শয্যা অপেক্ষমাণ তালিকায় নাম লিখিয়েছিল রাজশাহীর ৫১টি শিশু। কিন্তু সেই অপেক্ষা যেন ফুরায় না। একদিন সিরিয়াল এসেছিল ঠিকই, তার আগে একে একে সব শিশুর নাম লেখা হয় মৃতদের তালিকায়। এটি রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ১০ মার্চ থেকে টানা ১৮ দিনের চিত্র।
আইসিইউ সংকটের এই নির্মম বাস্তবতা দেখা দিয়েছে সারা দেশে। কভিড-১৯ মহামারির সময় কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে তোলা আইসিইউ অবকাঠামো এখন অচল। শয্যা না পেয়ে প্রতিদিনই ঝরছে প্রাণ।
সারা দেশে একটি প্রকল্পের অধীনে নতুন বেশ কিছু আইসিইউ ইউনিট গড়ে তোলা হয়েছিল।
সেই ইউনিটগুলো এখন যেন প্রাণহীন, কঙ্কালসার। যন্ত্রপাতি সবই আছে, নেই শুধু জনবল। প্রকল্পের মেয়াদ শেষে তারাও বিদায় নিয়েছে। পরিকল্পনাহীনতা, নীতিগত গলদ এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতায় ওই ইউনিটগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নাজুক হয়ে পড়েছে চিকিৎসাব্যবস্থা।
খোদ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তারাও এই অব্যবস্থাপনার দায় স্বীকার করেছেন। বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন সংকট নয়; বরং একটি ভেঙে পড়া স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতিফলন, যেখানে অবকাঠামো আছে, কিন্তু সেবা নেই। অবকাঠামো তৈরি হলেও সেবা না থাকা এখন দেশের স্বাস্থ্য খাতের বড় ব্যর্থতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জানা গেছে, দেশের প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র বা আইসিইউ সেবা পৌঁছে দিতে কভিড মহামারির সময় ‘কভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যান্ডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস’ প্রকল্পের আওতায় বিপুল সক্ষমতা গড়ে তুলেছিল সরকার। প্রকল্পের অধীনে দেশের ১০টি বিভাগীয় মেডিক্যাল কলেজ ও ৪৩টি জেলা সদর হাসপাতালে সর্বমোট ৫৬টি আইসিইউ ইউনিট গড়ে তোলা হয়, যেখানে মোট শয্যার সংখ্যা ৫৬০টি।
এসব ইউনিটে শতভাগ যন্ত্রপাতি সরবরাহ হয়েছিল, যা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে কভিডের ভয়াল সময়ে বহু মানুষের প্রাণ বাঁচাতে। কিন্তু প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হতেই সেই অবকাঠামোর বড় অংশ অচল হয়ে যায়। বর্তমানে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ইউনিটগুলো সীমিত আকারে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় কিছুটা সচল থাকলেও জেলা সদরের সবই প্রায় অচল।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ নড়েচড়ে বসলেও সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে অচল আইসিইউর দায় নিতে চাইছে না কেউ। উল্টো প্রকল্পের সীমাবদ্ধতাকেই সামনে আনা হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, নার্স ও টেকনিশিয়ান নিয়োগ না দেওয়ার ফলে এগুলো অচল হয়ে গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য ও দাপ্তরিক নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ওই প্রকল্পের আওতায় দেশের ১০টি প্রধান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল—খুলনা, দিনাজপুর, বরিশাল, সিলেট, ফরিদপুর, শহীদ সোহরাওয়ার্দী, টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, বগুড়া ও কুমিল্লায় প্রত্যেকটিতে নতুন করে ১০ শয্যার আধুনিক আইসিইউ ইউনিট স্থাপন করা হয়।
