আমাদের সামাজিক অবক্ষয় আজ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে সমাজের প্রতিটি স্তর অনৈতিকতার বেড়াজালে আবৃত। এমনকি চরম আশ্চর্যের বিষয় হলো, পবিত্র ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও আজ এই অনৈতিকতার করাল গ্রাস থেকে মুক্ত থাকতে পারছে না। এর মূল কারণ আমাদের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা থেকে নৈতিক শিক্ষার প্রায় বিলুপ্তি ঘটেছে।
কেন আমাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা এতটা ভঙ্গুর? এর পেছনের মূল কারণগুলোকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করলে কিছু চরম বাস্তবতা সামনে আসে। দেশের জনসংখ্যা ও ভৌগোলিক আয়তনের তুলনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য সংখ্যা অত্যন্ত কম। এলাকাভেদে প্রতি ৩ থেকে ৫ লাখ মানুষের নিরাপত্তার বিপরীতে মাত্র ৫০ থেকে ১০০ জন পুলিশ সদস্যকে দায়িত্ব পালন করতে হয়, যা অবাস্তব। দেশের ডাকাত, সন্ত্রাসী ও অপরাধী চক্রের হাতে বিপুল পরিমাণ অত্যাধুনিক অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদ রয়েছে, যা জননিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। দেশের সব এলাকায় একসাথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল বা তদারকি নিশ্চিত করার মতো সক্ষমতা এখনও তৈরি হয়নি। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাথে থানাগুলোর যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। অপরাধের তথ্য সংগ্রহের জন্য কোনো আধুনিক বা আগাম ব্যবস্থা নেই। তদুপরি, অপরাধের খবর পাওয়ার পর ঘটনাস্থলে সময়মতো হাজির হওয়ার জন্য পুলিশের কাছে পর্যাপ্ত পরিবহন ও আধুনিক সরঞ্জামাদির তীব্র সংকট রয়েছে। সবচেয়ে বড় সংকটটি হলো বাহিনীর একাংশের আপোশকামিতা, দৃঢ় মনোবল ও ন্যায়নিষ্ঠার অভাব। বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও রক্তক্ষয়ী ঘটনাবলির পর পুলিশসহ সামগ্রিক নিরাপত্তা বাহিনীগুলো মনস্তাত্ত্বিক ও নৈতিকভাবে চরম দুর্বল হয়ে পড়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই সীমাবদ্ধতার মাঝেই আমাদের বিকল্প এবং কার্যকর পথ খুঁজতে হবে। আর সেই পথের অন্যতম সেরা সমাধান হতে পারে সুসংগঠিত সামাজিক প্রতিরোধ।
আমাদের দেশজুড়ে প্রতিটি গ্রাম, মহল্লা ও ইউনিয়নে বিভিন্ন বাহিনী (সেনা, নৌ, বিমান, পুলিশ বা বিজিবি) থেকে অবসর নেওয়া হাজার হাজার দক্ষ অফিসার এবং লাখ লাখ প্রশিক্ষিত সৈনিক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন। দেশপ্রেমিক ও সুশৃঙ্খল এই বিশাল জনশক্তিকে কাজে লাগিয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা অনেকাংশে নিশ্চিত করা সম্ভব।
একটি সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্রীয় অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ‘সামাজিক সুরক্ষা কমিটি’ গঠন করা যেতে পারে। এটি কোনো সমান্তরাল বাহিনী হবে না, বরং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি শক্তিশালী ও কার্যকর সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করবে।
