সৌদি আরব-সমর্থিত ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার এবং হুথিদের মধ্যে সংঘাত জুলাই থেকে চলছে। সেপ্টেম্বরে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়। ওই সময় ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের পুরো নিয়ন্ত্রণ নেয় বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি।
গত মাসে সৌদি আরবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন অবকাঠামো ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের পাম্পিং স্টেশনগুলোতে পরিকল্পিত হামলা চালায় হুথিরা। জেনেভাভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা অরোরা জিওসিগন্যাল ইন্টেলিজেন্সের এক তদন্তে বলা হয়েছে, হামলার কয়েক দিন আগে থেকেই রাশিয়ার স্যাটেলাইটগুলো ওই এলাকা পর্যবেক্ষণ করছিল। পাইপলাইন সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের জন্যই এই নজরদারি চালানো হয়েছিল বলে তদন্তে দাবি করা হয়েছে।
ইয়েমেনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে হুথি ও সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর লড়াই অব্যাহত রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে হুথিদের প্রতি রাশিয়ার সমর্থন কতটা গুরুত্বপূর্ণ? উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যতম শক্তিশালী দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র সৌদি আরব কেন বিদ্রোহী যোদ্ধাদের ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে?
এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত যা জানা গেছে, তা তুলে ধরা হলো।
রুশ স্যাটেলাইট ব্যবহারের তদন্তে কী উঠে এসেছে?
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহে অরোরা জিওসিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স একটি তদন্তের ফল প্রকাশ করেছে। এতে ১ জুলাই থেকে ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত সৌদি আরবে হুথিদের চালানো ৪০টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
তদন্তে প্রতিটি হামলার আগে ও পরে লক্ষ্যবস্তু এলাকাগুলোতে রাশিয়ার সরকারি ও সামরিক স্যাটেলাইটের নজরদারির ধারাবাহিকতা পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা নাওয়াফ ওবাইদ আল-জাজিরাকে বলেন, রাশিয়ার সামরিক গোয়েন্দা কাঠামো বিশ্লেষণ করে তাঁরা পৃথক স্যাটেলাইট শনাক্ত করেছেন। সেগুলোর কক্ষপথের গতিপথ হিসাব করেছেন। এরপর স্যাটেলাইটগুলোর পর্যবেক্ষণ কার্যক্রমের সঙ্গে সৌদি আরব, জর্ডান, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইয়েমেনের সামরিক ঘটনাবলির সম্পর্ক খুঁজে দেখেছেন।
ওবাইদ জানান, তাঁদের শনাক্ত করা স্যাটেলাইটগুলোর মধ্যে রয়েছে রাশিয়ার বার্স-এম সামরিক মানচিত্র তৈরির স্যাটেলাইট, পারসোনা অপটিক্যাল রিকনিস্যান্স স্যাটেলাইট, লোটোস-এস১ ইলেকট্রনিক গোয়েন্দা স্যাটেলাইট, পিওন-এনকেএস সামুদ্রিক গোয়েন্দা ব্যবস্থা এবং কনডর-এফকেএ রাডার ইমেজিং স্যাটেলাইট। এ ছাড়া ইকেএস/টুন্ড্রা ইনফ্রারেড আগাম সতর্কতাব্যবস্থাও তাঁরা পরীক্ষা করেছেন।
ওবাইদের ভাষায়, ‘গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারটি শুধু পৃথক রুশ স্যাটেলাইটের উপস্থিতি নয়। বরং এসব স্যাটেলাইটের পরিপূরক গোয়েন্দা সক্ষমতা এবং সেগুলোর সমন্বিত ব্যবহারের বিষয়টি।’
তিনি আল-জাজিরাকে আরও বলেন, তাঁদের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাশিয়ার সামরিক ভূস্থানিক ও সংকেতভিত্তিক গোয়েন্দা তথ্য ইয়েমেনে হুথিদের কার্যক্রমে সহায়তাকারী ইরান-নেতৃত্বাধীন গোয়েন্দা কাঠামোকে সমর্থন দিয়েছে।