একইভাবে প্রথম দফায় কুমিল্লা, নোয়াখালী, গোপালগঞ্জ, ফেনী, মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, শেরপুর, টাঙ্গাইল, যশোর, সুনামগঞ্জ, চুয়াডাঙ্গা, বাগেরহাট ও মাদারীপুর—এই ১৩টি জেলা সদর হাসপাতালের প্রতিটিতে ১০ শয্যার আইসিইউ ইউনিট স্থাপন করা হয়। পরে আরো ৩৩টি জেলায় একই ধরনের ইউনিট গড়ে তোলা হয়।
ঢামেকে আইসিইউ সংকট চরমে : রোগীদের শেষ ভরসাস্থল দেশের সর্ববৃহৎ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেও আইসিইউ সংকট ভয়াবহ। ৯টি ইউনিটে মোট প্রায় ১৪০টি আইসিইউ বেড সচল থাকলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা অর্ধেকেরও কম। শয্যা খালি না থাকায় প্রতিনিয়ত মুমূর্ষু রোগীদের ফিরতে হচ্ছে। এই সংকটকে কেন্দ্র করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে দালালচক্র। অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালের ভেতরের কিছু অসাধু কর্মচারীও এই চক্রকে সহায়তা করছে। তারা রোগীদের বেসরকারি হাসপাতালে নিতে প্রলুব্ধ করছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য মতে, বর্তমানে ৯টি ভিন্ন ভিন্ন স্থানে বিভাগীয়সহ সব মিলে ১৪০টি আইসিইউ বেড সচল রয়েছে। উল্লেখযোগ্য ইউনিটগুলোর মধ্যে রয়েছে এনআইসিইউ (নবজাতক আইসিইউ) ৩৮টি বেড, পিআইসিইউ (পেডিয়াট্রিকস আইসিইউ) ১৬টি বেড, বার্ন ইউনিট আইসিইউ ১২টি বেড, ওয়ান স্টপ ইমার্জেন্সি সার্ভিস (ওসেক) ১২টি বেড, সিসিএম (ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন) ১০টি বেড, মেডিসিন আইসিইউ ১০টি বেডের সঙ্গে মূল আইসিইউ ৪০টি বেড। এ ছাড়াও হাসপাতালে অবস্টেটিক এবং কার্ডিয়াক সার্জারি আইসিইউ সেবাও চালু রয়েছে।
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, এই মুহূর্তে ৩০০টির বেশি আইসিইউ বেড দরকার। বাস্তবে সব রোগীকে আইসিইউ সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, কারণ সব শয্যাই প্রায় সব সময় পূর্ণ থাকে। জায়গা ও জনবলের অভাবে আইসিইউ বেডের সংখ্যা বাড়ানো যাচ্ছে না বলে দাবি তাঁর।
পরিচালক আক্ষেপ করে বলেন, ‘চার হাজার রোগীর বিপরীতে কমপক্ষে ১০ শতাংশ অর্থাৎ ৪০০টি আইসিইউ বেড থাকলে হয়তো পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হতো।’
দালালচক্রের দৌরাত্ম্যের বিষয়টি স্বীকার করে পরিচালক বলেন, হাসপাতালের ভেতর থেকে কিছু অসাধু কর্মচারী এই কাজে সহায়তা করেন। সম্প্রতি হাসপাতালের একজন স্টাফকে এই অভিযোগে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। র্যাব ও পুলিশের সহায়তায় নিয়মিত অভিযান চালিয়েও এই চক্রটিকে পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব হচ্ছে না।
পরিচালকের মতে, যতক্ষণ পর্যন্ত হাসপাতালের শয্যাসংকট এবং এমআরআই বা অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার সীমাবদ্ধতা দূর করে শতভাগ রোগীকে সেবা দেওয়া নিশ্চিত না হবে, ততক্ষণ এই দালালচক্রকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।
