একটি বেঁধে রাখা বাঁশ আর তার পাশে একজন বয়স্ক ব্যক্তি বসে আছেন। যখন ট্রেন আসে তখন তিনি বাঁশ দিয়ে রাস্তা পারাপার বন্ধ রাখেন।
বসে থাকা ব্যক্তি জানান, ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবিকার টাকা যোগাড় করেন তিনি। এখানে বসে ট্রেন আসা যাওয়ার সময় পারাপারের রাস্তা বন্ধ রাখেন। তারপরও এখানেই প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা।
বয়স্ক সেই ব্যক্তি বলেন, ‘আমরা ভিখারি মানুষ। ভিক্ষা করে খাই। এই এলাকার মধ্যে কয়েকটা এক্সিডেন্ট হওয়ার পর এলাকার লোকজন মিলে বাঁশটা লাগি দেয়। আর আমারে এখানে বসতে দিছে।’
খিলক্ষেতের এই ক্রসিং দিয়ে নারী, শিশু, বয়স্করা ঝুঁকি নিয়েই পার হচ্ছেন। এলাকাবাসী চান সমাধান।
স্থানীয়দের মধ্যে একজন বলেন, ‘এখানে একজন লোক থাকা উচিত। নেই বলেই তো নিজেরা সচেতনভাবে চলি। দুই দিকে থেকে ট্রেন আসা যাওয়ার কারণে প্রায়ই এক্সিডেন্ট হয় এখানে।’
রাজধানীর গোপীবাগের লেভেল ক্রসিং গিয়ে দেখা যায়, রেললাইনের ওপরে কিছু মানুষ চা খেতে খেতে গল্প করছেন।
রেললাইনে বসে মোবাইলে কথা বলছেন অনেকে। ক্রসিংয়ের সিগনাল দিলেও থামছে না মানুষ।
রাজধানীর মগবাজারের লেভেল ক্রসিংও হয়ে পড়েছে ঝুঁকিপূর্ণ। ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর লেভেল ক্রসিংয়ে আটকে যাওয়া একটি বাস ট্রেনের ধাক্কায় দুমড়ে মুচড়ে যায়।
গেটম্যানরা বলছেন, অনেকেই সিগন্যাল মানতে চান না। গেটম্যানদেরও গাফিলতি থাকে।
গেটম্যান বলেন, ‘ধরে রাখতে পারি না, অনেক সময় আমাকে ধাক্কা দিয়ে দৌড় দেয়। গাড়িগুলো বাঁশ ফেলা দেখলে আরও বেশি জোড়ে চালায়।’
রোববার কুমিল্লায় লেভেল ক্রসিংয়ে উঠে পড়া বাসে ধাক্কা লাগে ট্রেনের। মুহূর্তে ঝরে যায় বাসে থাকা ১২টি তাজা প্রাণ।
রেল দুর্ঘটনার ৮৯ শতাংশই লেভেল ক্রসিংয়ে। গত বছরে রেল মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, গত ১০ বছরে লেভেল ক্রসিংয়ে মারা গেছে ২৬৩ জন। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসেব মতে, ২০১৯ সাল থেকে ২৪ সাল পর্যন্ত রেল দুর্ঘটনায় ১ হাজার ২৬৯ জন। রেলওয়ে পুলিশের তথ্যমতে, গত ১০ বছরে রেল দুর্ঘটনায় মারা গেছে ৯ হাজার ২৩৭ জন। প্রতিদিন গড়ে তিনজন রেল দুর্ঘটনায় মারা যায়।
রেল দুর্ঘটনা বন্ধে সমন্বিত উদ্যোগ নেয়ার উপর জোর দিয়েছেন বুয়েটের শিক্ষক ও দুর্ঘটনা বিশেষজ্ঞ সাইফুন নেওয়াজ।
তিনি বলেন, ‘আমাদের রেলে যে লেভেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনাগুলো হলো, ঈদে কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণ মনিটরিং সিস্টেম থাকে, সেসময় কিন্তু এ ধরনের ঘটনাগুলো ঘটার কথা না। পরিত্রাণের জন্য সাস্টেইনেবল কোনো সলিউশনে আমরা যাচ্ছি না। আমরা এখনো পর্যন্ত ম্যানুয়াল মেথডে এটা সলভ করতে চাচ্ছি। লেভেল ক্রসিংয়ে অবশ্যই প্রযুক্তির সহায়তা নিতে হবে।’
লেভেল ক্রসিং ডিজিটাইজেশন করার কথা জানিয়েছেন রেলওয়ের মহাপরিচালক। আর অবৈধ লেভেল ক্রসিং বন্ধ করার কথা জানান প্রতিমন্ত্রী।
বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক আফজাল হোসেন বলেন, ‘রেলওয়ের অনুমতি ছাড়াই কিছু জায়গায় তারা লেভেল ক্রসিং নির্মাণ করেছে। যে কর্তৃপক্ষ রাস্তায় এগুলো তৈরি করছে আমরা তাদের বলছি তারা যেন অনুমতি নিয়ে এসব তৈরি করে।’
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব বলেন, ‘গার্ডও থাকবে সঙ্গে অটোমেটিক সিস্টেম থাকবে, যেন ক্রসিংয়ের কাছাকাছি ট্রেন আসার সঙ্গে সঙ্গে অটোমেটিক যেন বন্ধ হয়ে যায়। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী এরইমধ্যে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।’
সারা দেশে রেলপথে ক্রসিং আছে ২ হাজার ৮৫৬টি। এর মধ্যে ১ হাজার ৩৬১টিরই অনুমোদন নেই। আবার ১ হাজার ৪৯৫টি বৈধ ক্রসিংয়ের মধ্যে ৬৩২টি ক্রসিংয়েই গেটম্যান নেই।