রোববার (১৬ আগস্ট) বগুড়া সদর উপজেলার এরুলিয়ার বানদিঘী এলাকায় পরীক্ষামূলক প্ল্যান্টে উৎপাদিত বিদ্যুৎ দিয়ে দুটি পানির পাম্প ও একটি ওয়েল্ডিং মেশিন চালিয়ে প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা প্রদর্শন করা হয়।
আরডিএ সংশ্লিষ্টদের দাবি, পরীক্ষামূলক পর্যায়ের এ সাফল্য ভবিষ্যতে সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। তাদের পরিকল্পনা, পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের পর এবার ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ১ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি পূর্ণাঙ্গ বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট স্থাপন করা।
সৌরবিদ্যুতের বিকল্প?
আরডিএর ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ড. মো. আব্দুল মজিদ প্রামাণিক বলেন, প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী ফ্লাইহুইল প্রযুক্তিতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় হতে পারে প্রায় ১ টাকা ৫০ পয়সা।
তার দাবি, সার্বক্ষণিকভাবে সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে ১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অবকাঠামো গড়ে তুলতে যেখানে ১০০ কোটি টাকার বেশি প্রয়োজন হতে পারে, সেখানে ফ্লাইহুইল প্রযুক্তিতে একই ক্ষমতার প্ল্যান্ট স্থাপনে আনুমানিক ২৫ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে।
তিনি জানান, ২০০৪ সাল থেকেই এ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ শুরু হয়। ২০১০ সালের পর গবেষণায় নতুন সম্ভাবনা দেখা দেয়। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনসহ বিভিন্ন দেশে ফ্লাইহুইল প্রযুক্তির ব্যবহার রয়েছে বলেও জানান তিনি।
১ মেগাওয়াট ক্ষমতার প্রকল্পটির প্রস্তাব ইতোমধ্যে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এবং জলবায়ু ট্রাস্টে জমা দেওয়া হয়েছে।
১২ বছরের গবেষণা, এবার বড় পরীক্ষার পথে
গবেষণার সঙ্গে যুক্ত আরডিএর উপপরিচালক কৃষিবিদ প্রকৌশলী ড. মনিরুল ইসলাম বলেন, ২০১৪ সাল থেকে তারা প্রযুক্তিটি নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করছেন। ২০২৫ সাল থেকে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম আরও বড় পরিসরে পরিচালিত হচ্ছে।
তার ভাষ্য, প্রয়োজনীয় অর্থায়ন এবং কিছু আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি পাওয়া গেলে স্বল্পমূল্যে উৎপাদিত এই বিদ্যুৎ সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
সরেজমিনে দেখে সন্তুষ্ট এমপি
পরীক্ষামূলক প্ল্যান্টটি পরিদর্শন করেন বগুড়া-৬ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য রেজাউল করিম বাদশা এবং আরডিএর ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ড. মো. আব্দুল মজিদ প্রামাণিক।
পরিদর্শনকালে পরীক্ষামূলক উৎপাদিত বিদ্যুৎ দিয়ে পাম্প ও ওয়েল্ডিং মেশিন চালানোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন তারা।
রেজাউল করিম বাদশা বলেন, কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই উদ্যোগ অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। প্রযুক্তিটিকে বৃহৎ পরিসরে নিয়ে যেতে সরকারের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে।
বগুড়া থেকেই কি বদলাবে বিদ্যুতের হিসাব?
ফ্লাইহুইল প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক সাফল্যের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ শুধু কম উৎপাদন ব্যয়ের দাবি নয়; বরং এর সম্ভাব্য বহুমুখী ব্যবহার। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রযুক্তিটি বাণিজ্যিকভাবে সফল হলে শিল্পকারখানা, কৃষি সেচ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এবং স্থানীয় মেশিনারি শিল্পে এর প্রভাব পড়তে পারে।
তবে ১ টাকা ৫০ পয়সায় প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনের দাবি এখনো পরীক্ষামূলক ও প্রাথমিক হিসাবের পর্যায়ে। প্রযুক্তিটির দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরযোগ্যতা, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, ধারাবাহিক উৎপাদন সক্ষমতা, বড় পরিসরে স্থাপনের বাস্তব খরচ এবং জাতীয় গ্রিডে সংযুক্তির সক্ষমতা—এসব বিষয় স্বাধীন প্রকৌশলগত ও অর্থনৈতিক মূল্যায়নের মাধ্যমে যাচাই করাই হবে পরবর্তী বড় পরীক্ষা।
তারপরও বগুড়ার এরুলিয়ার ছোট্ট পরীক্ষামূলক প্ল্যান্টটি এরই মধ্যে একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে—বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ যদি সত্যিই এতটা কমিয়ে আনা সম্ভব হয়, তাহলে দেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় ফ্লাইহুইল প্রযুক্তি কতটা বড় পরিবর্তন আনতে পারে?
এই প্রশ্নের উত্তর মিলবে প্রযুক্তিটির পরবর্তী বৃহৎ পরিসরের পরীক্ষায়। আর সেই পরীক্ষার সফলতা নির্ধারণ করতে পারে, বগুড়ার বানদিঘীর এই উদ্যোগ কেবল একটি গবেষণাগারের সাফল্য হয়ে থাকবে, নাকি দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের ইতিহাসে নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা করবে।