সোহরাওয়ার্দীতে আইসিইউর জন্য হাহাকার : শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেও আইসিইউ শয্যার জন্য হাহাকার দেখা গেছে। বর্তমানে ২০টি আইসিইউ ও ১০টি এইচডিইউ মিলিয়ে ৩০টি শয্যা সচল থাকলেও চাহিদার তুলনায় তা খুবই কম। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আরো ৩০টি আইসিইউ শয্যা ও প্রয়োজনীয় জনবলের জন্য মন্ত্রণালয়ে চাহিদাপত্র পাঠিয়েছে, কিন্তু এখনো অনুমোদন মেলেনি।
হাসপাতালের পরিচালক ডা. মোহাম্মদ শিহাব উদ্দিন স্বীকার করেছেন, আইসিইউর জন্য সব সময় রোগীদের দীর্ঘ অপেক্ষা থাকে। তাঁর মতে, বাড়তি শয্যার জন্য জায়গা আছে, অনুমোদনের সঙ্গে সরঞ্জাম ও জনবল হলেই হয়। কিন্তু বারবার চাহিদা জানানো হলেও বিষয়টি এখনো ফাইলবন্দি অবস্থায় আছে।
অন্যদিকে শিশুদের জন্য কিছু ভেন্টিলেটর সুবিধা থাকলেও জনবল ও বিশেষায়িত সরঞ্জামের অভাবে পূর্ণাঙ্গ পিআইসিইউ চালু করা যায়নি। পরিচালক জানান, জনবল এবং বিশেষায়িত সরঞ্জামের অভাবেই শিশুদের আইসিইউ ইউনিটটি শুধু জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা একটি মেডিক্যাল কলেজের জন্য পর্যাপ্ত নয়।
সারা দেশে একই চিত্র : রামেকে আইসিইউ সংকট এখন সরাসরি জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন। হাসপাতালের আইসিইউ ইনচার্জ ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল জানান, প্রতিদিন গড়ে ৩০টির বেশি শিশু অপেক্ষায় থাকলেও ভর্তি করা যাচ্ছে মাত্র ১০ জনকে। মার্চে মাত্র ১৮ দিনে যে ৫১টি শিশু প্রাণ হারিয়েছে, তাদের প্রত্যেকেই আইসিইউ শয্যার জন্য অপেক্ষমাণ তালিকায় ছিল, কিন্তু সিরিয়াল পেয়েছে মৃত্যুর পর। আইসিইউ সাপোর্ট পেলে অন্তত ৭০ শতাংশকে হয়তো বাঁচানো যেত।
রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্রায় দুই কোটি মানুষের জন্য আইসিইউ বেড মাত্র ১০টি। এর মধ্যে দুই-তিনটি প্রায় অচল। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান বলেন, ‘চাহিদা অনুযায়ী জনবল ও সাপোর্ট সিস্টেম না থাকায় অনেক রোগীকে আমরা আইসিইউ সেবা দিতে পারি না।’
খুলনা মেডিক্যালে ২৫টি বেড সব সময় পূর্ণ থাকে। হাসপাতালের আইসিইউ ইনচার্জ ডা. দিলীপ কুমার কুণ্ডু জানান, বর্তমানে বেডসংখ্যা চাহিদার তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। এখানে দরকার অন্তত ৫০টি।
একই সংকট শহীদ শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালেও, যেখানে মাত্র ১০টি বেড দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চারটি বিভাগে মোট ৩৪টি আইসিইউ বেড থাকলেও সেগুলো কখনোই খালি থাকে না। উপপরিচালক ডা. মাহবুবুল আলম জানান, মার্চের প্রথম ২৯ দিনে ৩২টি বেডের বিপরীতে চাহিদা বা আবেদন ছিল এক হাজার সাতজনের। সে হিসাবে এখানে বর্তমান চাহিদার তুলনায় আইসিইউ বেডের সংখ্যা মাত্র ৩ শতাংশ।
চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিত্র আরো জটিল। সেখানে আইসিইউ সংকট, বেডসংখ্যা ছাপিয়ে সরঞ্জাম আর জনবলের সংকটই বড় হয়ে উঠেছে। সরকারি দুই হাসপাতালে মোট ১১৮টি বেড থাকলেও প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ জন রোগীর বিপরীতে ভর্তি করা যাচ্ছে মাত্র পাঁচ থেকে সাতজন। অ্যানেসথেসিওলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. হারুন উর রশিদ বলেন, প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০টি আইসিইউ অনুরোধ এলেও শয্যা না থাকায় সেবা দেওয়া সম্ভব হয় না। শুধু বেড নয়, আইসিইউ পরিচালনায় প্রয়োজনীয় ৭০ থেকে ৮০ জন দক্ষ জনবলও নেই।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ১৮টি বেড থাকলেও যন্ত্রপাতি ও জনবল সংকটে পূর্ণ সক্ষমতায় সেবা দেওয়া যাচ্ছে না। ১৮টি ভেন্টিলেটরের মধ্যে সচল মাত্র ১২টি।
বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেও ২২টি আইসিইউ বেডের মধ্যে মাত্র ১০টিতে ভেন্টিলেশন সুবিধা রয়েছে। তা-ও সব বেড রোগীতে পূর্ণ। হাসপাতালের পরিচালক এ কে এম মশিউল মুনীর জানান, রোগীর চাপ অনুযায়ী শয্যা ও ইউনিট বাড়ানো জরুরি। জরুরি রোগীরাও শয্যা না পেয়ে অপেক্ষা করছে। অনেকেই মেঝেতে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে আইসিইউর অবকাঠামো কিছুটা বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু সেবার সক্ষমতা বাড়েনি। ফলে কোটি টাকার প্রকল্পের পরও সংকটাপন্ন রোগীদের জন্য স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখনো রয়ে গেছে বিপজ্জনকভাবে অপ্রস্তুত।
শীর্ষ কর্মকর্তার স্বীকারোক্তি, বিশেষজ্ঞের অভাব আর আমলাতান্ত্রিক জটেই অচল আইসিইউ : আইসিইউ সংকট, স্বাস্থ্য খাতের অব্যবস্থাপনা এবং কোটি টাকার অবকাঠামো অচল হয়ে পড়ার দায় শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ছে নীতিনির্ধারণী পর্যায়েই, এমন স্বীকারোক্তি মিলেছে খোদ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক শীর্ষ কর্মকর্তার মুখে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, এই সংকটের পেছনে একক কোনো ব্যক্তি নয়, বরং দীর্ঘদিনের পরিকল্পনাহীনতা এবং প্রশাসনিক কাঠামোগত দুর্বলতা দায়ী।
আইসিইউ সংকট কৃত্রিম কি না, এমন প্রশ্নে তিনি সরাসরি বলেন, বড় কারণ হলো পরিকল্পনার অভাব। দীর্ঘ সময় ধরে আইসিইউ সংখ্যা বাড়ানো, তা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল তৈরি এবং টেকসই ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার মতো কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি মন্ত্রণালয়। তাঁর ভাষায়, নীতি নির্ধারণ করেন মূলত সচিবরা, কিন্তু মাঠ পর্যায়ের চিকিৎসাসেবা বা ক্লিনিক্যাল বাস্তবতা সম্পর্কে তাঁদের অনেকেরই প্রত্যক্ষ ধারণা থাকে না। ফলে প্রয়োজনভিত্তিক পরিকল্পনার বদলে আমলাতান্ত্রিক সিদ্ধান্তই প্রাধান্য পায়।
সরকারি হাসপাতালগুলোতে শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার পেছনেও নীতিনির্ধারণী কাঠামোকেই দায়ী করেছেন এই কর্মকর্তা। তাঁর মতে, কোনো চিকিৎসক বা কর্মচারী দায়িত্বে গাফিলতি করলেও স্থানীয় প্রশাসকদের হাতে কার্যকর শাস্তি বা পুরস্কারের ক্ষমতা নেই, সবকিছু আটকে থাকে উচ্চ পর্যায়ে। এতে হাসপাতালের নিজস্ব কমান্ড ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে, জবাবদিহির সুযোগও নষ্ট হয়।
তিনি আরো বলেন, স্থায়ী জনবলকাঠামো গড়ে না তুলে সরকার বারবার অস্থায়ী প্রকল্পের ওপর নির্ভর করেছে। কভিডের সময় প্রকল্পভিত্তিক লোকবল দিয়ে অনেক আইসিইউ সচল করা হলেও প্রকল্প শেষ হতেই সেই জনবল বিদায় নেয়। পড়ে থাকে যন্ত্রপাতি, বন্ধ হয়ে যায় সেবা। তাঁর মতে, এটাই বর্তমান সংকটের অন্যতম বড় কারণ। বেসরকারি হাসপাতালগুলো যেখানে কঠোর শর্ত, চুক্তি ও জবাবদিহির ভিত্তিতে সেবা চালাতে পারে, সেখানে সরকার একই ধরনের বাস্তববাদী নিয়োগকাঠামো গড়ে তুলতে পারেনি।
