বিশ্ব প্রকৃতি সংরক্ষণ দিবসে সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, প্রকৃতির অফুরন্ত সম্ভাবনার পাশাপাশি নানা পরিবেশগত সংকটও এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
পাথরঘাটা উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, নদীতীরের কোথাও কোথাও ভাঙনের ক্ষতচিহ্ন স্পষ্ট। নদীর পাড়ে ছড়িয়ে রয়েছে প্লাস্টিক বোতল, পলিথিন ও বিভিন্ন বর্জ্য।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সচেতনতার অভাব এবং যথাযথ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতির কারণে এসব ময়লা শেষ পর্যন্ত নদীতে গিয়ে মিশছে। এতে জলজ প্রাণী ও নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
নদী-খালবেষ্টিত উপকূলীয় জেলা বরগুনা একসময় প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ, মৎস্যসম্পদ ও নৌ-যোগাযোগের জন্য সুপরিচিত ছিল। কিন্তু পরিকল্পিত নদীশাসনের অভাব, অবৈধ দখল, অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ, দূষণ এবং দীর্ঘদিন ড্রেজিং না হওয়ায় জেলার নদী-খালগুলো আজ অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। ফলে একদিকে যেমন নদীভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে, অন্যদিকে কৃষি, মৎস্য, নৌ-যোগাযোগ ও জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়েছে। এছাড়াও বিষখালী, বলেশ্বর,খাকদোনসহ বিভিন্ন নদীর তীরবর্তী এলাকায় প্রতিবছর তীব্র ভাঙনে শত শত পরিবার বসতভিটা ও কৃষিজমি হারাচ্ছে। অনেক স্থানে কার্যকর নদীশাসন না থাকায় ভাঙনের বিস্তার বাড়ছে। নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সড়ক, বাজার ও ফসলি জমি। নদী ভাঙ্গনে উজাড় হচ্ছে বন বিভাগের বনায়ন। যাতে বেড়িবাঁধ দিনদিনই আরও হুমকির মুখে পড়ছে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া, তলদেশে পলি জমে নাব্যতা কমে যাওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি নদী ব্যবস্থাপনার অভাবই ভাঙন তীব্র হওয়ার অন্যতম কারণ।
স্থানীয় জেলে আবদুল করিম বলেন, “আগের মতো নদীতে মাছ পাওয়া যায় না। নদীর পরিবেশ বদলে যাচ্ছে। সবাই যদি নদী পরিষ্কার রাখত, তাহলে প্রকৃতিও ভালো থাকত, আমরাও উপকৃত হতাম।”
মহিউদ্দিন এসমেসহ স্থানীয় একাধিক স্বেচ্ছাসেবক জানান, উপকূলীয় এলাকার মানুষ প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল হলেও প্রকৃতি রক্ষায় আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। নিয়মিত বৃক্ষরোপণ, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো এবং নদী-খাল পরিষ্কার রাখার মতো ছোট ছোট উদ্যোগও বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
পাথরঘাটার উপকূলীয় পরিবেশ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও বহন করছে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততার কারণে জীববৈচিত্র্য এবং মানুষের জীবন-জীবিকা উভয়ই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাকৃতিক বনাঞ্চল সংরক্ষণ, নদী ও জলাভূমি রক্ষা এবং পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন নিশ্চিত করতে পারলে এসব ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
বিশ্ব প্রকৃতি সংরক্ষণ দিবস উপলক্ষে পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ক নাগরিক সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা) ও পাথরঘাটা উপকূল সুরক্ষা আন্দোলন সচেতনতামূলক কর্মসূচির উদ্যোগ নিয়েছে। তাদের প্রত্যাশা, দিবসটি শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রকৃতি রক্ষায় মানুষের আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।
প্রকৃতি শুধু সৌন্দর্যের আধার নয়, মানুষের জীবন ও জীবিকারও প্রধান অবলম্বন। তাই পাথরঘাটার নদী, বন, জীববৈচিত্র্য ও উপকূল রক্ষায় সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণই হতে পারে একটি নিরাপদ ও টেকসই ভবিষ্যতের ভিত্তি।
উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও গবেষক শফিকুল ইসলাম খোকন বলেন, প্রকৃতি আমাদের জীবনের অন্যতম প্রধান অবলম্বন। বিশুদ্ধ বায়ু, পানি, খাদ্য, ঔষধ, বনভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদ—সবই আমরা প্রকৃতি থেকে পাই। গাছপালা, নদী, পাহাড়, সমুদ্র, আকাশ, পাখি ও নানা ধরনের প্রাণী মিলেই প্রকৃতির সৌন্দর্য গড়ে উঠেছে। প্রকৃতির সৌন্দর্য মানুষের মনকে আনন্দ দেয় এবং মানসিক প্রশান্তি এনে দেয়। কিন্তু বর্তমানে বন উজাড়, পরিবেশ দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রকৃতি মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
তিনি আরও বলেন, যদি আমরা প্রকৃতিকে রক্ষা না করি, তবে মানবজাতিসহ পৃথিবীর সকল জীবের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়বে। তাই আমাদের বেশি বেশি গাছ লাগাতে হবে, পরিবেশ দূষণ কমাতে হবে এবং প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সুন্দর ও বাসযোগ্য পৃথিবী গড়তে প্রকৃতি সংরক্ষণে সবাইকে সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে।
বন বিভাগের পাথরঘাটা রেঞ্জ কর্মকর্তা বদিউজ্জামান সোহাগ বলেন, আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি প্রকৃতির অন্যতম অংশ বন সুরক্ষার জন্য। তবে আমাদের জনবল কম থাকায় দায়িত্ব পালনে অনেক বেগ পেতে হচ্ছে। আমরা সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী ইতোমধ্যেই নতুন করে বনায়নের কার্যক্রম শুরু করে দিয়েছি।
এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পাথরঘাটা সেকেন্ড অফিসার (এস.ও) বিন নুরের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে কলটি গ্রহণ না করায় বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে পিএইচডি গবেষক রোবায়েত খন্দকার বলেন - পাথরঘাটা উপজেলা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সাইক্লোন সিডর এর ক্ষত এখনও বয়ে বেড়াচ্ছে। বাংলাদেশের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া অধিকাংশ ঝড় এবং জলোচ্ছ্বাসের একটি বড় অংশ এই উপজেলা এবং তার আশপাশ দিয়ে বয়ে গিয়েছে। এই দুর্যোগ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বন সংরক্ষণের এবং বনায়নের কোন বিকল্প আমাদের সামনে নেই। প্রাকৃতিক দুর্যোগ কে প্রাকৃতিক উপায়েই মোকাবেলা করতে হবে।বিশ্ব প্রকৃতি সংরক্ষণ দিবসে আমাদের গাছ রোপণ করার ব্যাপারে আরও দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হওয়া প্রয়োজন।
পাথরঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাপস পাল বলেন, প্রকৃতি রক্ষায় প্রশাসন সব সময়ই সজাগ থাকে। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী প্রকৃতির ধ্বংসকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।