স্থানীয়ভাবে পরিচিত এই যাত্রাশিল্পী এক সময় মেহেরপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ঘুরে ঘুরে যাত্রাপালায় অভিনয় করতেন। বিশেষ করে রাজার চরিত্রে তাঁর অভিনয় ছিল দর্শকপ্রিয়। তাঁর সংলাপ, গর্জন ও অভিব্যক্তিতে দর্শকরা মুগ্ধ হতেন। আলোঝলমলে মঞ্চ, মানুষের ভালোবাসা, সম্মান আর করতালি ছিল তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে হারিয়ে যায় যাত্রাপালার সেই সোনালি দিন। ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায় যাত্রার আসর, থেমে যায় তাঁর অভিনয়জীবনও।
জীবিকার তাগিদে বাধ্য হয়ে দিনমজুরের কাজ শুরু করেন সুনীল হালদার। কিন্তু কয়েক বছর আগে শ্রমিকের কাজ করতে গিয়ে একটি বাড়ির ছাদ থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন তিনি। এতে তাঁর কোমর ও পায়ে মারাত্মক আঘাত লাগে। সেই দুর্ঘটনার পর থেকে আর স্বাভাবিকভাবে দাঁড়াতে পারেন না তিনি। এখন লাঠিতে ভর করেই কোনো রকমে চলাফেরা করেন। শারীরিকভাবে অক্ষম হয়ে পড়ায় তাঁর পক্ষে কোনো কাজ করাও সম্ভব নয়।
ছয় সদস্যের পরিবার নিয়ে বর্তমানে চরম কষ্টে দিন কাটছে তাঁদের। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন সুনীল হালদার। তিনি কর্মক্ষমতা হারানোর পর সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর স্ত্রী ও ছেলের বউয়ের ওপর। দু’জনেই স্থানীয় একটি ইটভাটায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। সামান্য যে আয় হয়, তা দিয়ে কোনোমতে সংসার চলে। অনেক দিন একবেলা খাবার জোটে, আবার কোনো দিন না খেয়েই থাকতে হয় পুরো পরিবারকে।
প্রতিবেশীরা জানান, এলাকার সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন সুনীল হালদার। অথচ আজ তিনি অবহেলিত ও অসহায় অবস্থায় জীবন কাটাচ্ছেন। সরকারি কিংবা বেসরকারি কোনো সহায়তা এখনো নিয়মিতভাবে পাননি তিনি। দ্রুত তাঁর পাশে দাঁড়ানোর দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
প্রতিবেশী রিতা হালদার বলেন, “এক সময় যাত্রামঞ্চে তাঁর অনেক নামডাক ছিল। মানুষ তাঁকে সম্মান করত। আজ তিনি অসুস্থ হয়ে কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। কেউ যদি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়, তাহলে তাঁর পরিবার কিছুটা স্বস্তি পাবে।”
আরেক প্রতিবেশী অঞ্জনা হালদার বলেন, “সুনীলদা এক সময় ভালোভাবেই সংসার চালাতেন। কিন্তু এখন খুব কষ্টে আছেন। সমাজের বিত্তবান মানুষ এগিয়ে এলে তিনি অন্তত দুবেলা খাবার জোগাড় করতে পারবেন।”
প্রতিবেশী সঞ্চিত হালদার বলেন, “ছয় সদস্যের পরিবারে প্রায়ই অভাব লেগেই থাকে। খেয়ে না খেয়ে দিন কাটে তাদের।”
এ বিষয়ে গাংনী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন বলেন, “সুনীল হালদারের বিষয়ে আমরা অবগত হয়েছি। তাঁকে সব ধরনের সরকারি সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।”
এক সময় যিনি মঞ্চে রাজা হয়ে মানুষের মন জয় করেছিলেন, আজ সেই শিল্পী জীবনযুদ্ধের কঠিন বাস্তবতায় পরাজিত প্রায়। তাঁর পাশে যদি সরকার, সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো এগিয়ে আসে, তাহলে হয়তো জীবনের শেষ সময়টুকু কিছুটা স্বস্তিতে কাটাতে পারবেন এই অবহেলিত শিল্পী। মানবিক সহায়তার অপেক্ষায় দিন গুনছেন মেহেরপুরের যাত্রামঞ্চের সেই ‘রাজা’ সুনীল হালদার।