ঢাকা মেডিক্যালের উদাহরণ টেনে ওই কর্মকর্তা বলেন, স্বাধীনতার আগের অবকাঠামোর ওপর এখনো দেশের সবচেয়ে বড় সরকারি হাসপাতালকে টেনে নেওয়া হচ্ছে। নতুন কাঠামো, নতুন সক্ষমতা ও প্রয়োজনভিত্তিক সম্প্রসারণের কাজ বছরের পর বছর ঝুলে আছে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে কিছু নতুন পদ সৃষ্টি হলেও তা এখনো পূর্ণ বাস্তবতা পায়নি। তাঁর ভাষায়, ভুল প্রশাসনিক কাঠামো, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের বদলে আমলাতান্ত্রিক সিদ্ধান্তকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং স্থায়ী জনবল না রেখে প্রকল্পনির্ভরতা—এই তিন কারণেই আইসিইউসংকট আজ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
ক্রিটিক্যাল কেয়ার বিশেষজ্ঞ মাত্র ৪০ জন : দেশের সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ সেবা সচল রাখতে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে বিশেষায়িত চিকিৎসকের চরম সংকট। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক লাইন ডিরেক্টর ডা. মো. জয়নাল আবেদীন টিটো কালের কণ্ঠকে বলেন, আইসিইউ পরিচালনার জন্য মূলত দুটি বিশেষজ্ঞ শাখা জরুরি ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন এবং অ্যানেসথেসিয়া। কিন্তু ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন এখনো দেশে নতুন বিষয়, আর এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা সারা দেশে গুনে গুনে মাত্র ৪০ জন। এই নগণ্য সংখ্যক বিশেষজ্ঞ দিয়ে বিশাল জনগোষ্ঠীর চাহিদা পূরণ করা কার্যত অসম্ভব।
তিনি বলেন, অ্যানেসথেসিওলজিস্টদের ভূমিকাও আইসিইউ ব্যবস্থাপনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু চাহিদার তুলনায় তাঁদের সংখ্যাও কম। উপরন্তু সরকারি দায়িত্ব পালনের বাইরে অনেকে বেসরকারি প্র্যাকটিসে বেশি সময় দিতে বাধ্য বা আগ্রহী হওয়ায় সরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে কার্যত শূন্যতা তৈরি হয়। ফলে শয্যা থাকলেও পূর্ণ সক্ষমতায় সেবা চালানো যায় না।
ডা. টিটোর ভাষ্য, কভিডের সময় ইআরপি প্রকল্পের আওতায় কিছু মেডিক্যাল অফিসার ও কনসালট্যান্ট নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, যাঁরা ধীরে ধীরে আইসিইউ পরিচালনায় দক্ষ হয়ে ওঠেন। কিন্তু প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই দক্ষ জনবলও হারিয়ে যায়। এখন তাঁদের কোনো কার্যকর ডেটা বেইস নেই, নেই আবার কাজে লাগানোর সুস্পষ্ট নীতিমালা। অথচ আউটসোর্সিং বা নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে এই জনবলকে ফিরিয়ে আনার সুযোগ ছিল।
সংকট উত্তরণে তাঁর পরামর্শ, আইসিইউর জন্য আলাদা ও স্থায়ী জনবল কাঠামো করতে হবে। সরকারি চিকিৎসকদের জন্যও কর্মস্থলভিত্তিক কঠোর চুক্তি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সেই সঙ্গে দীর্ঘ মেয়াদে বিশেষজ্ঞ তৈরি, পদ সৃষ্টি ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা বিস্তৃত না করলে এই সংকট কমবে না।
