রাজধানীর সদরঘাট এলাকায় খুচরা তরমুজ বিক্রি করেন আকবর আলী। তিনি বাজারের সবচেয়ে বড় সাইজের (১০ থেকে ১২ কেজি) তরমুজ প্রতি পিস ৫৫০ থেকে ৬৫০ টাকায় বিক্রি করছেন। মাঝারি সাইজের (৮ থেকে ১০ কেজি) তরমুজ বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকায়, আর ছোট সাইজের (৪ থেকে ৭ কেজি) প্রতি পিস তরমুজের দাম ২০০ থেকে ৩০০ টাকা।
মাঠজুড়ে তরমুজের বাম্পার ফলন এবং ভরা মৌসুম চলার পরও রাজধানীর বাজারগুলোতে তরমুজের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। পাইকারি আড়ত থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরত্বের খুচরা বাজারে একই তরমুজের দাম বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে। সদরঘাট ও বাদামতলী এলাকার বাজার ঘুরে দেখা গেছে, পাইকারিতে যে বড় তরমুজ ২৮০-২৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, খুচরা বাজারে তা ৫৫০-৬৫০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে
আকবর আলীর দোকান থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বাদামতলী, যা ফলের বৃহত্তম পাইকারি আড়ত হিসেবে পরিচিত। বাদামতলীর ওয়াইজঘাটে দেশের সবচেয়ে বড় তরমুজের পাইকারি বাজার বসে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত, বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের চর এলাকা থেকে চাষিরা এখানে তরমুজ নিয়ে আসেন। এই বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটি আড়তে সবচেয়ে বড় সাইজের (১০ থেকে ১২ কেজি) তরমুজ প্রতি পিস ২৮০ থেকে ২৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মাঝারি সাইজ (৮ থেকে ১০ কেজি) ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা এবং সবচেয়ে ছোট সাইজের (৪ থেকে ৭ কেজি) তরমুজ বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৮০ টাকায়।
মাত্র এক কিলোমিটারের ব্যবধানে প্রতি পিস তরমুজে খুচরা বিক্রেতারা ক্রেতাদের কাছ থেকে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নিচ্ছেন। শুধু আকবর আলীই নন, গুলিস্তান ও পল্টন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটি খুচরা দোকানে পাইকারি বাজারের তুলনায় দ্বিগুণ দামে তরমুজ বিক্রি হচ্ছে।
পাইকারি থেকে খুচরা বাজারে প্রতি পিস তরমুজে দ্বিগুণ দাম নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে আকবর আলী বলেন, ‘আমরা যে পাইকারি বাজার থেকে তরমুজ কিনে আনি, তার মধ্যে অনেক তরমুজ গরমে নষ্ট হয়ে যায়। অনেক তরমুজের ভেতর লাল না হওয়ায় ক্রেতারা দরদাম করার পরও নিতে চান না। এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ভালো তরমুজের ওপর বাড়তি দাম ধরতে হয়। এছাড়া, আমাদের পরিবহন খরচ ও জায়গার ভাড়াও আছে, তাই তরমুজের দাম একটু বেশি।’
ওয়াইজঘাট সংলগ্ন নাইম-মুন্না ফুড স্টোরের ম্যানেজার আল-আমিন ঢাকা বলেন, ‘ব্যাপারিরা সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে তরমুজ নিয়ে আমাদের এখানে আসেন। আমরা আড়তদাররা তাদের তরমুজ বিক্রি করে দিয়ে মাত্র ১০ শতাংশ কমিশন নিই। বাজারে মালের আমদানির ওপর তরমুজের দাম ওঠানামা করে। এখন তরমুজের ভরা মৌসুম চললেও দাম চড়া। আমরা পাইকারি বিক্রি করি, আমাদের কাছ থেকে খুচরা বিক্রেতারা কিনে নিয়ে ভোক্তাদের কাছে বিক্রি করেন।’
