান্ত হয়েছেন ২৩৬ জন। আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও মৃত্যুর হার বিশেষভাবে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ বছর দেশে ডেঙ্গুতে মোট ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ময়মনসিংহ বিভাগ ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে পাঁচজন করে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে চারজন, বরিশাল বিভাগে চারজন, খুলনা ও চট্টগ্রাম বিভাগে তিনজন করে এবং ঢাকা বিভাগের (সিটি করপোরেশন এলাকার বাইরে) ও রাজশাহী বিভাগে একজন করে মারা গেছেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ডেঙ্গুর প্রচলিত ধারা বদলে গেছে। একসময় মৌসুমি রোগ হিসেবে বিবেচিত হলেও বর্তমানে ডেঙ্গু বছরজুড়েই জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে। থেমে থেমে বৃষ্টি, জমে থাকা পরিষ্কার পানি এবং অনুকূল তাপমাত্রা এডিস মশার বংশবিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. তারিকুল ইসলাম লিমন বলেন, দুই-তিন দিন পরপর বৃষ্টি এবং এরপর রোদ ওঠার ফলে বিভিন্ন পাত্রে পানি জমে থাকে, যা এডিস মশার প্রজননের আদর্শ ক্ষেত্র। এছাড়া জুন-জুলাই মাসে বাতাসের আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা লার্ভা থেকে পূর্ণাঙ্গ মশায় দ্রুত রূপান্তরের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে।
তিনি আরও বলেন, আগে ধারণা করা হতো এডিস মশা শুধু ভোর ও সন্ধ্যায় সক্রিয় থাকে। তবে নগর এলাকায় কৃত্রিম আলোর প্রভাবে এখন রাতেও এডিস মশার সক্রিয়তা দেখা যাচ্ছে, ফলে সংক্রমণের ঝুঁকিও বেড়ে যাচ্ছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক ও কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, চলতি বছর ঢাকা এবং ঢাকার বাইরের বিভিন্ন এলাকায় এডিস মশার ঘনত্ব আগের বছরের তুলনায় বেশি পাওয়া গেছে। বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী দুই মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে পারে।
তিনি বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। বাড়ি ও আশপাশে জমে থাকা পানি অপসারণ করে মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে সাধারণ মানুষকেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র ফগিং বা ধোঁয়া ছিটিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। মশার উৎস ধ্বংস, লার্ভা নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত নজরদারি, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং জেলা-উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোকে ডেঙ্গু রোগী ব্যবস্থাপনায় আরও প্রস্তুত করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে চলতি বর্ষা মৌসুমে ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। তাই এখনই সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিই হতে পারে ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।