শিশুমৃত্যুর নেপথ্যে কাঠামোগত ব্যর্থতা : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ সৈয়দ আব্দুল হামিদ মনে করেন, সাম্প্র্রতিক সময়ে শিশুমৃত্যু ও আইসিইউ-এনআইসিইউ সংকট কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়, এটি দীর্ঘদিনের কাঠামোগত ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, স্বাস্থ্যসেবা একটি পূর্ণাঙ্গ ইকোসিস্টেম। এখানে শুধু বেড বা যন্ত্রপাতি থাকলেই চলে না; প্রয়োজন দক্ষ জনবল, রক্ষণাবেক্ষণ, সরবরাহব্যবস্থা ও সমন্বিত প্রস্তুতি। বাংলাদেশে এই সমন্বয় বহুদিন ধরেই দুর্বল।
তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে টিকা ঘাটতি ও শিশুদের শ্বাসকষ্টজনিত জটিলতা বৃদ্ধির কারণে এনআইসিইউর চাহিদা বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি। কভিড-পরবর্তী সময়ে অনেক আইসিইউ স্থাপন হলেও জনবল ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেগুলোর বড় অংশ বাস্তবে কার্যকর নয়। ফলে কাগজে আইসিইউ আছে, কিন্তু রোগী সেবা পাচ্ছে না।
প্রশাসনিক দিক নিয়েও কঠোর সমালোচনা করেন তিনি। তাঁর মতে, স্বাস্থ্য খাতের দায়িত্বশীল অনেকেই শুধু আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালন করছেন, সেবা নিশ্চিত করার তাগিদটি অনুপস্থিত। কোথাও এনআইসিইউ না থাকলে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়ার বদলে ফাইল, বাজেট, অনুমোদন আর জটিলতায় সময় চলে যায়। এতে সরকারি হাসপাতালে সেবা না পেয়ে রোগীরা বাধ্য হয় বেসরকারি খাতে যেতে, যেখানে চিকিৎসা ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।
তাঁর মতে, সংকটের সমাধান শুধু নতুন আইসিইউ বসানো নয়; বরং প্রয়োজন জবাবদিহিমূলক, মানবসম্পদনির্ভর ও বাস্তবভিত্তিক একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যব্যবস্থা। সাম্প্র্রতিক সময়ে শিশুমৃত্যুর ঘটনাগুলো সেই ব্যর্থ ব্যবস্থারই নির্মম প্রকাশ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক যা বললেন : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান কালের কণ্ঠকে বলেন, বর্তমান আইসিইউসংখ্যা দ্বিগুণ করলেও চাহিদা মিটবে না। তাঁর দাবি, সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। এই পরিকল্পনায় যেখানে ভবন আছে সেখানে যন্ত্রপাতি সরবরাহ আর যেখানে যন্ত্রপাতি আছে সেখানে দক্ষ জনবল নিয়োগ—এই দুই দিকেই সমান জোর দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, আইসিইউ সংকট শুধু বাংলাদেশের নয়, বৈশ্বিক সমস্যা। কভিডের সময় উন্নত দেশেও এই সংকটে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, কভিডের সময় ইআরপি প্রকল্পের আওতায় চালু হওয়া আইসিইউগুলো এখন সচল নেই। তাঁর ভাষায়, প্রকল্প শেষ হলে সেই জনবলকে সরাসরি স্থায়ী করার আইনি সুযোগ থাকে না। তাই ইউনিটগুলোকে আবার টেকসইভাবে সচল করতে নতুন পরিকল্পনা ও জনবলকাঠামো নিয়ে কাজ চলছে।
রাজশাহীর আইসিইউ জটিলতা নিয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি অনুমোদনের অভাব নয়; বরং প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। যদিও জেলা পর্যায়ে বর্তমানে ঠিক কতগুলো আইসিইউ সচল আছে, সে বিষয়ে তিনি সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি।