নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াত নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে বগুড়ায় চালু হয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) বিশেষ মহিলা বাস সার্ভিস। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) সকাল ১০টার দিকে বগুড়া বিআরটিসি ডিপো প্রাঙ্গণে এ সেবার উদ্বোধন করেন বগুড়া-৬ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য রেজাউল করিম বাদশা।
প্রাথমিকভাবে বগুড়ায় দুটি বাস এ সেবায় যুক্ত হয়েছে। এর একটি শেরপুর-মাটিডালি রুটে চলাচল করবে। অন্যটি মোকামতলা-বনানী রুটে চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বগুড়ার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রুটেও এ সেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
শুধু বাস নয়, বদল আসছে মানসিকতায়ও
বগুড়ার রাস্তায় এই গোলাপি বাস শুধু একটি নতুন গণপরিবহন নয়; সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি নারীদের গণপরিবহনে অংশগ্রহণ ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও একটি নতুন বার্তা।
প্রতিদিন স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত কিংবা কর্মস্থলে যেতে গিয়ে গণপরিবহনে নানা বিড়ম্বনার মুখে পড়েন নারী যাত্রীরা। ভিড়, অস্বস্তিকর পরিবেশ, আসন নিয়ে অনিশ্চয়তা কিংবা নিরাপত্তার উদ্বেগ সব মিলিয়ে অনেক নারীকে প্রতিদিনই বাড়তি চাপ নিয়ে যাতায়াত করতে হয়।
বিশেষ মহিলা বাস চালুর ফলে অন্তত নির্দিষ্ট রুটে সেই বাস্তবতার পরিবর্তন ঘটবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বগুড়া মহিলা দলের নেত্রী নাজমা আক্তারের ভাষায়, কর্মজীবী নারীদের প্রতিদিনের যাতায়াতের বড় একটি সমস্যা গণপরিবহনের বিড়ম্বনা। আলাদা বাস সার্ভিস চালু হওয়ায় এই ভোগান্তি অনেকটাই কমবে বলে তিনি আশা করেন।
চালকের আসনে নারী আত্মবিশ্বাসের নতুন গল্প এই সেবার সবচেয়ে ব্যতিক্রমী দিক হলো শুধু যাত্রী নয়, বাস পরিচালনার দায়িত্বেও থাকছেন নারীরা।
বিআরটিসির ট্রেনিং সুপারভাইজার ফেরদৌসী আক্তার দোলন বলেন, নারীদের জন্য এমন একটি বাস সার্ভিস চালু হওয়ায় তারা আনন্দিত। এতে নারীরা নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যে যাতায়াতের পাশাপাশি সম্মানেরও অনুভূতি পাবেন।
বগুড়া বিআরটিসির নারী প্রশিক্ষক সুবর্ণা খাতুনও মনে করেন, এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় সুফল পাবেন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী নারীরা। তবে তিনি বগুড়ায় বাসের সংখ্যা আরও বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন।
শুধু বাস পরিচালনাই নয়, ভবিষ্যতের জন্য নারী চালক তৈরির কাজও চলছে বিআরটিসিতে। প্রশিক্ষিত নারী চালকের সংখ্যা বাড়লে এই সেবার পরিধিও আরও বাড়ানো সম্ভব হবে।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি থেকে সড়কের বাস্তবতায়
বিআরটিসি সূত্র জানায়, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে দেশের বিভিন্ন রুটে নারীদের জন্য বিশেষ বাস সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রাজধানী ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি রুটে প্রাথমিকভাবে ১০টি বাস চালু করা হয়েছে। ঢাকার বাইরে বগুড়া ও চট্টগ্রামে দুটি করে বাসসহ আরও চারটি বাস এই বিশেষ সেবায় যুক্ত হয়েছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য রেজাউল করিম বাদশা বলেন, দেশের তিনটি জেলায় নারীদের জন্য বিশেষ বাস সার্ভিস চালু হচ্ছে। এর মধ্যে বগুড়াও রয়েছে। শেরপুর-মাটিডালি এবং মোকামতলা-বনানী রুটে এ সেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, বাসের চালক, কন্ডাক্টর ও হেলপার সবাই নারী থাকবেন এবং যাত্রীরাও নারী হবেন। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী উল্লেখ করে তিনি বলেন, নারীদের পিছিয়ে রেখে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। পর্যায়ক্রমে দেশের সব এলাকায় এই সেবা চালু হবে বলে তিনি আশা করেন।
ইতিহাসে নতুন নয়, তবে এবার নতুন প্রত্যাশা
নারীদের জন্য আলাদা বাস চালুর উদ্যোগ বাংলাদেশে নতুন নয়। বিআরটিসি সূত্র অনুযায়ী, ১৯৯৮ সালে পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে ২০০১ সালে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় এ সেবা সম্প্রসারণ করা হয়।
বিভিন্ন সময়ে সেবাটি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও ২০২২ সালের অক্টোবরে নারীদের জন্য বিশেষ এই পরিবহনসেবা বন্ধ হয়ে যায়।
চার বছর পর নতুন রঙে, নতুন ব্যবস্থাপনায় আবারও ফিরেছে সেই উদ্যোগ।
গোলাপি বাস কতটা বদলাবে বগুড়ার বাস্তবতা?
একটি বাস দিয়ে শহরের গণপরিবহনের দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। তবে একটি উদ্যোগ অনেক সময় বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।
বগুড়ায় দুইটি বাস দিয়ে শুরু হওয়া এই যাত্রা যদি নিয়মিত ও কার্যকরভাবে পরিচালিত হয়, বাসের সংখ্যা বাড়ানো হয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন রুট যুক্ত করা হয়, তাহলে কর্মজীবী নারী, শিক্ষার্থী ও অন্যান্য নারী যাত্রীদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প গণপরিবহন হয়ে উঠতে পারে।
আর সবচেয়ে বড় কথা বাসের চালকের আসনে একজন নারীকে দেখে হয়তো বগুড়ার কোনো কিশোরী প্রথমবারের মতো ভাববে, “আমি চাইলে আমিও চালকের আসনে বসতে পারি।”
সেই জায়গা থেকেই গোলাপি বাসের গল্পটি কেবল যাতায়াতের গল্প নয়; এটি নারীর নিরাপত্তা, আত্মনির্ভরতা এবং জনপরিসরে সমঅধিকারের গল্পও।