শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬ ৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
Channel18

মতামত

বুদ্ধ পূর্ণিমা: দুঃখমুক্তির পথে মধ্যমার আলো

বুদ্ধ পূর্ণিমা: দুঃখমুক্তির পথে মধ্যমার আলো

বৈশাখের পূর্ণিমা তিথি মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক অনন্য আলোকময় দিন। এ দিনেই জন্ম, বোধিলাভ এবং মহাপরিনির্বাণ—তিনটি মহান ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল এক মহামানবের জীবনে, যিনি বিশ্বজগতে পরিচিত গৌতম বুদ্ধ নামে। তাই বুদ্ধ পূর্ণিমা কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি মানবমুক্তি, প্রজ্ঞা ও করুণার এক চিরন্তন স্মারক।

হিমালয়ের পাদদেশে কপিলাবস্তুর রাজপরিবারে জন্ম নেওয়া সিদ্ধার্থ গৌতম শৈশব থেকেই বিলাসবহুল জীবনে অভ্যস্ত ছিলেন। কিন্তু জীবনের অনিবার্য সত্য—জরা, ব্যাধি ও মৃত্যু—তাঁকে গভীরভাবে আলোড়িত করে। রাজকীয় আড়ম্বর তাঁর কাছে অর্থহীন হয়ে ওঠে। পিতা রাজা শুদ্ধোধন তাঁকে সংসারে আবদ্ধ রাখতে চাইলেও সিদ্ধার্থ উপলব্ধি করেন, যে জীবন ক্ষয়শীল, সেখানে স্থায়ী সুখের সন্ধান অসম্ভব।

এই উপলব্ধিই তাঁকে কঠোর তপস্যার পথে নিয়ে যায়। দীর্ঘ ছয় বছরের সাধনায় তিনি বুঝতে পারেন, চরম ভোগ বা চরম কৃচ্ছ্রসাধন—কোনোটিই মুক্তির পথ নয়। তখনই তিনি গ্রহণ করেন “মধ্যমপন্থা”—যা পরবর্তীতে মানবজাতির জন্য হয়ে ওঠে এক ভারসাম্যময় জীবনদর্শন।

বৈশাখী পূর্ণিমার সেই পবিত্র রাতে, গয়ার নৈরঞ্জনা নদীর তীরে অশ্বত্থ বৃক্ষতলে তিনি লাভ করেন বোধিজ্ঞান। তখনই তিনি হয়ে ওঠেন বুদ্ধ—জাগ্রত, প্রজ্ঞাময়। তিনি উপলব্ধি করেন দুঃখের কারণ এবং দুঃখমুক্তির পথ। তাঁর বাণীতে উঠে আসে মানবজীবনের গভীরতম সত্য—তৃষ্ণাই দুঃখের মূল, আর তৃষ্ণার ক্ষয়েই মুক্তি।

বুদ্ধের শিক্ষা চারটি আর্যসত্যে সুসংহত—দুঃখ আছে, দুঃখের কারণ আছে, দুঃখের নিরোধ সম্ভব, এবং দুঃখনিরোধের একটি পথ রয়েছে। এই পথই অষ্টাঙ্গিক মার্গ, যা মানুষকে নৈতিকতা, মনন ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে মুক্তির দিকে নিয়ে যায়।

তাঁর শিক্ষা কেবল তত্ত্বে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তিনি বলেছেন, “আত্মদীপো ভব”—নিজেকেই নিজের আলো হতে হবে। অন্যের ওপর নির্ভর করে নয়, বরং নিজের প্রজ্ঞা ও সচেতনতায় এগিয়ে যেতে হবে মুক্তির পথে।

বুদ্ধের জীবনের শেষ প্রান্তেও ছিল একই বার্তা—সব সংহত বস্তুই নশ্বর। তাই আসক্তি ত্যাগ করে, অপ্রমাদে নিজেকে উন্নত করাই মানুষের প্রকৃত কর্তব্য। তাঁর মহাপরিনির্বাণও সংঘটিত হয় বৈশাখী পূর্ণিমায়, যা এ দিনটিকে আরও তাৎপর্যমণ্ডিত করে তোলে।

আজকের অস্থির ও বিভক্ত বিশ্বে বুদ্ধের শিক্ষা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক। সহিংসতা, লোভ ও বিভেদের এই যুগে তাঁর করুণা, মৈত্রী ও সমতার বাণী আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়—মানুষ হিসেবে আমাদের দায়িত্ব কী।

বুদ্ধ পূর্ণিমা তাই কেবল স্মরণের দিন নয়; এটি আত্মশুদ্ধি ও আত্মজাগরণের আহ্বান। এ দিনে আমরা যদি তাঁর শিক্ষা অন্তরে ধারণ করতে পারি, তবে ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ই আলোকিত হতে পারে।

এই পুণ্যময় দিনে সকল প্রাণীর জন্য কামনা করি—সুখ, শান্তি ও দুঃখমুক্তি।

আরও

দেশ বাঁচাতে বিভক্তি নয়, প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য

মতামত

দেশ বাঁচাতে বিভক্তি নয়, প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচন, ক্ষমতার পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে প্রতিটি রাজনৈতিক অধ্যায়ের শে...

২০২৬-০৭-০৭ ১৩:৩০

অন্তর্বর্তী সরকারের বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন ও জবাবদিহির আহ্বান

মতামত

অন্তর্বর্তী সরকারের বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন ও জবাবদিহির আহ্বান

স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অভূতপূর্ব জনপ্রত্যাশার মধ্যে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্...

২০২৬-০৬-২৭ ২৩:১১

ফুটবলপাগল বাংলাদেশ কেন বিশ্ব ফুটবলে এত পিছিয়ে?

মতামত

অদিতি করিম ফুটবলপাগল বাংলাদেশ কেন বিশ্ব ফুটবলে এত পিছিয়ে?

বাংলাদেশজুড়ে এখন চলছে ফুটবল উন্মাদনা। রাতভর বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখার উৎসব। গোটা দেশ যেন দুই ভাগে বিভক্ত, আর্জেন্টিনা আর...

২০২৬-০৬-২৫ ১৬:১০

ছয় শিশুর মৃত্যুর বিচার হয়, ছয়শ শিশুর ঘাতকরা শাস্তি পায় না!

মতামত

ছয় শিশুর মৃত্যুর বিচার হয়, ছয়শ শিশুর ঘাতকরা শাস্তি পায় না!

বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।’ কিন্তু...

২০২৬-০৬-১৭ ১১:৪৫