প্রতিটি কমিটি হবে ১১ সদস্য বিশিষ্ট। এতে স্থানীয় পর্যায়ে বসবাসরত ১ জন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক/নিরাপত্তা বাহিনীর অফিসার, ৫ জন অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক এবং এলাকার ৫ জন উচ্চশিক্ষিত বেকার যুবক থাকবেন। কমিটির সব সদস্য স্থানীয় নাগরিক হওয়ায় তারা এলাকার প্রতিটি মানুষকে ব্যক্তিগতভাবে চিনবেন। ফলে বহিরাগত অপরাধী শনাক্ত করা বা অপরাধের আগাম তথ্য সংগ্রহ করা অত্যন্ত সহজ হবে।
অবসরপ্রাপ্ত সৈনিকদের যেহেতু সব ধরনের পেশাদার প্রশিক্ষণ রয়েছে, তাই তারা যেকোনো আইনশৃঙ্খলা জনিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় সক্ষম। পাশাপাশি, কমিটির শিক্ষিত যুবকদের এই প্রবীণ সৈনিকরাই প্রাথমিক নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার প্রশিক্ষণ দিতে পারবেন। কমিটির মূল কাজ হবে তৃণমূল পর্যায়ে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়মিত টহল দেওয়া এবং তথ্য সংগ্রহ করা। সংগৃহীত সব তথ্য একটি আধুনিক অ্যাপের মাধ্যমে সরাসরি সংশ্লিষ্ট থানার ওসি, ইউএনও, এসপি, ডিসি এবং আইজিপিকে তাৎক্ষণিকভাবে অবহিত করা হবে।
কমিটির সুনির্দিষ্ট আইনি বা গ্রেপ্তারি ক্ষমতা থাকবে। অতি প্রয়োজনে বা জরুরি পরিস্থিতিতে থানার অনুমতিক্রমে তারা অপরাধীকে গ্রেপ্তার এবং অবৈধ অস্ত্র ও মাদকদ্রব্য উদ্ধার করতে পারবে। গ্রেপ্তারের পরপরই আসামিকে এবং উদ্ধারকৃত মালামাল সংশ্লিষ্ট থানায় সোপর্দ করা হবে এবং থানা কর্তৃপক্ষ পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেবে।
কমিটির প্রত্যেক সদস্যকে রাষ্ট্রীয়ভাবে মাসিক ৭ থেকে ১০ হাজার টাকা সম্মানি ভাতা দেওয়া যেতে পারে। দেশব্যাপী এই বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালনা করতে প্রতি মাসে আনুমানিক ৭৫ থেকে ৮০ কোটি টাকা খরচের প্রয়োজন হবে। এই অর্থায়ন আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা বা উন্নয়ন সহযোগীদের তহবিল থেকে সংগ্রহ করা সম্ভব। আর তা যদি নাও পাওয়া যায়, দেশের নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তার স্বার্থে সরকারকে নিজেদের রাজস্ব থেকেই এই অর্থ বরাদ্দ করতে হবে। এছাড়া কমিটির স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে প্রতি ৬ মাস অন্তর অন্তর নতুন সদস্যের সমন্বয়ে কমিটি পুনর্গঠন করা যেতে পারে।
এই প্রস্তাবিত পদক্ষেপটি মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়িত হলে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দ্রুত ও বৈপ্লবিক উন্নতি ঘটবে এবং অপরাধ প্রবণতা শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে। একইসঙ্গে দেশের হাজার হাজার শিক্ষিত বেকার যুবকের একটি সম্মানজনক কর্মসংস্থান ও রাষ্ট্র গঠনে ভূমিকা রাখার সুযোগ তৈরি হবে।
তবে প্রশ্ন হলো, বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে? এ ধরনের একটি যুগান্তকারী ও যুগোপযোগী উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রিপরিষদের সম্মিলিত রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও নীতিগত হস্তক্ষেপ ছাড়া অসম্ভব। স্বপ্নের ‘নিরাপদ বাংলাদেশ’ বিনির্মাণে রাষ্ট্র এখন প্রথাগত আমলাতান্ত্রিক চিন্তাভাবনার বাইরে গিয়ে এ ধরনের সাহসী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে, এটাই আজ সময়ের দাবি।
লেখক: এজিএম ও ইনচার্জ (মার্কেটিং এবং সেলস), আনন্দ টিভি