বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬ ২ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
Channel18

মতামত

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন ২০২৬: একটি পর্যবেক্ষণ

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন ২০২৬: একটি পর্যবেক্ষণ

"যতই করো হামলা। আবার জিতবে বাংলা" এই স্লোগানের শব্দে আকাশে বাতাসে জানান দিচ্ছে যে, নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক বাকি। বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, সকল দল ও প্রার্থীর নির্বাচনী প্রচার একেবারে তুঙ্গে তাঁদের কর্মী ও নেতাতের যেনো নাওয়া খাওয়ার সময় নেই।

আসলে পশ্চিমবঙ্গের ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন ভারতের রাজনীতির ইতিহাসে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ হতে চলেছে। বিগত এক দশকের বেশি সময় ধরে রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণ যেভাবে আবর্তিত হয়েছে, ২০২৬ সাল হবে তারই চূড়ান্ত পরীক্ষা। একদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের (TMC) টানা ১৫ বছরের শাসন এবং চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায় ফেরার লড়াই, অন্যদিকে ভারতীয় জনতা পার্টির (BJP) বঙ্গ জয়ের মরিয়া চেষ্টা—এই দুই শক্তির সংঘর্ষে পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক ও রাজনৈতিক মানচিত্র আমূল বদলে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এবারে নির্বাচনের প্রেক্ষাপট ও সময়সূচীর দিকে চোখ বোলানো যাক, ​২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন মূলত দুই দফার একটি দীর্ঘ লড়াই হিসেবে পরিকল্পিত। মোট আসন ২৯৪টি আসনের লড়াইয়ের ভারতের নির্বাচন কমিশন (ECI) যে সময়সূচী ঘোষণা করেছে তাহলো, প্রথম দফা ২৩ এপ্রিল ( ১৫২ আসন) এবং দ্বিতীয় দফা ২৯ এপ্রিল ( ১৪২ আসন)। এবং ফলাফল ঘোষণা হবে ৪ মে, ২০২৬।

এখানে বলতে হয় ​ম্যাজিক ফিগার সংখ্যা ১৪৮টি অর্থাৎ নিরঙ্কুশ পাশের জন্য আসনগুলো অপরিহায্য।

এবারের ​এই নির্বাচনে নথিভুক্ত ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৬.৭৫ কোটি। তবে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো Special Intensive Revision (SIR) বা ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া, যার ফলে প্রায় ৯১ লক্ষ নাম বাদ পড়ার খবর রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়িয়ে দিয়েছে। যা শাসক দল তাদেরকে হারানোর একটি বিশাল কুপরিকল্পনা হিসেবেই দেখছে ও প্রচার করছে। শাসক দল মানে তৃণমূল কংগ্রেস চতুর্থ মেয়াদের চ্যালেঞ্জ ও রণকৌশল ​মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য এই নির্বাচন হলো এক প্রকার 'অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই'।

এই লড়াইটার ভিত্তি আসলে তিনি অনেক আগে থেকেই তৈরী করছেন মুলুত বিভন্ন জনমোহিনী প্রকল্পের মাধ্যমে। 

বলা যায়, ​তৃণমূলের রাজনীতির মূল স্তম্ভ হলো তাদের জনকল্যাণমূলক এই প্রকল্পগুলো। 'লক্ষ্মীর ভাণ্ডার', 'কন্যাশ্রী', এবং 'স্বাস্থ্যসাথী'-র মতো প্রকল্পগুলো গ্রামীণ বাংলার বিশেষ করে নারী ভোটারদের মধ্যে মমতার অবস্থানকে সুদৃঢ় করেছে। তথ্য অনুসারে, পশ্চিমবঙ্গের মহিলা ভোটাররা (প্রায় ৩.৪৪ কোটি) তৃণমূলের জয়ের মূল কারিগর হয়ে থাকেন এবং এবারেও হতে পারেন।

​শাসক দলের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় কাঁটা হলো দুর্নীতির অভিযোগ। শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি থেকে শুরু করে রেশন বণ্টন কেলেঙ্কারি—একাধিক হেভিওয়েট নেতার কারাবাস জনমানসে কিছুটা বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'ব্র্যান্ড ভ্যালু' এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাংগঠনিক আধুনিকীকরণ এই ক্ষতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে । অন্যদিকে বিজেপি দিল্লি জয়ের পর বঙ্গ জয়ের স্বপ্ন ​২০২১ সালের বিধানসভায় ৭৭টি আসন জিতে বিজেপি প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। ২০২৬ সালে তাদের লক্ষ্য হলো সেই ভিত্তিকে কাজে লাগিয়ে নবান্ন দখল করা। তাই ​বিজেপির প্রচারের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে CAA (নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন) এবং নতুন করে সামনে আসা UCC (অভিন্ন দেওয়ানি বিধি)। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গ এবং মতুয়া অধ্যুষিত এলাকায় CAA কার্যকর করা বিজেপির একটি বড় তুরুপের তাস। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর সাম্প্রতিক জনসভাগুলোতে অনুপ্রবেশ এবং রাজ্যের জনতাত্ত্বিক পরিবর্তনের (Demographic change) আশঙ্কা প্রকাশ করে হিন্দু ভোটকে একজোট করার চেষ্টা করছেন।