ওবাইদের মতে, এর সবচেয়ে স্পষ্ট কার্যগত উদাহরণ দেখা গেছে ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূল বরাবর বাব আল-মানদেব প্রণালির দিকে হুথিদের অভিযানে। রাশিয়ার গোয়েন্দা তথ্য, ইরানি কমান্ডের সঙ্গে সমন্বয় এবং স্থানীয় মানব গোয়েন্দা তথ্য—এই তিনটির সমন্বয় বিপরীত পক্ষের ইয়েমেনি বাহিনীগুলোর যুদ্ধক্ষেত্রের সমন্বয় দুর্বল করে দিয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি, সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ক্ষেত্রেও এই গোয়েন্দা সম্পর্ক প্রাসঙ্গিক। রাশিয়ার সামরিক গোয়েন্দা ব্যবস্থা সাধারণ বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট চিত্রের তুলনায় অনেক উন্নত তথ্য দিতে পারে। বিশেষ করে অপটিক্যাল, রাডার ও ইলেকট্রনিক গোয়েন্দা তথ্য একসঙ্গে ব্যবহার করা হলে।’
ওবাইদ আরও বলেন, সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে সেপ্টেম্বরে চালানো হামলা লক্ষ্যবস্তু নির্বাচনের ক্ষেত্রে হুথিদের সক্ষমতার জটিলতা তুলে ধরেছে।
ওই সময় পাইপলাইনটির পশ্চিমাংশের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পাম্পিং স্টেশনে হামলা চালানো হয়। এগুলো হলো আফিফের পিএস৮, আল-ধেকরার পিএস৯ এবং আল-মেসবা'আর পিএস১১। স্টেশনগুলো পাইপলাইনের গুরুত্বপূর্ণ ও তুলনামূলক উঁচু এলাকায় অবস্থিত।
ওবাইদের ব্যাখ্যা, ‘এই তিনটি স্থাপনা বেছে নেওয়ার মধ্য দিয়ে অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং কৌশলগত গুরুত্ব সম্পর্কে হুথিদের ধারণার প্রতিফলন ঘটেছে।’
তদন্তের প্রতিবেদন কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
ব্রাসেলসভিত্তিক সামরিক বিশ্লেষক এলিজা ম্যাগনিয়ার মনে করেন, অরোরার অনুসন্ধান থেকে পুরো চিত্র পাওয়া যায় না।
তিনি বলেন, ‘গোয়েন্দা তথ্যের আদান-প্রদান ঠেকানো যায়নি—এমন প্রমাণ থেকে এটা নিশ্চিত হওয়া যায় না যে রুশ স্যাটেলাইটের তথ্যে কারা প্রবেশাধিকার পেয়েছিল, রাশিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে তথ্য ভাগ করেছে, নাকি ইরান নিজেরাই তা সংগ্রহ করেছে।’
ম্যাগনিয়ার এ ক্ষেত্রে চারটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেন।
প্রথমত, রাশিয়া সরাসরি ইরানের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় করে থাকতে পারে।
দ্বিতীয়ত, ইরান বাণিজ্যিক চ্যানেলের মাধ্যমে রাশিয়ার স্যাটেলাইটের ছবি সংগ্রহ করে থাকতে পারে। তবে রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর গোয়েন্দা চিত্র সাধারণত জনসাধারণের জন্য সহজলভ্য নয়। তাই বাণিজ্যিক স্যাটেলাইটের ছবি পাওয়া মানেই রুশ সরকারের সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয় না।
তৃতীয়ত, ইরান কোনো মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে থাকতে পারে। তাত্ত্বিকভাবে কোনো তৃতীয় পক্ষ রুশ ব্যবস্থায় তৈরি গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করতে পারে। তবে বর্তমানে এ ধরনের ব্যবস্থার পক্ষে প্রকাশ্যে যাচাইযোগ্য কোনো প্রমাণ নেই।
অন্যদিকে নাওয়াফ ওবাইদ বলেছেন, রাশিয়ার সমর্থিত গোয়েন্দা অবকাঠামোর অস্তিত্ব এবং কোনো নির্দিষ্ট রুশ স্যাটেলাইট থেকে হুথিদের একটি নির্দিষ্ট হামলার লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের তথ্য পাওয়ার বিষয়টি এক নয়।
