গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন রাজনগর উপজেলার বাংলা টিলা (পণ্ডিত নগর) গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য এস এম ইলিয়াছুর রহমান (৩৬), শ্রীমঙ্গল উপজেলার উত্তর ভাড়াউড়া গ্রামের মো. ইকরাম মিয়া (২৮), ঢাকার মোহাম্মদপুরের শ্যামলী এলাকার তাহের-উল-ইসলাম আখতারুজ্জামান (৬১) এবং মোহাম্মদিয়া হাউজিং এলাকার মো. ইব্রাহিম বেপারী (৩৭)।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) নোবেল চাকমা এবং ডিবির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুদীপ্ত শেখর ভট্টাচার্যের দিকনির্দেশনায় এসআই আহলাদ ইবনে জামিল, পিপিএমের নেতৃত্বে ডিবি পুলিশের একটি দল অভিযান চালায়। অভিযানে ইলিয়াছুর রহমান ও ইকরাম মিয়াকে শ্রীমঙ্গল এলাকা থেকে এবং তাহের-উল-ইসলাম আখতারুজ্জামান ও ইব্রাহিম বেপারীকে ঢাকার মোহাম্মদপুর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের ভাষ্য, চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে কথিত মূল্যবান ধাতব বস্তু, প্রাচীন কয়েন ও সীমানা পিলার কেনাবেচার মাধ্যমে বিপুল মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণা করে আসছিল। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন নামী প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশের প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে তারা নিজেদের বিশ্বাসযোগ্য করে তুলত। এভাবে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ ও স্বাক্ষরিত চেক নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
যেভাবে প্রতারণার অভিযোগ
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, রাজনগর উপজেলার বালিসহস্র গ্রামের ব্যবসায়ী আব্দুর রহিমের (৩৫) পূর্বপরিচিত এস এম ইলিয়াছুর রহমানের মাধ্যমে প্রায় ছয় মাস আগে কথিত মূল্যবান ধাতব বস্তু কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত অন্য ব্যক্তিদের সঙ্গে পরিচয় হয়। তাঁরা আব্দুর রহিমকে জানান, চাতলাপুর চা বাগানের কয়েকজন ব্যক্তির কাছে ব্রিটিশ আমলের একটি মূল্যবান ধাতব বস্তু রয়েছে, যার মূল্য হাজার কোটি টাকার বেশি। ঢাকার একটি পক্ষ বস্তুটি কিনতে আগ্রহী বলেও তাঁকে জানানো হয়।
প্রথমে বিষয়টি অবিশ্বাস্য মনে হওয়ায় আব্দুর রহিম আগ্রহ দেখাননি। তবে পূর্বপরিচিত ইলিয়াছুর রহমান বারবার আশ্বস্ত করলে তিনি বিষয়টি যাচাই করার উদ্যোগ নেন। পরে তাঁর যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী মামাতো ভাই মির্জা খালেদুর রহমানকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে যুক্ত করা হয়।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ঢাকার ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি পরিচয়ে তাহের-উল-ইসলাম আখতারুজ্জামান তাঁর মামাতো ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি নিজেকে ইউএস হেরিটেজ অকশন প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর হিসেবে পরিচয় দেন। কথিত ক্রেতা, চা বাগানের মালিকপক্ষ ও মধ্যস্থতাকারীদের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যমে পুরো বিষয়টিকে বড় ধরনের বৈধ ব্যবসায়িক লেনদেন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
পরে কথিত মূল্যবান বস্তুটির সত্যতা যাচাইয়ের জন্য একজনকে বিশেষজ্ঞ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। ২০২৩ সালের ১৯ আগস্ট আব্দুর রহিম ওই ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে চাতলাপুর চা বাগানে যান। সেখানে উপস্থিত ব্যক্তিদের সামনে বস্তুটি পরীক্ষা করে সেটিকে আসল ও মূল্যবান বলে জানানো হয়।
