শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬ ২১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
Channel18

আন্তর্জাতিক

যুক্তরাষ্ট্র বদলে যাচ্ছে, টের পাচ্ছেন কী?

যুক্তরাষ্ট্র বদলে যাচ্ছে, টের পাচ্ছেন কী?

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন সাধারণত দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য, প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা এবং কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। কিন্তু এবারের নির্বাচনকে কেবল যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখলে এর গভীর তাৎপর্য বোঝা যাবে না। এর মধ্য দিয়ে প্রকাশ পাচ্ছে আন্তর্জাতিক রাজনীতির বৃহত্তর একটি রূপান্তর, যেখানে উদারনৈতিক বিশ্বায়নের দীর্ঘদিনের প্রভাব দুর্বল হচ্ছে, পশ্চিমা বিশ্বের অভ্যন্তরীণ ঐক্য প্রশ্নের মুখে পড়ছে এবং জাতীয় পরিচয়, ইতিহাস ও সভ্যতাগত স্বাতন্ত্র্য আবারও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে ফিরে আসছে। রাশিয়ার আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক সাময়িকী রাশিয়া ইন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের প্রধান সম্পাদক, কাউন্সিল অন ফরেন অ্যান্ড ডিফেন্স পলিসির প্রেসিডিয়াম চেয়ারম্যান এবং ভালদাই ইন্টারন্যাশনাল ডিসকাশন ক্লাবের গবেষণা পরিচালক ফিওদর লুকিয়ানভ তার আরটিতে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে এই পরিবর্তনের বিষয়টি তুলে ধরেছেন।

তার মূল বক্তব্য হলো, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যতের পাশাপাশি পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থার চরিত্র বুঝতেও গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিচ্ছে।

লুকিয়ানভের বিশ্লেষণে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক প্রভাব আগের তুলনায় কমে এলেও বিশ্বরাজনীতিতে দেশটির গুরুত্ব এখনো যথেষ্ট। ফলে মার্কিন ভোটারদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। অভিবাসন, বাণিজ্যনীতি, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতার মতো বিষয়গুলো মার্কিন নির্বাচনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

তবে তার মতে, এবারের রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সমাজ ও রাজনীতির গভীরে নিহিত। দেশটির রাজনৈতিক মেরুকরণ, সামাজিক বিভাজন এবং প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শিবিরগুলোর সংঘাত আসলে মার্কিন সমাজের মৌলিক পরিবর্তনের বহিঃপ্রকাশ। এই পরিবর্তন বুঝতে হলে শুধু কোন দল নির্বাচনে কতটা সাফল্য পেল, তা দেখলে চলবে না; বরং আমেরিকার সমাজ কোন মূল্যবোধ, পরিচয় ও রাজনৈতিক কাঠামোর ভিত্তিতে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে চায়, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির মধ্যকার প্রচলিত বিভাজন ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে পড়ছে। অতীতে রাষ্ট্রগুলো, বিশেষ করে বৃহৎ শক্তিগুলো, নিজেদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থাকে বহির্বিশ্বের চাপ থেকে কিছুটা আলাদা রাখতে পারত। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ধারণার সঙ্গে এই বিভাজন ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত ছিল।

কিন্তু বিশ্বায়নের ফলে অর্থনীতি, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, তথ্যপ্রবাহ এবং রাজনৈতিক যোগাযোগ এমনভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যে, কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন আর শুধু সেই দেশের বিষয় থাকছে না। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বিভাজন ইউরোপের রাজনীতিকে প্রভাবিত করছে, আবার ইউরোপের রাজনৈতিক অবস্থানও মার্কিন রাজনীতির বিতর্কে জায়গা করে নিচ্ছে। একইভাবে বড় শক্তিগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে। লুকিয়ানভ এই পরিস্থিতিকে উদারনৈতিক বিশ্বায়নের অন্যতম স্থায়ী উত্তরাধিকার হিসেবে দেখেছেন।

বিশেষ করে ১৯৮০-এর দশক থেকে ২০১০-এর দশক পর্যন্ত বিশ্বরাজনীতিতে যে উদারনৈতিক বিশ্বায়নের বিস্তার ঘটেছিল, তার ভিত্তি তৈরি হয়েছিল শীতল যুদ্ধের অবসানের পর। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সমাজতান্ত্রিক শিবিরের পতন পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে এমন একটি ধারণা শক্তিশালী করেছিল যে, বাজার অর্থনীতি এবং উদারনৈতিক গণতন্ত্রই মানবসমাজের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিকাশের চূড়ান্ত মডেল।