তিনি বলেন, ‘আমাদের মূল্যায়নে বৃহত্তর গোয়েন্দা সম্পর্কের বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট কোনো ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের ক্ষেত্রে স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া তথ্যকে দায়ী করতে হলে আরও প্রমাণ প্রয়োজন।’
এদিকে সৌদি আরবের একজন কর্মকর্তা, হুথিদের একজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা এবং আরও একজন কর্মকর্তাসহ মোট তিনজন কর্মকর্তা এপি-কে জানিয়েছেন, হুথি ও ইরানের অন্যান্য মিত্রগোষ্ঠী রাশিয়ার গোয়েন্দা সক্ষমতার পাশাপাশি চীনের সক্ষমতা থেকেও সুবিধা পাচ্ছে। একজন বেসরকারি গোয়েন্দা বিশ্লেষকও বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
গত সপ্তাহে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগবিষয়ক উপমন্ত্রী রায়েদ ক্রিমলি সাংবাদিকদের বলেন, হুথিরা রাশিয়া ও চীনের কাছ থেকে গোয়েন্দা তথ্য পাচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে এসব বিষয় নিয়ে নিয়মিত আলোচনা করি। ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত রাখব।’
ইরান ও হুথিদের জন্য রুশ স্যাটেলাইটের তথ্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
অরোরার তদন্তের বিষয়ে রাশিয়ার কর্মকর্তারা এখনো কোনো মন্তব্য করেননি। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাশিয়া ও ইরানের সামরিক ও প্রযুক্তিগত সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে গভীর হয়েছে। যৌথ কৌশলগত চুক্তি, মহাকাশ খাতে সহযোগিতা এবং প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি বিনিময়ের মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক আরও জোরদার হয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইয়েমেনবিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক আহমেদ নাগি বলেন, মস্কো যদি হুথিদের মতো তেহরানের মিত্রদের সহায়তা করে থাকে, তবে তা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এর ফলে ইয়েমেন সংঘাতের গতিপথ বদলে যেতে পারে।
আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘ইয়েমেনের সংঘাত ক্রমেই অভ্যন্তরীণ সীমা ছাড়িয়ে বৃহত্তর আঞ্চলিক পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। হুথিদের সমর্থন করা এখন আর শুধু ইরানের একার স্বার্থের বিষয় নয়। আমরা দেখছি, রাশিয়ার মতো অন্য পক্ষও ইরানকে গোয়েন্দা সহায়তা ও অত্যাধুনিক অস্ত্র সরবরাহ করছে। এর সুফল পাচ্ছে হুথিরাও।’
নাগি বলেন, ‘প্রশ্ন হলো, এই সহায়তা সরাসরি হুথিদের কাছে যাচ্ছে, নাকি ইরানের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে পৌঁছাচ্ছে। আমার মনে হয় না, এই পার্থক্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। মূল বিষয় হলো, বিভিন্ন দেশের কাছ থেকে ক্রমবর্ধমান ও বৈচিত্র্যময় সহায়তা পাচ্ছে হুথিরা।’
তবে তাঁর সতর্কতা, হুথিদের প্রতি রাশিয়ার সমর্থনের প্রভাব শুধু সৌদি আরবের ওপর নয়, ইয়েমেন সরকারের ওপরও পড়বে।
নাগি আরও বলেন, কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও রাশিয়ার ভূমিকা বিস্তৃত। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে হুথিদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর আন্তর্জাতিক পদক্ষেপের বিরোধিতা করে আসছে মস্কো। সব মিলিয়ে এসব ঘটনা হুথিদের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক আরও বিস্তৃত হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সৌদি আরবে কোথায় কোথায় হামলা চালিয়েছে হুথিরা?