পটুয়াখালীর সরাসরি খেত থেকে ঢাকায় তরমুজ নিয়ে আসা ব্যাপারি জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘চাষিদের কাছ থেকে সবচেয়ে বড় সাইজের তরমুজটি ১৮০ থেকে ২০০ টাকায় কিনতে হয়। এরপর ঢাকায় নিয়ে আসতে অনেক টাকা খরচ হয়ে যায়। হিসাব করলে, শুধুমাত্র পরিবহন বাবদই প্রতি পিস বড় তরমুজে ৩০ থেকে ৩২ টাকা ব্যয় হয়। এরপর দুই-তিন ধাপে শ্রমিক বাবদও অনেক টাকা খরচ হয়। এই কারণে ১০ থেকে ১২ কেজি ওজনের তরমুজের প্রতি ১০০ পিস ২৮ থেকে ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি না করলে আমাদের লোকসান হয়।’
তরমুজের আকাশচুম্বী দামের কারণে আস্ত তরমুজ কিনতে না পেরে অনেকে ফুটপাতে পিস হিসেবে বিক্রি করা তরমুজ খেয়ে তৃষ্ণা মেটানোর চেষ্টা করছেন। মেস বা একাকী বসবাসকারীরা অপচয় ও অর্থ সাশ্রয়ের কথা ভেবে ২০-৩০ টাকা দিয়ে পিস করে কাটা তরমুজ কিনছেন। তীব্র রোদ ও গরমে ফুটপাতের এসব দোকানে ক্রেতাদের ভিড় লেগেই থাকছে, যা সাময়িক স্বস্তি দিলেও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি দূর করছে না
সূত্রাপুর থেকে সদরঘাটে তরমুজ কিনতে আসা আনোয়ার হোসেন জানান, খুচরা বাজারে প্রতি পিস তরমুজের দাম পাইকারি বাজারের চেয়ে ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দিয়ে আমাদের কিনতে হচ্ছে। পাইকারি বাজারেও গিয়েছিলাম, কিন্তু সেখানে খুচরা বিক্রি না করায় বাধ্য হয়েই দ্বিগুণ দামে তরমুজ কিনতে হচ্ছে।
পিস করে কাটা তরমুজে পিপাসা নিবারণের চেষ্টা
বাইরে তীব্র রোদ ও প্রচণ্ড গরমে রাস্তার ফুটপাতে পিস করে কাটা তরমুজ খেয়ে পিপাসা মেটাতে দেখা গেছে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে। এখানে আকারভেদে প্রতিটি তরমুজ ১৫ থেকে ২০ পিস করে আলাদা করে বিক্রি করেন দোকানিরা। প্রতি পিস বিক্রি হয় ২০ থেকে ৩০ টাকা দরে। এই তরমুজ খেতে আসা রফিকের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ঢাকায় মেসে থাকি। একটি আস্ত তরমুজ কিনে খাওয়ার সামর্থ্য থাকলেও অপচয় হবে বলে কিনতে পারছি না। কিন্তু তরমুজ তো খেতে হবে, তাই প্রতিদিন এক-দুই পিস করে এদের কাছ থেকে কিনে খাই। এতে আমার যেমন তরমুজ খাওয়া হয়, তেমনি অর্থ সাশ্রয় ও অপচয়ও রোধ হয়।
গুলিস্তানে পিস করে কেটে তরমুজ বিক্রি করেন মো. হাবিব। তিনি বলেন, আমরা পাইকারি তরমুজ কিনে এনে এভাবে পিস করে বিক্রি করি। প্রতিদিন মাঝারি ও ছোট মিলিয়ে ৫০ থেকে ৬০টির মতো তরমুজ বিক্রি করতে পারি। বিক্রিও ভালো। প্রতি পিস ২০ টাকা করে বিক্রি করি, আর বড় তরমুজ হলে প্রতি পিস ৩০ টাকায় বিক্রি করি। এখন প্রচণ্ড গরম ও রোদ থাকায় আমাদের এখানে সবসময়ই ক্রেতাদের ভিড় লেগে থাকে।
ভরা মৌসুমে তরমুজের এমন অস্বাভাবিক দাম সাধারণ ভোক্তাদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। পাইকারি ও খুচরা বাজারের এই আকাশ-পাতাল পার্থক্য প্রমাণ করে যে, কৃষকের ঘাম ঝরানো ফসল ভোক্তাদের হাতে পৌঁছাতে মধ্যস্বত্বভোগীরাই সিংহভাগ মুনাফা লুটে নিচ্ছেন। যদিও আস্ত তরমুজ কিনতে না পেরে অনেকে ফুটপাতে পিস হিসেবে বিক্রি করা তরমুজ খেয়ে তৃষ্ণা মেটানোর চেষ্টা করছেন, যা সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদি কোনো সমাধান নয়।
বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার না করলে সিন্ডিকেটের এই দৌরাত্ম্য থামানো সম্ভব নয়, আর সাধারণ মানুষকে চড়া দামেই পোহাতে হবে এই ভোগান্তি— বলছেন সংশ্লিষ্টরা।