এর আগে থেকেই পশ্চিমা দেশগুলোতে নব্য উদারনৈতিক অর্থনৈতিক নীতির প্রসার ঘটছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন সেই নীতির পক্ষে আরও বড় রাজনৈতিক ও আদর্শিক যুক্তি তৈরি করে। পশ্চিমা বিশ্বের একটি প্রভাবশালী অংশ মনে করতে শুরু করে, বাজার অর্থনীতি ও উদারনৈতিক গণতন্ত্রের সমন্বয়ে গোটা বিশ্ব ধীরে ধীরে একই ধরনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর দিকে এগিয়ে যাবে।

এই ধারণার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় একটি অভিন্ন মূল্যবোধ ও নীতির কাঠামো প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। অর্থনৈতিক আন্তনির্ভরশীলতা বাড়লে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সংঘাত কমবে, রাজনৈতিক ব্যবস্থা ক্রমে কাছাকাছি আসবে এবং পশ্চিমা উদারনৈতিক মডেল একসময় বিশ্বজনীন রূপ পাবে—এমন প্রত্যাশাও ছিল। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা সেই প্রত্যাশার বিপরীত দিকে এগোচ্ছে। বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি এক ধরনের অভিন্ন ব্যবস্থার দিকে না গিয়ে বরং ভিন্নতা ও স্বাতন্ত্র্যের দিকে এগোচ্ছে। জাতীয় ইতিহাস, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং নিজস্ব স্বার্থের ভিত্তিতে দেশগুলো নিজেদের অবস্থান নতুন করে নির্ধারণ করতে চাইছে। ফলে বিশ্বায়ন অর্থনৈতিক সংযোগ বাড়ালেও রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অভিন্নতা তৈরি করতে পারেনি।

এই পরিবর্তনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে লুকিয়ানভ যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম ইউরোপের সম্পর্কের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। ঐতিহাসিকভাবে ইউরোপ ও আমেরিকার রাজনৈতিক ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতার মধ্যে পার্থক্য ছিল। কিন্তু কমিউনিজমের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের যৌথ অবস্থান এবং শীতল যুদ্ধে বিজয় তাদের মধ্যে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ঐক্য তৈরি করেছিল। এই ঐক্যের ভিত্তি ছিল অভিন্ন নিরাপত্তা-স্বার্থ, রাজনৈতিক মূল্যবোধ এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় পশ্চিমা প্রভাব বজায় রাখার আকাঙ্ক্ষা।

কিন্তু বর্তমানে সেই ঐক্য দুর্বল হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম ইউরোপের মধ্যে শুধু নীতিগত মতপার্থক্য নয়, বরং রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও অভ্যন্তরীণ সামাজিক এজেন্ডা নিয়েও বিরোধ তৈরি হচ্ছে।

লুকিয়ানভের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ইউরোপের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের একটি অংশ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরোধীদের প্রতি প্রকাশ্য সহানুভূতি দেখাচ্ছে এবং সুযোগ পেলে তাদের রাজনৈতিক অবস্থানকে সহায়তা করার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে ট্রাম্প ও তার সমর্থকেরাও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে নিজেদের প্রভাব বিস্তারে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। ফলে একসময় যে সম্পর্ককে অভিন্ন মূল্যবোধের ভিত্তিতে অবিচ্ছেদ্য পশ্চিমা অংশীদারত্ব হিসেবে তুলে ধরা হতো, সেটি এখন উভয় পক্ষের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে উঠছে।

অর্থাৎ পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে মতপার্থক্য আর শুধু পররাষ্ট্রনীতি, সামরিক সহযোগিতা কিংবা বাণিজ্যিক স্বার্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সমাজ ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ চরিত্র নিয়ে মৌলিক বিতর্ক।

এই বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পশ্চিমা সভ্যতার পরিচয় নিয়ে নতুন করে আলোচনা। লুকিয়ানভ মনে করেন, কয়েক দশক ধরে পশ্চিমা রাজনীতিতে ‘পশ্চিমা সভ্যতা’ ধারণাটি ক্রমে গুরুত্ব হারিয়েছিল। প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সভ্যতার ঐতিহ্য, ইউরোপীয় ইতিহাস, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার পরিবর্তে রাজনৈতিক আলোচনায় সর্বজনীন মানবিক মূল্যবোধের ধারণা বেশি প্রাধান্য পেয়েছিল। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে সভ্যতাগত পার্থক্যকে অনেক সময় পুরোনো বা অগ্রহণযোগ্য ধারণা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। মানবাধিকার, গণতন্ত্র, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং উদারনৈতিক মূল্যবোধকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন এগুলো সব সমাজের জন্য একইভাবে প্রযোজ্য এবং বিশ্বের রাজনৈতিক বিকাশের একমাত্র গ্রহণযোগ্য ভিত্তি।