গ্রীষ্মকালে সংঘাত তীব্র হওয়ার পর থেকে সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইয়েমেনের হুথিরা। এসব লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে রয়েছে দেশটির পূর্ব ও পশ্চিম উপকূল, রাজধানী রিয়াদ এবং দক্ষিণাঞ্চল।
শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে হুথি মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেন, সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও সামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালানো হয়েছে। এসব লক্ষ্যবস্তু পূর্ব ও পশ্চিম উপকূল থেকে শুরু করে রিয়াদ ও দক্ষিণাঞ্চলীয় নাজরান পর্যন্ত বিস্তৃত।
সারি জানান, হুথিরা রাস তানুরা তেল শোধনাগারে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। আবকাইকে সৌদি আরামকোর একটি স্থাপনায়ও একটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে।
এ ছাড়া রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র, দাম্মামের কিং ফাহদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি ড্রোন এবং রাবিঘ তেল শোধনাগারে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার দাবি করেন তিনি। নাজরান অঞ্চলে সৌদি সামরিক সদর দপ্তরেও হামলা চালানো হয়েছে বলে জানান সারি।
তবে এসব নির্দিষ্ট হামলার দাবির পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে সৌদি আরবে হুথিদের হামলায় প্রাণহানি ও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সৌদি কর্মকর্তাদের দাবি, চলতি মাসের শুরুতে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ভয়াবহ হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত এবং ৩০০ জন আহত হয়েছেন।
হামলার পর বিমানবন্দরটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর ফলে সৌদি আরবের প্রধান বিনিয়োগ সম্মেলন ২০২৭ সাল পর্যন্ত স্থগিত করতে হয়। পাশাপাশি হাজার হাজার যাত্রীর ভ্রমণ পরিকল্পনা ব্যাহত হয়।
পরে বিমানবন্দরটি আবার খুলে দেওয়া হয়। রবিবার থেকে সেখানে ফ্লাইট চলাচলও শুরু হয়েছে। তবে হুথিরা যাত্রীদের বিমানবন্দরটি এড়িয়ে চলার সতর্কবার্তা দিয়েছে। তাদের ভাষায়, স্থাপনাটি একটি ‘সামরিক লক্ষ্যবস্তু’।
এর আগে ২১ অক্টোবর দাম্মামের কিং ফাহদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় দুজন নিহত এবং আটজন আহত হন।
হুথিরা এত সুসজ্জিত হলো কীভাবে?
২০১৪ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানা এবং দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে হুথিরা। এরপর থেকে নিজেদের ইয়েমেনের বৈধ শাসক কর্তৃপক্ষ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে গোষ্ঠীটি।
রাজধানী ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর ইয়েমেনের সেনাবাহিনীর বিশাল অস্ত্রভান্ডারের নাগাল পায় হুথিরা। একই সঙ্গে সাবেক প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহর অনুগত বাহিনীর সঙ্গে জোট গঠন করে তারা।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার এডেনে নিজেদের কার্যক্রম সরিয়ে নেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, একসময় সম্পদ ও সামরিক সক্ষমতার দিক থেকে দুর্বল বলে বিবেচিত হুথিরা এখন অনেক বেশি শক্তিশালী। ইয়েমেনের রাষ্ট্রীয় অস্ত্রভান্ডার দখল, ইরানের সহায়তা এবং নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে তারা এই অবস্থানে পৌঁছেছে।
স্ট্র্যাটেজিকএরো রিসার্চের প্রধান বিশ্লেষক সাজ আহমেদ আল-জাজিরাকে বলেন, অস্ত্র তৈরির কৌশল শেখার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সংগ্রহের জন্য আন্তর্জাতিক কালোবাজার চষে বেড়িয়েছে হুথিরা। অস্ত্র বিক্রির জন্য একটি গোপন কিন্তু শক্তিশালী বাজারও গড়ে তুলেছে তারা। এসব সক্ষমতা অর্জনে বহু সামরিক সংঘর্ষের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়েছে গোষ্ঠীটি।
সাজ আহমেদ বলেন, ‘হুথিরা একদিকে তাদের অস্ত্রভান্ডার ব্যবহার করছে, অন্যদিকে নিজেদের সামরিক সক্ষমতার উন্নয়ন ও সম্প্রসারণও করছে। ইসরায়েলের মতো দূরবর্তী স্থানে তাদের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এর প্রমাণ পাওয়া গেছে। ফলে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানাও তাদের জন্য তুলনামূলক সহজ।’
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের আহমেদ নাগি বলেন, ২০২২ সালে হুথি ও সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। চলতি বছরের শুরু পর্যন্ত তা অব্যাহত ছিল। ওই সময় ইয়েমেন সরকারের অনেকেই আশা করেছিলেন, যুদ্ধবিরতির মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক সমাধানের পথ তৈরি হবে।
কিন্তু এই সময়কে সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর কাজে ব্যবহার করেছে হুথিরা। সংঘাত আবার শুরু হলে কীভাবে মোকাবিলা করতে হবে, সে প্রস্তুতিও নিয়েছে তারা।
নাগি বলেন, ‘তুলনামূলক শান্ত এই সময়কে নিজেদের সামরিক অবস্থান শক্তিশালী করতে কাজে লাগিয়েছে হুথিরা। গত কয়েক সপ্তাহে তাদের প্রস্তুতির ব্যাপকতা স্পষ্ট হয়েছে। বাহিনী উল্লেখযোগ্য সামরিক সক্ষমতা দেখিয়েছে। এর ফলে তারা বিভিন্ন এলাকায় অগ্রসর হতে এবং ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পেরেছে।’
