এলপিজির বাজারে সেই চাপ আবার সামনে এসেছে। অক্টোবরে কমিশন বাড়ানোর দাবিতে দুই দিন বিক্রি বন্ধের কর্মসূচি দেন ব্যবসায়ীরা। বিইআরসির সঙ্গে বৈঠকের পর তা প্রত্যাহার করেন তাঁরা। কিন্তু সরকার নির্ধারিত ১ হাজার ৮৩৭ টাকার ১২ কেজি সিলিন্ডার বাজারে ২ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রির খবর রয়েছে।
মাসে একটি সিলিন্ডার ব্যবহার করা পরিবার ২ হাজার ২০০ টাকায় কিনলে নির্ধারিত দরের চেয়ে ৩৬৩ টাকা বেশি দেয়। একই ব্যবধান ১২ মাস থাকলে বাড়তি খরচ হয় ৪ হাজার ৩৫৬ টাকা। আয় না বাড়লে এই টাকা অন্য খাত থেকেই জোগাড় করতে হয়।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) ঢাকার গণশুনানিতে এই সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৯৭৬ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি। ব্যবসায়ীদের প্রস্তাব ২ হাজার ২৩২ টাকা। এগুলো প্রস্তাব, কার্যকর দাম নয়। বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেছেন, সংশ্লিষ্টদের স্বার্থ ও যৌক্তিকতা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত হবে।
শুধু এলপিজি নয়। ২০২৪ সালের নভেম্বরে কোম্পানিগুলো বোতলজাত সয়াবিন তেল সরবরাহ বন্ধ রাখায় বাজারে ঘাটতি তৈরি হয়। ৯ ডিসেম্বর সরকার লিটারে আট টাকা বাড়িয়ে দাম নির্ধারণ করে ১৭৫ টাকা। তখনকার বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিন আন্তর্জাতিক বাজারে ২০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির যুক্তি দিয়েছিলেন।
চিনিতেও একই ধরনের চাপ দেখা গেছে। ২০২৩ সালের মে মাসে দাম বাড়ানোর দাবির সঙ্গে আমদানি না করার সতর্কতা দেন পরিশোধনকারীরা। বাজারে প্যাকেটজাত চিনির সরবরাহও কমে যায়। ওই মাসেই সরকার কেজিতে ১৬ টাকা বাড়িয়ে খোলা চিনি ১২০ এবং প্যাকেটজাত চিনি ১২৫ টাকা নির্ধারণ করে।
আলুর ক্ষেত্রে সরকার দাম বাড়ায়নি, কিন্তু নির্ধারিত দাম কার্যকরও হয়নি। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে মুন্সিগঞ্জের অধিকাংশ হিমাগারে পাঁচ দিন বিক্রি বন্ধ রাখেন ব্যবসায়ীরা। তাঁদের দাবি ছিল, দাম বাড়াতে হবে। সরকারি খুচরা দর ছিল ৩৫–৩৬ টাকা; বাজারে বিক্রি হয় ৪৫–৫০ টাকায়।
২০২৪ সালের অক্টোবরে ঢাকার তেজগাঁওয়ে দুই দিন ডিম বিক্রি বন্ধ রাখেন আড়তদারেরা। তাঁদের বক্তব্য ছিল, সরকারি দরের চেয়ে বেশি দামে কিনে কমে বিক্রি করা সম্ভব নয়। তখন খুচরা বাজারে ডজন ১৮০ টাকায় ওঠে। সরবরাহ স্বাভাবিক হলে দাম ১০–২০ টাকা কমে।
জ্বালানিতেলেও কমিশন বাড়াতে ধর্মঘটের হুমকি ছিল। ২০২৩ সালের অক্টোবরে ডিলারদের কমিশন বাড়ায় সরকার। কিন্তু তখন ভোক্তা পর্যায়ে দাম বাড়েনি। তবে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০২৬ সালের মার্চ–এপ্রিলে জ্বালানিতেলের সরবরাহসংকটের মধ্যে অবৈধ মজুত ধরা পড়ে। তথ্য অধিদপ্তরের ২ এপ্রিলের বিবরণ অনুযায়ী, ৩ মার্চ থেকে ১ এপ্রিল পর্যন্ত অভিযানে প্রায় ৩ লাখ ৭২ হাজার লিটার তেল উদ্ধার হয়। পরে ১৯ এপ্রিল থেকে ডিজেলের দাম লিটারে ১০০ থেকে ১১৫ টাকা এবং পেট্রলের দাম ১১৬ থেকে ১৩৫ টাকা করা হয়। সরকার মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে ইরান যুদ্ধের মধ্যে আন্তর্জাতিক দর, পরিবহন ও বিমাব্যয় বৃদ্ধির কথা জানায়। ফলে সরবরাহসংকটে ভোগান্তির পর বাড়তি দামের চাপও পড়ে ভোক্তার ওপর।