পাশাপাশি ​আর জি কর কাণ্ড পরবর্তী পরিস্থিতিতে রাজ্যে নারী সুরক্ষা এবং আইন-শৃঙ্খলা একটি বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিজেপি এই ইস্যুটিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'মহিলা দরদী' ভাবমূর্তির বিপরীতে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। তাহলে এখানে একটি প্রশ্ন স্বভাবিক, এবার তৃতীয় শক্তির পুনরুত্থান কি সম্ভব? ​বিগত কয়েকটি নির্বাচনে বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের ভোট শতাংশ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে ২০২৬-এর প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন। শিক্ষিত যুবসমাজের মধ্যে বেকারত্ব এবং তৃণমূলের দুর্নীতির বিরুদ্ধে বামপন্থীদের প্রতি এক ধরণের সহানুভূতি তৈরি হয়েছে। যদি এই জোট ১৫-২০ শতাংশ ভোট কাটতে পারে, তবে সেটি তৃণমূলের চেয়ে বিজেপির জন্যই বেশি চিন্তার কারণ হতে পারে, কারণ সরকার বিরোধী ভোটের বিভাজন তৃণমূলকে সুবিধা দেবে।

এবারে একটু ২০২৬ নির্বাচনের নির্ণায়ক ফ্যাক্টরসমূহ দিকে আলোকপাত করা যাক --

​ক) ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ (SIR)

​বিরোধীদের দাবি অনুযায়ী প্রায় ৭০ থেকে ৯০ লক্ষ নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া এই নির্বাচনের সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়। তৃণমূলের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় সরকারের মদতে নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশনের দাবি, এটি একটি রুটিন মাফিক স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ প্রক্রিয়া। এই নাম বাদ যাওয়া ভোটের ফলাফলে বিরাট অদলবদল ঘটাতে পারে।

খ) ধর্মীয় সমীকরণ বনাম বাঙালি আবেগ

​পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ২৭ শতাংশ। প্রথাগতভাবে এই ভোট তৃণমূলের দিকে থাকলেও, আইএসএফ (ISF) বা বাম-কংগ্রেস জোট যদি এই ভোটে থাবা বসায়, তবে তৃণমূলের আসন সংখ্যায় বড় ধস নামতে পারে। অন্যদিকে, বিজেপি 'বাঙালি বনাম বহিরাগত' এই তকমা ঝেড়ে ফেলে 'সনাতনী বাঙালি'র আবেগ ধরার চেষ্টা করছে।

​গ) উত্তরবঙ্গ ও পাহাড়ের রাজনীতি

​উত্তরবঙ্গ এবং জঙ্গলমহল ছিল বিজেপির শক্ত ঘাঁটি। কিন্তু তৃণমূল সরকার 'চা সুন্দরী' বা স্থানীয় আদিবাসী উন্নয়নের মাধ্যমে সেখানে হারানো জমি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে। উত্তরবঙ্গের ৫৪টি আসন কার দখলে থাকবে, তার ওপর নির্ভর করবে পশ্চিমবঙ্গের পরবর্তী সরকার।

​২০২৬ সালের নির্বাচন কেবল ভোট নয়, এটি পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক চূড়ান্ত পরীক্ষা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদি চতুর্থবার ফিরতে পারেন, তবে তা হবে ভারতীয় রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব রেকর্ড। অন্যদিকে বিজেপি যদি জয়ী হয়, তবে তা হবে বাংলার বাম এবং দক্ষিণপন্থী রাজনীতির ধারার চিরস্থায়ী অবসান।

বর্তমান তথ্য-উপাত্ত বা বুথ ফেরত জরিপ বলছে, লড়াই হবে হয়তো কঠিন কিন্তু তাতে কী TMC কিন্তু ২০০ আসনের বেশিই পাবে। তৃণমূলের হাতিয়ার যেখানে সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প ও মমতার ভাবমূর্তি, সেখানে বিজেপির হাতিয়ার হলো পরিবর্তনের ডাক এবং হিন্দুত্বের রাজনীতি। তবে শেষ পর্যন্ত জয়-পরাজয় নির্ধারিত হবে ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রভাব এবং গ্রামীণ বাংলায় অনুদান বনাম দুর্নীতির লড়াইয়ের ওপর। ২০২৬-এর ৪ মে বাংলা কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করছে এই নীরব ভোটারদের সিদ্ধান্তের ওপর।

শিক্ষক, লেখক ও সাংবাদিক

আরও

ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যু : মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে এক অন্ধকার অধ্যায়

মতামত

ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যু : মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে এক অন্ধকার অধ্যায়

২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে আরেকটি কালো অধ্যায় যুক্ত হলো। এইদিন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেন...

২০২৬-০৩-১২ ১৬:৪৪