তবে সামরিক বিশ্লেষক এলিজা ম্যাগনিয়ারের মতে, হুথিদের অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র পরিচালনা ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের প্রযুক্তি এখনো অনেকাংশে বিদেশি দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল।
ইরানের কাছ থেকে ব্যাপক সামরিক সহায়তা, প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র পেয়ে থাকে হুথিরা। এসব অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে ইরানে তৈরি বা ইরান থেকে সংগ্রহ করা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং একমুখী আক্রমণকারী ড্রোন। প্যালেস্টাইন-২ ও তুফান ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থাও এর মধ্যে রয়েছে। তবে এসব অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে অস্বীকার করে আসছে ইরান।
ম্যাগনিয়ার বলেন, ইরানের পাশাপাশি লেবাননে তাদের মিত্র সংগঠন হিজবুল্লাহও হুথিদের সামরিক প্রশিক্ষণ ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা দিয়ে সহায়তা করেছে।
তিনি বলেন, ‘ইসরায়েলের বিরুদ্ধে লড়াই থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ইয়েমেনের আনসার আল্লাহকে (হুথিদের অপর নাম) সহায়তা করা হয়েছে।’
ম্যাগনিয়ার আরও বলেন, এই সহযোগিতা ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। সামরিক কর্মী বিনিময়ের মাধ্যমে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অভিযান পরিচালনার অভিজ্ঞতাও অর্জন করেছে হুথিরা।
তাঁর মতে, নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতার এই সমন্বয়ই ব্যাখ্যা করে, কেন বছরের পর বছর সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযান চালিয়েও হুথিদের সামরিক শক্তি নির্মূল করা যায়নি। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলাও তাদের সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করতে পারেনি।
সৌদি আরব কীভাবে হুথিদের হামলার জবাব দিচ্ছে?
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনে হুথিদের অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলা ও সামরিক অভিযান চালিয়ে আসছে।
শুক্রবার জোট জানিয়েছে, সৌদি আরবের মক্কা অঞ্চলের দিকে পাঠানো হুথিদের একটি ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে।
জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে জানান, শুক্রবার সকালে ড্রোনটি ‘আটক ও ধ্বংস করা হয়েছে’। এর আগে পশ্চিম সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্রও ভূপাতিত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
এদিকে রিয়াদ-সমর্থিত ইয়েমেন সরকার ও ইরান-সমর্থিত হুথিদের মধ্যে সংঘাত ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানায়, দেশটির পূর্বাঞ্চল লক্ষ্য করে ছোড়া হুথিদের একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা হয়েছে। পরে রিয়াদের দিকে ছোড়া আরও দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত ও ধ্বংস করার কথা জানায় তারা।
শুক্রবার ভোরে আল-মালকি জানান, পশ্চিম সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে ছোড়া হুথিদের একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে জোটের বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা।
সোমবার আল-মালকি আরও জানান, তাঁদের বাহিনী হুথিদের চারটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপক এবং ক্ষেপণাস্ত্র মজুতের কাজে ব্যবহৃত পাঁচটি সুড়ঙ্গ ধ্বংস করেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, জোট বাহিনী একটি ক্ষেপণাস্ত্রের গুদামেও হামলা চালিয়েছে। এই অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল ‘হুথি মিলিশিয়াদের নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোর মধ্যে তাদের সরবরাহ লাইন বিচ্ছিন্ন করা’।
অভিযানে ইয়েমেনের সম্মুখযুদ্ধের বিভিন্ন এলাকায় হুথিদের সামরিক ঘাঁটি, সদস্যদের সমাবেশস্থল এবং সামরিক সরঞ্জামও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
সোমবার আল-মালকি আরও বলেন, সৌদি বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ‘সন্ত্রাসী হুথি মিলিশিয়াদের রিয়াদের দিকে ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত ও ধ্বংস করেছে’।
এদিকে চলতি মাসে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী হুথিদের দখলে থাকা এলাকা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ‘অপারেশন ইয়েমেন ডন’ নামে পাল্টা অভিযান শুরু করেছে।
রবিবার সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট জানায়, তাদের বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা অন্তত ১০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে।
সৌদি আরবের বেসামরিক প্রতিরক্ষা সংস্থা জানিয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষের আঘাতে দুজন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া কয়েকটি ভবন ও যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
হুথিদের নিয়ন্ত্রণে আনতে কেন হিমশিম খাচ্ছে সৌদি আরব?