লুকিয়ানভের ব্যাখ্যায়, এই সর্বজনীন মূল্যবোধের ধারণা পশ্চিমা বিশ্বের ভূরাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্প্রসারণের আদর্শিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। পশ্চিমা দেশগুলো নিজেদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে শুধু একটি কার্যকর মডেল হিসেবে নয়, বরং অন্য সমাজগুলোর জন্যও অনুসরণযোগ্য আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে। কিন্তু বিশ্বব্যাপী প্রভাব বিস্তারের এই প্রচেষ্টার একটি মূল্যও দিতে হয়েছে। তার মতে, পশ্চিমা বিশ্ব ধীরে ধীরে নিজের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি থেকে দূরে সরে গেছে। অর্থাৎ অন্য সমাজের ওপর নিজেদের মূল্যবোধের প্রভাব বিস্তারের প্রক্রিয়ায় পশ্চিমা সমাজের নিজস্ব ঐতিহ্য ও পরিচয়ের প্রশ্নটি অনেকটা আড়ালে চলে গিয়েছিল।

এখন সেই সম্প্রসারণের সময় শেষ হওয়ার মুখে পড়ায় পশ্চিমা সমাজে পরিচয়ের প্রশ্নটি আবার সামনে এসেছে। সমাজগুলো নতুন করে জানতে চাইছে, তাদের স্বাতন্ত্র্য কী, কোন ঐতিহ্য তারা ধরে রাখতে চায় এবং তাদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শিকড় কোথায়। এই প্রশ্ন শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। ইউরোপেও অভিবাসন, জাতীয় সংস্কৃতি, সামাজিক সংহতি এবং রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে বিতর্কের সঙ্গে বিষয়টি যুক্ত। ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতিনিধিদের বক্তব্যে পশ্চিমা সভ্যতার ধারণা নতুন করে গুরুত্ব পাওয়াও এই পরিবর্তনের অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এখানে লক্ষণীয়, পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির উত্থানকে কেবল রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী কৌশল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর পেছনে রয়েছে বিশ্বায়নের দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও রাজনৈতিক অভিঘাত। অর্থনৈতিক আন্তনির্ভরশীলতা রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে যোগাযোগ বাড়িয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে জাতীয় সমাজগুলোর মধ্যে পরিচয় ও স্বার্থের প্রশ্নকে নতুনভাবে সামনে এনেছে।

বিশ্বব্যাপী অভিন্ন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা যখন বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি মেলেনি, তখন বিভিন্ন দেশের মানুষ নিজেদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছে। ফলে নির্বাচনগুলোও ক্রমে অর্থনৈতিক নীতি বা ক্ষমতার প্রতিযোগিতার পাশাপাশি জাতীয় পরিচয় ও সমাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র হয়ে উঠছে।

লুকিয়ানভের মতে, বিভিন্ন দেশের নির্বাচনে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার তীব্রতা এবং ক্ষমতা অর্জনের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলোর প্রায় সব ধরনের কৌশল ব্যবহারের প্রবণতা বৃহত্তর পরিবর্তনের লক্ষণ। এর কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন: বিশ্বব্যাপী দ্রুত পরিবর্তনের মধ্যে একটি সমাজ কীভাবে স্থিতিশীলতা বজায় রাখবে এবং কার্যকর রাষ্ট্র পরিচালনা নিশ্চিত করবে? তার যুক্তি হলো, এই প্রশ্নের উত্তর কোনো বিমূর্ত সর্বজনীন সূত্রের মধ্যে পাওয়া যাবে না। প্রতিটি দেশের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা এবং স্বতন্ত্র পরিচয়ের ভিত্তিতে সেই উত্তর খুঁজতে হবে। অর্থাৎ একটি দেশের জন্য কার্যকর রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো অন্য দেশের ক্ষেত্রেও একইভাবে কার্যকর হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে লুকিয়ানভ বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তনকে সামরিক শক্তি বা ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রচলিত হিসাবের বাইরে নিয়ে গেছেন। সাধারণত বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তন বিশ্লেষণে বৃহৎ শক্তিগুলোর সামরিক সক্ষমতা, অর্থনৈতিক প্রভাব, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং আন্তর্জাতিক জোটের পরিবর্তনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু তার মতে, রাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরীণ সামাজিক ও রাজনৈতিক রূপান্তরও উদীয়মান বিশ্বব্যবস্থার ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। কোনো বৃহৎ শক্তির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা, জাতীয় পরিচয় নিয়ে বিভক্তি কিংবা পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকারে পরিবর্তন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রচলিত কাঠামোকেও প্রভাবিত করতে পারে। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি দেশের মধ্যবর্তী নির্বাচনও বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে উঠছে।