এলপিজি আমদানিকারকেরা জাহাজভাড়া, পরিবহন ও সংরক্ষণব্যয় বৃদ্ধির যুক্তি দিচ্ছেন। বিপরীতে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) বলছে, আন্তর্জাতিক দাম বাড়লেই স্থানীয় সব খরচ একই হারে বাড়ে না। ব্যয়ের দাবি নিরীক্ষিত হিসাব দিয়ে যাচাই করতে হবে। কৃত্রিম সংকটের অভিযোগও তদন্ত করতে হবে।
জ্বালানি তেল বা গ্যাসের দাম বাড়লেও সেখানে কাটছাটঁ করার কোনো সুযোগ নেই। কারণ সেটি না হলে অন্তত শহরে নাগরিকের জীবন চলে না। তাই বাধ্য হয়েই খরচ কমাতে অন্যদিকে। এমনকি খাটছাঁটের হিসাব থেকে বাদ যায় না খাবার খরচও। সানেমের ২০২৩ সালের মার্চের জরিপে অংশ নেয় ১ হাজার ৬০০ নিম্নআয়ের পরিবার। তাদের ৯০ শতাংশ খাবারের ধরন বদলেছিল। মুরগির মাংস খাওয়ার গড় হার মাসে চারবার থেকে দুবারে নেমেছিল। টাকার অভাবে পুরো দিন না খেয়ে থাকার অভিজ্ঞতা জানানো পরিবারের হার ছয় মাস আগের তুলনায় ১০ থেকে ১৮ শতাংশে ওঠে।
একই জরিপে আগের ছয় মাসে আয় প্রায় অপরিবর্তিত থাকলেও পারিবারিক ব্যয় ১৩ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছিল। অর্থাৎ টাকা বেশি খরচ করেও খাবারের পরিমাণ ও মান কমাতে হয়েছিল এসব পরিবারকে। ব্যয় বাড়ার মধ্যেই তাঁদের পাতে খাবার কমেছে।
নিম্ন আয়ের মানুষের মাছ-মাংস কেনা কমিয়ে দিয়েছেন। কারওয়ানবাজারে বাজার করতে আসা মেজবাহ আলী বলেন, ‘আগে তো পাঙ্গাস, তেলাপিয়া ও ব্রয়লার মুরগি কিনতাম। এখন তো সেটাও পারি না।’ শুধু মেজবাহ আলিই নয়, নিম্ন আয়ের মানুষের খাবারের থালায় কমে গেছে আমিষ- এমনকি শাক-সবজিও। কারণ কোনো কিছুর দামই আর তাদের নাগালের মধ্যে নেই। কারওয়ান বাজার, হাতিরপুল, বনশ্রী বাজারে একাধিক ক্রেতার সাথে কথা বলে একই রকম চিত্র পাওয়া গেছে। শুধু খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে এমন তো নয়। সব কিছুর জ্বালানি থেকে শুরু নিত্যপ্রয়োজনীয় সব কিছুর দাম বেড়েছে। আর একটির সাথে অরেকটির যোগাযোগ নিবিড়। সুতরাং জ্বালানির দাম, বিদ্যুতের বিল বাড়লেও ব্যবহার কমানোর সুযোগ নেই, তাই বাধ্য হয়ে খাবারের পাতে হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে।
এসব ঘটনায় সরকার দাম ঠিক করেছে, কখনো শুল্কে ছাড় দিয়েছে, কখনো অভিযান চালিয়েছে। কিন্তু ঘোষিত দামে পণ্য না পাওয়ার সমস্যা থেকেই গেছে। ফলে প্রশ্ন শুধু ভোক্তার জিম্মি থাকা নিয়ে নয়। সরবরাহের নিয়ন্ত্রণ ব্যবসায়ীদের হাতে থাকলে সরকারের দাম নির্ধারণের ক্ষমতা বাস্তবে কতটা কার্যকর থাকছে, সেটিও বড় প্রশ্ন।
ক্যাব আমদানিকারকদের ব্যয়ের নিরীক্ষিত হিসাব যাচাই, মজুত গোপন ও অতিরিক্ত দাম আদায়ের অভিযোগ তদন্ত এবং রসিদসহ নির্ধারিত দামে বিক্রি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে। শুধু নতুন মূল্য ঘোষণা করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। সেই দামে পণ্য পাওয়া যাবে কি না, জবাবদিহি থাকতে হবে তারও।