তেহরানে সৌদি ও ইরানি কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণে সাম্প্রতিক বৈঠকসহ বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক উদ্যোগের লক্ষ্য দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা কমানো। তবে বিশ্লেষকদের মতে, হুথিরা সৌদি আরবের সামরিক সংযম এবং বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়মিত পরীক্ষা করছে।
এর ফলে ইয়েমেনের সংঘাত রিয়াদের জন্য বৃহত্তর জাতীয় নিরাপত্তার পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
এলিজা ম্যাগনিয়ারের মতে, সৌদি আরবের সমস্যার অন্যতম কারণ হলো শুধু বিমান হামলা চালিয়ে কোনো যুদ্ধে জয়ী হওয়া যায় না।
তিনি বলেন, ‘বিমান হামলা স্থলবাহিনীকে বিমানবাহিনীর কার্যক্রমের সুযোগ কাজে লাগাতে সাহায্য করে এবং তাদের সামনে অগ্রসর হওয়ার পথ তৈরি করে। কিন্তু স্থলবাহিনী যদি সামনে এগিয়ে যেতে, আত্মত্যাগ করতে এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি মেনে নিতে প্রস্তুত না থাকে, তাহলে সৌদি আরব কেন হিমশিম খাচ্ছে, তা নিয়ে অবাক হওয়ার কিছু নেই।’
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের আহমেদ নাগিও একই ধরনের মত দিয়েছেন। তাঁর মতে, সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনের সরকারি শিবিরও নানা ভাগে বিভক্ত। তাদের সংগঠন দুর্বল এবং সামরিক প্রস্তুতিও পর্যাপ্ত নয়।
নাগি বলেন, ‘ধারণা করা হয়েছিল, দ্রুত সমাধান—বিশেষ করে তীব্র বিমান হামলা—দ্রুত সাফল্য এনে দেবে। কিন্তু ইয়েমেন সরকার ও তাদের মিত্ররা হুথিদের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার মতো সামরিক সক্ষমতা ও সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারেনি।’
বিশ্লেষক সাজ আহমেদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কাছ থেকে অস্ত্র কেনার পেছনে শত শত কোটি ডলার ব্যয় করলেও সৌদি আরব সেগুলোর কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারেনি।
তিনি বলেন, ‘হুথিরা ইরানের সামরিক কৌশলবিদদের কাছ থেকে যেমন শিখেছে, তেমনি সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর ইরাকে বছরের পর বছর মার্কিন সেনাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা বিভিন্ন মিলিশিয়ার কাছ থেকেও অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে।’
সাজ আহমেদ আরও বলেন, ‘এই সময়ে সৌদি সরকার বিপুল পরিমাণ অস্ত্র কিনেছে। কিন্তু সেগুলো কীভাবে ব্যবহার ও মোতায়েন করতে হয়, সে বিষয়ে তাদের দক্ষতা সীমিত। হুথিদের মতো একটি গেরিলা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কার্যকরভাবে লড়াই করার সক্ষমতাও তাদের আরও কম।’
সবশেষে তিনি বলেন, ‘রিয়াদ যখন অবরুদ্ধ, তখন সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো সৌদি আরবও শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে চলে গেলে আমি অবাক হব না।’
সূত্র: আল-জাজিরা