এই বিশ্লেষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য হলো, বিশ্ব এখন এমন এক পর্যায়ে প্রবেশ করছে, যেখানে আন্তসংযোগ ও জাতীয় স্বাতন্ত্র্যের আকাঙ্ক্ষা একই সঙ্গে শক্তিশালী হচ্ছে। একদিকে অর্থনীতি, প্রযুক্তি, যোগাযোগ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কারণে কোনো দেশই পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন থাকতে পারছে না। অন্যদিকে দেশগুলো নিজেদের জাতীয় স্বার্থ, রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষায় আরও সচেতন হয়ে উঠছে। এই দুই প্রবণতার মধ্যে একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব রয়েছে। বিশ্ব যত বেশি সংযুক্ত হচ্ছে, রাষ্ট্রগুলো তত বেশি নিজেদের স্বতন্ত্র অবস্থান প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। ফলে আন্তনির্ভরশীলতা বাড়লেও রাজনৈতিক অভিন্নতা তৈরি হচ্ছে না।

ফিওদর লুকিয়ানভের বিশ্লেষণ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তন শুধু শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর ক্ষমতার পুনর্বণ্টনের মধ্য দিয়ে ঘটে না; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সমাজের অভ্যন্তরীণ রূপান্তর, রাজনৈতিক মূল্যবোধের পরিবর্তন এবং জাতীয় পরিচয়ের নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণের প্রক্রিয়া। শীতল যুদ্ধের পর যে উদারনৈতিক বিশ্বায়নকে বিশ্বরাজনীতির অনিবার্য ভবিষ্যৎ বলে মনে করা হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতি সেই ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। পশ্চিমা বিশ্বের অভ্যন্তরীণ বিভাজন এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ সম্পর্কের টানাপোড়েনও সেই পরিবর্তনের অংশ। এখন রাষ্ট্রগুলো একই সঙ্গে বৈশ্বিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকতে এবং নিজেদের স্বার্থ ও পরিচয়ের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে চাইছে। লুকিয়ানভের মতে, এটাই নতুন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় বৈপরীত্য। আর এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি বড় নির্বাচন এখন শুধু আমেরিকার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ঘটনা নয়, বরং পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থার গতিপথ বোঝারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।

আরও

শিক্ষা, চাকরি ও বাসস্থানের দাবিতে রাস্তায় ইউরোপের তরুণেরা

আন্তর্জাতিক

শিক্ষা, চাকরি ও বাসস্থানের দাবিতে রাস্তায় ইউরোপের তরুণেরা

ভালো শিক্ষা, চাকরি ও কম খরচে বাসস্থানের দাবিতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ করছেন তরুণেরা। ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি, স্প...

২০২৬-১০-২৯ ১৪:০৮

‘সরকার পরিবর্তনের’ আতঙ্ক মোদি সরকারের দুর্বলতারই প্রকাশ

আন্তর্জাতিক

‘সরকার পরিবর্তনের’ আতঙ্ক মোদি সরকারের দুর্বলতারই প্রকাশ

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সামনে এখন এমন এক রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়...

২০২৬-১০-২১ ১৫:৪৭

ইয়েমেনের বিদ্রোহীদের ভয়ে বিনিয়োগ সম্মেলন স্থগিত করল সৌদি আরব

আন্তর্জাতিক

ইয়েমেনের বিদ্রোহীদের ভয়ে বিনিয়োগ সম্মেলন স্থগিত করল সৌদি আরব

ইরান-সমর্থিত হুথিদের সৌদি আরবের ওপর প্রাণঘাতী হামলা অব্যাহত থাকায় দেশটির ‘ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ (এফআইআই) সম্...

২০২৬-১০-২০ ১৪:১৭

ফ্রান্সজুড়ে সংঘর্ষ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ, গ্রেপ্তার অন্তত ১২০০

আন্তর্জাতিক

ফ্রান্সজুড়ে সংঘর্ষ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ, গ্রেপ্তার অন্তত ১২০০

স্কুলের দুরবস্থা ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে ফ্রান্সজুড়ে সংঘর্ষ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘট...

২০২৬-১০-১৮ ১৩:৫৭