এরপর কথিত লেনদেনের জন্য বাগানসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অর্থ দেওয়ার কথা বলে টাকা সংগ্রহ শুরু হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, আব্দুর রহিমের মামাতো ভাইয়ের কাছ থেকে ২৫ লাখ টাকা করে মোট চারটি স্বাক্ষরিত চেক নেওয়া হয়। তবে প্রতিশ্রুত অর্থ দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৩ সালের ২৭ অক্টোবর কথিত মূল্যবান বস্তুটি ঢাকার ক্রেতার কাছে হস্তান্তরের কথা বলে আব্দুর রহিম, তাঁর মামাতো ভাই, কথিত ক্রেতার প্রতিনিধি ও কথিত বিশেষজ্ঞকে চাতলাপুর চা বাগানে নেওয়া হয়। সেখানে বস্তুটি আবার পরীক্ষা করে সঠিক বলে জানানো হয়। এরপর একটি বাক্সে করে বস্তুটি আব্দুর রহিম ও তাঁর মামাতো ভাইয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, এ সময় তাঁদের কাছ থেকে নগদ ২ কোটি টাকা নেওয়া হয়। আরও দেড় কোটি টাকা দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তাঁদের বিশ্বাস করানো হয় যে, মোট সাড়ে ৩ কোটি টাকার লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে। দুই দিন পর আরও ১০ কোটি টাকা দিয়ে কথিত মূল্যবান বস্তুটি নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়।
বাক্সটি সিলেটে নিয়ে নিজেদের হেফাজতে রাখেন আব্দুর রহিম ও তাঁর মামাতো ভাই। পরে নির্ধারিত সময় পার হলে বাক্সটি খুলে তাঁরা দেখেন, ভেতরে কথিত মূল্যবান ধাতব বস্তুটির পরিবর্তে একটি সাপ রাখা রয়েছে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাঁরা নানা অজুহাত দেখান বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। একপর্যায়ে চক্রের একজন সদস্য দাবি করেন, টাকা নিয়ে বিরোধের কারণে কথিত বস্তুটি জিনের মাধ্যমে সাপে পরিণত হয়েছে এবং ২১ দিন পর আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসবে।
পরে আরও একটি মূল্যবান বস্তু পাওয়ার কথা বলে অতিরিক্ত অর্থ চাওয়া হয়। আগের টাকা ফেরত পাওয়ার আশায় এবং নতুন বস্তুটি পাওয়ার প্রত্যাশায় আব্দুর রহিম আরও ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেন বলে অভিযোগে বলা হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে কথিত বস্তু কিংবা দেওয়া অর্থ কোনোটিই ফেরত পাননি তিনি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলে কয়েকজনের মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায় এবং অন্যরা সময়ক্ষেপণ করতে থাকেন।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, কথিত মূল্যবান বস্তু, ক্রেতা প্রতিষ্ঠান, বিশেষজ্ঞ ও বিপুল মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে তাঁর এবং তাঁর মামাতো ভাইয়ের বিশ্বাস অর্জন করা হয়। পরে বিভিন্ন সময়ে অর্থ ও চেক নিয়ে প্রায় ২ কোটি ২১ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এ ঘটনায় ২০২৪ সালে কুলাউড়া থানায় মামলা করা হয়।
যেসব মালামাল জব্দ
ডিবি পুলিশ জানায়, অভিযানে কথিত ২০০ কোটি টাকা মূল্যের একটি এন্টিক পাওয়ার কয়েন, একটি নোহা গাড়ি, একটি পকেট রাউটার, আটটি মুঠোফোন, বিভিন্ন নামে ৫০০টি ভিজিটিং কার্ড, ৯৪ পাতা ভুয়া বিজনেস এগ্রিমেন্ট, তিনটি চেকবই, একটি কয়েন ব্ল্যাংক অ্যালবাম, একটি ডায়েরি, ১০টি সিমকার্ড, ছয়টি ভুয়া স্ট্যাম্প এবং ‘এন্টিক গ্যালারি ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড’-এর নামে একটি ভুয়া সার্টিফিকেট জব্দ করা হয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, চক্রের সদস্যরা হেরিটেজ অকশন, লক হিড মার্টিন, ব্ল্যাক রক ও মাইক্রোসফটসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশের প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে প্রতারণা করে আসছিলেন। ২০২৩ সালে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে এ ধরনের প্রতারণার মামলায় তাহের-উল-ইসলাম ওরফে আখতারুজ্জামান ওরফে মিজানুর রহমান মজনসহ চারজন গ্রেপ্তার হয়েছিলেন বলেও পুলিশ জানিয়েছে।
মৌলভীবাজার জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে এ ধরনের প্রতারণা সম্পর্কে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। অস্বাভাবিক লাভের প্রলোভনে পড়ে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন না করার জন্যও অনুরোধ করেছে পুলিশ।