সবচেয়ে বড় মূল্য দিয়েছে ইরান—৩৬৩৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন। প্রতিটি সংখ্যা যেন একটি করে নিভে যাওয়া প্রদীপ, একটি করে ভেঙে যাওয়া পরিবার। লেবাননে নিহত হয়েছেন ১৫৩০ জন—যেখানে প্রতিটি মৃত্যু মানে একেকটি ঘরের দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাওয়া। ইরাকে ১১৭ জন, ইসরায়েলে ৩৪ জন, যুক্তরাষ্ট্র ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে—প্রতিটি দেশে ১৩ জন করে নিহত। কাতার ও কুয়েতে ৭ জন করে প্রাণ হারিয়েছেন। এই তালিকা এখানেই থেমে নেই। বাংলাদেশে ৬ জন, ফিলিস্তিনে (পশ্চিম তীর) ৪ জন, সিরিয়ায় ৪ জন, বাহরাইন, ওমান ও সৌদি আরবে ২ জন করে এবং ফ্রান্সে মারা গেছেন ১ জন।
খবরের পাতায় এই সংখ্যাগুলো খুব ছোট হয়ে যায়। আমরা দেখি চারটে সংখ্যা-৩৬৩৬, ১৫৩০ কিংবা ৬। কিন্তু ভাবি না, প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে একটি করে জীবন, একটি করে গল্প। কেউ হয়তো সকালে কাজে বের হয়ে আর ফেরেনি, কেউ হয়তো শেষবারের মতো মায়ের কণ্ঠ শুনেছিল ফোনে, কেউ হয়তো জানতই না, এই দিনটিই তার জীবনের শেষ দিন। যুদ্ধ কখনো জিজ্ঞেস করে না—তুমি কোন দেশের, কোন ধর্মের, কী স্বপ্ন দেখো। যুদ্ধ শুধু নিতে জানে- একটি জীবন, একটি স্বপ্ন, একটি পরিবার।
এই তালিকার মধ্যে বাংলাদেশের ৬ জন নিহত হওয়ার খবর যেন আলাদা করে কাঁপিয়ে দেয় হৃদয়। কারণ এই ছয়জন ছিল আমাদেরই মানুষ—আমাদের ভাষা, আমাদের মাটি, আমাদের স্বপ্নের অংশ। তারা কেউ যুদ্ধ করতে যায়নি। তারা গিয়েছিল রুটি-রুজির সন্ধানে, পরিবারের জন্য ভালো একটা ভবিষ্যৎ গড়তে। হয়তো তাদের কারও সন্তান অপেক্ষা করছিল বাবার ফেরার, কেউ হয়তো নতুন ঘর বানানোর টাকা জমাচ্ছিল, কেউ হয়তো ঈদের আগে দেশে ফেরার পরিকল্পনা করছিল। কিন্তু একটি বিস্ফোরণ, একটি মুহূর্ত—সবকিছু মিলিয়ে দিয়েছে শেষের গল্পে। তাদের ঘরে ফিরে গেছে শুধু খবর— একটি মৃত্যুসংবাদ, একটি অপরাহ্নের সমাপ্তি; যে সূর্য আর ওঠবে না।
যুদ্ধের শেষে হয়তো কেউ বলবে—এই দেশ জিতেছে, সেই দেশ হেরেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—এই যুদ্ধে জিতেছে কেবল হিংসা, প্রতিহিংসা, ক্ষমতার অন্ধ লড়াই। হারিয়ে গেছে মানবতা। হারিয়ে গেছে সেই পৃথিবী, যেখানে মানুষ মানুষকে বাঁচাতে চায়। একটি শিশু যখন ধ্বংসস্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে বাবাকে খোঁজে, একজন মা যখন সন্তানের নিথর দেহ জড়িয়ে ধরে কাঁদে, একজন প্রবাসী যখন ঘরে ফেরার আগেই মাটির নিচে চলে যায়— তখন কোনো বিজয় নেই। এই যুদ্ধ আবারও আমাদের শেখাল— মানচিত্রের রেখা মানুষকে আলাদা করে, কিন্তু অশ্রুবিন্দুর উষ্ণতা সকলেরই এক। সংখ্যাগুলো হয়তো একদিন বদলে যাবে, নতুন খবর আসবে, নতুন শিরোনাম হবে। কিন্তু যে শূন্যতা তৈরি হলো, তা কখনো পূরণ হবে না। এই যুদ্ধে জিতে গেছে হিংসা-প্রতিহিংসা, আর হেরে গেছে মানবতা— নিঃশব্দে, নিরুপায়ভাবে, রক্তের স্রোতে ভেসে।