ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে শ্রমিক-বিক্ষোভের জেরে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে তৈরি হয়েছে অস্থিরতা। রবিবার ঢাকার মিরপুর, গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং ভাঙচুরের ঘটনার মধ্যে ৫২৯টি পোশাক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় ৯ লক্ষ ৮৭ হাজার শ্রমিক কাজ না করেই কর্মস্থল ছাড়েন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে সোমবারও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন শিল্পমালিকেরা। তাদের বক্তব্য, কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে শ্রম আইনের ১৩(১) ধারা অনুসারে ‘কাজ নেই, মজুরি নেই’ নীতিতে কারখানা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণে ছয় সদস্যের নতুন বোর্ড গঠন করেছে বাংলাদেশ সরকার। একই সঙ্গে শিল্পের উৎপাদন, রফতানি এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জরুরি পদক্ষেপের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তবে বোর্ড গঠনের পরেও আন্দোলন থামেনি। শ্রমিকদের একাংশের দাবি, নতুন মজুরি ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।
শিল্পাঞ্চলে সংঘর্ষ, বন্ধ একাধিক কারখানা
রবিবার সকাল থেকেই মিরপুর, গাজীপুরের কোনাবাড়ি ও কালিয়াকৈর এবং সাভার-আশুলিয়া এলাকায় বিক্ষোভ শুরু হয়। মিরপুর ১১ নম্বরে মেট্রো স্টেশনের নীচে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন জায়গায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। গাজীপুরে কারখানা ও গাড়ি ভাঙচুরের পাশাপাশি একটি পুলিশ বক্সে আগুন দেওয়ার খবরও পাওয়া গিয়েছে। কালিয়াকৈরে একটি ঝুটের গুদামে অগ্নিসংযোগের অভিযোগ উঠেছে। সংঘর্ষের জেরে কয়েক ঘণ্টা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গাজীপুরে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবিকেও মোতায়েন করা হয়।
তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ-র হিসাব অনুযায়ী, মিরপুর, গাজীপুর-ময়মনসিংহ এবং সাভার-আশুলিয়া—এই তিন শিল্পাঞ্চলে সংগঠনের আওতাধীন ২,১৩৪টি কারখানার মধ্যে রবিবার সচল ছিল ১,৮১৬টি। বেলা সাড়ে তিনটে পর্যন্ত শ্রমিক অসন্তোষের কারণে ৫২৯টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। মিরপুরে ৬৮টি কারখানার ৫১,৬২৫ জন শ্রমিক কাজ ছাড়েন। গাজীপুর ও ময়মনসিংহে ২৭৬টি কারখানার ৬,৪৫,৩৬০ জন এবং সাভার, আশুলিয়া ও জিরানিতে ১৮৫টি কারখানার ২,৯০,২০৫ জন শ্রমিক কাজ করেননি।
গাজীপুর শিল্পাঞ্চল পুলিশের সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন জানিয়েছেন, সংঘর্ষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। ভাঙচুরে জড়িতদের শনাক্ত করতে ভিডিয়ো ফুটেজ খতিয়ে দেখছে পুলিশ। অন্য দিকে, মিরপুরে সংঘর্ষের ঘটনায় নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে ১১ জনকে গ্রেফতারের কথা জানিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ। তাঁদের কেউ পোশাকশ্রমিক নন বলে দাবি পুলিশের। এই অভিযোগের স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য অবশ্য প্রকাশিত হয়নি।
সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক
দিনভর অশান্তির পর রবিবার সন্ধ্যায় সচিবালয়ে মন্ত্রী ও সরকারি আধিকারিকদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মোক্তাদির, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন। ছিলেন শ্রমিক সংগঠনের নেতা শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসও।
বৈঠক শেষে দুই মন্ত্রী জানান, কারখানার উৎপাদন চালু রাখা, শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষা এবং রফতানি বাণিজ্য সচল রাখার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শ্রমিকদের ব্যবহার করে সীমান্তের ওপার থেকে অস্থিরতা তৈরির ইন্ধন দেওয়া হচ্ছে বলে সরকারের কাছে তথ্য রয়েছে। তাঁর দাবি, আন্দোলনের মধ্যে কিছু মুখোশধারী ব্যক্তি ঢুকে সহিংসতা চালাচ্ছেন। যাঁরা ভাঙচুর বা অগ্নিসংযোগে জড়িত, তাঁদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী অভিযোগ করেন, ডিসেম্বরকে সামনে রেখে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পোশাকশিল্পে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য, বিষয়টি সরকার রাজনৈতিক ভাবেও মোকাবিলা করবে। তবে আন্দোলনকারীদের সব অভিযোগ বা সহিংসতার পিছনে রাজনৈতিক যোগসাজশের দাবির স্বাধীন প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি।
নতুন মজুরি বোর্ড, কিন্তু অনিশ্চয়তা কাটেনি
শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি পুনর্নির্ধারণে গঠিত ছয় সদস্যের বোর্ডের চেয়ারম্যান সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমান। মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছেন বিজিএমইএ-র পরিচালক এ বি এম সামছুদ্দিন এবং বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের যুগ্ম মহাসচিব আসিফ আইয়ুব। শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইন। নিরপেক্ষ প্রতিনিধি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ।
শ্রমমন্ত্রী জানিয়েছেন, বোর্ড স্বাধীন ভাবে আলোচনা ও পর্যালোচনার মাধ্যমে উপযুক্ত মজুরি নির্ধারণ করবে। ২০২৩ সালে পোশাকশ্রমিকদের নিম্নতম মাসিক মজুরি ১২,৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তার আগে ২০১৮ সালে তা ছিল ৮,০০০ টাকা, ২০১৩ সালে ৫,৩০০ টাকা এবং ২০১০ সালে ৩,০০০ টাকা। ২০০৬ সালে এই অঙ্ক ছিল ১,৬৬২ টাকা ৫০ পয়সা। নতুন বোর্ড গঠনের পরেও শ্রমিকদের একাংশ ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে অনড়।
রফতানি ও কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ
বিজিএমইএ-র সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানিয়েছেন, মালিকেরা কারখানা চালু রাখার চেষ্টা করছেন। তবে নিরাপদে উৎপাদন চালানোর পরিবেশ না থাকলে পরিস্থিতি বদলাতে পারে। সংগঠনের বৈঠকে ২৫০ জনেরও বেশি প্রতিনিধি অংশ নেন, যাঁরা প্রায় ৭০০ কারখানার প্রতিনিধিত্ব করেন। অন্য দিকে, নিট পোশাকশিল্পের সংগঠন বিকেএমইএ-র সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম সতর্ক করেছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে শ্রম আইনের ১৩(১) ধারা অনুসারে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারখানা বন্ধ রাখার কথা ভাবতে পারেন মালিকেরা।
স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম বলেন, এতগুলি কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হলে বাংলাদেশের রফতানি ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সময়মতো পণ্য জাহাজীকরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের যে সুনাম রয়েছে, তাতেও প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাকশিল্প গুরুত্বপূর্ণ কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস। ফলে মজুরি নিয়ে শ্রমিকদের ক্ষোভ, মালিকদের ব্যয়বৃদ্ধির উদ্বেগ এবং সহিংসতার অভিযোগ—তিনটি বিষয়ই এখন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন মজুরি বোর্ড আলোচনার পথ খুললেও, শ্রমিকদের কাজে ফেরানো এবং উৎপাদন স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে সোমবারের পরিস্থিতিই আপাতত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।