এটি এতটাই আবেগঘন এক প্রত্যাবর্তন ছিল যে, ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার পর আর্জেন্টিনার এই মহাতারকার চোখে জল চলে আসে। আগের ম্যাচে কেপ ভার্দের বিপক্ষে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। এ কারণে কোচ লিওনেল স্কালোনি মিশরের মুখোমুখি হওয়ার জন্য দলে কিছু পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি মেদিনা, থিয়াগো আলমাদা এবং লাউতারো মার্টিনেজের পরিবর্তে তাগলিয়াফিকো, পারেদেস ও জুলিয়ান আলভারেজকে দলে নেন। আর্জেন্টিনা তাদের মিডফিল্ডকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি শুরুর একাদশে অভিজ্ঞতার মাত্রা বাড়ায়।
অপরদিকে মিশরীয় দল ম্যাচের শুরুটা বেশ ভালো করে। বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের ওপর তারা শুরু থেকেই চড়াও হয়ে খেলতে থাকে এবং ম্যাচের প্রথমার্ধের ১৪ মিনিটেই এর ফল পেয়ে যায়। একটি চমৎকার কর্নার কিক থেকে আসা বলে ডিফেন্ডার ইয়াসির ইব্রাহিম লিসান্দ্রো মার্টিনেজকে ফাঁকি দিয়ে হেড করে গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজকে পরাস্ত করেন।
২০১৮ সালে ফ্রান্সের কাছে শেষ ষোলোতে হেরে বিদায় নেওয়ার পর এই প্রথম আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে কোনো ম্যাচে পিছিয়ে পড়ে। স্কালোনির দলের সামনে এটি ছিল এক নতুন চ্যালেঞ্জ। তবে চার মিনিট পরেই তারা সমতায় ফেরার সুবর্ণ সুযোগ পায়। হাসান বক্সের ভেতর তাগলিয়াফিকোকে ফাউল করায় পেনাল্টির বাঁশি বাজে।
কিন্তু মেসি পেনাল্টি নিতে এগিয়ে এসে আবারও মিস করেন। বিশ্বকাপে এটি ছিল তার চতুর্থ পেনাল্টি মিস এবং এই আসরে দ্বিতীয়। তাতে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি পেনাল্টি মিস করা খেলোয়াড় হিসেবে নিজের নেতিবাচক রেকর্ডে নাম লেখান। প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে এক আসরে দুটি পেনাল্টি মিস করেন তিনি।
পেনাল্টি মিসের ধাক্কা সামলে নেয় আর্জেন্টিনা। ছয় জনের ব্যাকলাইন নিয়ে গড়া মিশরের শক্ত রক্ষণভাগের বিপক্ষে বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কাছে রাখে তারা। আর্জেন্টাইনদের কৌশল ছিল মাঝমাঠ দিয়ে খেলা তৈরি করা। বাম প্রান্তে তাগলিয়াফিকোকে ব্যবহার করে খেলা পরিবর্তন করতে চেয়েছিল তারা। প্রথমার্ধে তারা সমতা আনার বেশ কয়েকটি সুযোগ তৈরি করেছিল। কিন্তু মিশরীয় গোলরক্ষক মোস্তফা শোবেইর অসাধারণ কিছু সেভের কারণে গোল পায়নি। প্রথমার্ধের ৪৫ মিনিটে তিনিই ছিলেন মাঠের সেরা খেলোয়াড়।
দ্বিতীয়ার্ধেও আর্জেন্টিনা চাপ ধরে রাখে। তবে ১৩ মিনিটে তারা বড় একটা ধাক্কা খায়। একটি দারুণ কাউন্টার-অ্যাটাক থেকে মোস্তফা জিকো গোলরক্ষকের ওপর দিয়ে বল ভাসিয়ে মিশরের পক্ষে দ্বিতীয় গোলটি করেন। তবে বিল্ড-আপের সময় লিসান্দ্রো মার্টিনেজকে ফাউল করার কারণে ভিএআর পরীক্ষার পর গোলটি বাতিল করা হয়।
কিন্তু মিশর ঠিকই পাল্টা আক্রমণকে কাজে লাগানোর পথ খুঁজে নেয়। ২১ মিনিটে আর্জেন্টিনার একটি কর্নার কিকের পর হাসান চমৎকার একক নৈপুণ্যে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ ভেঙে দেন। তারপর ফাঁকায় থাকা জিকোকে খুঁজে নেন। এবার গোল করে ব্যবধান বাড়াতে কোনো ভুল হয়নি। এর মাধ্যমে দলটি ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে খেলার পথে অনেকটাই এগিয়ে যায়।
Messi celebrates his 21st World Cup goal, which secured a draw for Argentina against Egypt — Photo: Elsa/Getty Images via AFP
ম্যাচের শেষ দিকে সমতা ফেরানোর জন্য আর্জেন্টিনার সামনে যেন এক ‘পাহাড়সম’ চ্যালেঞ্জ ছিল। তারা আক্রমণাত্মক খেলা শুরু করে। মেসির নিখুঁত ক্রস থেকে রোমেরোর চমৎকার হেডের মাধ্যমে ব্যবধান কমায়। এর কিছুক্ষণ পরেই ১০ নম্বর জার্সিধারী আরেকটি দুর্দান্ত একক আক্রমণ থেকে লাউতারোকে খুঁজে নেন। কিন্তু তার হেড লক্ষ্যের বাইরে চলে যায়।
মেসি হাল ছাড়েননি। তিনি নিজে দায়িত্ব নেন। এর কিছুক্ষণ পরেই ডি বক্সের ভেতর একটি আলগা বল পেয়ে গোল করে স্কোরলাইনে সমতা আনেন। এটি ছিল চলতি আসরে তার অষ্টম গোল এবং সব বিশ্বকাপ মিলিয়ে ২১তম গোল।
ম্যাচের একদম শেষ মুহূর্তে মিশর একটি আক্রমণ চালায়। কিন্তু সালাহ বলের নিয়ন্ত্রণ হারালে আর্জেন্টিনা পাল্টা আক্রমণের সুযোগ পায়। লাউতারো উইংয়ে বল পেয়ে বক্সে থাকা এনজোর উদ্দেশ্যে নিখুঁত একটি ক্রস বাড়ান। ইনজুরি টাইমে এনজো গোল করে দলের জয় নিশ্চিত করেন। গোল উদযাপনের সময় তিনি তার জার্সিতে থাকা বিশ্বচ্যাম্পিয়নের ব্যাজটির দিকে আঙুল উঁচিয়ে দেখান। মাত্র ১৩ মিনিটের ব্যবধানে ৩টি গোল! আর এর মাধ্যমেই টানা দ্বিতীয় শিরোপা জয়ের দৌড়ে আর্জেন্টিনা টিকে রইল। এবং বিশ্বকাপে রূপকথার গল্প লেখার কলম ধরে রাখলেন।