একটি শিশু পৃথিবীর আলো দেখে মায়ের মাধ্যমে। মায়ের গর্ভে, মায়ের রক্ত-মাংসের অংশ হয়ে দীর্ঘ ৯ মাসের কষ্টের ফসল সন্তান। তাই বলা হয়- মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত।
আমার মা’কে নিয়ে আলাদাভাবে বলতে গেলে বলবো, আমার মা আমার বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা, আমার প্রথম শিক্ষক। মধ্যবিত্ত পরিবারে আমার জন্ম। ছোটবেলায় বাবা’র পাশাপাশি মা আমাদের সংসারের জন্য অনেক কষ্ট করেছেন। অভাব-অনটনের মাঝেও আমাদের ভাইবোনদের লেখাপড়া কখনো বন্ধ করেননি।
আমাদের এলাকায় তখন জামদানী শাড়ি তৈরির বেশ প্রচলন ছিল, এখনও আছে তবে আগের তুলনায় কম। তখন ৭-৮ বছর বয়স হলেই অনেক ছেলেমেয়েকে পরিবারের আর্থিক কারণে জামদানী কাজে লাগিয়ে দেওয়া হতো। কিন্তু অনেক অভাব-অনটনের মাঝেও আমার মা আমাকে বা আমার ভাইবোনদের কাজে না দিয়ে পড়ালেখা করিয়েছেন।
ছোটবেলায় মসজিদের মক্তবে গিয়ে আরবি শেখার পাশাপাশি কালেমা, বিভিন্ন সূরা, দোয়া- এসব অনেকটাই মায়ের কাছেই শিখেছি। পড়াশোনার খরচ জোগাতে যখন সংসার চালানোই কঠিন ছিল, তখনও মা নিজের কষ্ট করে আমার জন্য প্রাইভেট পড়ার ব্যবস্থা করেছেন।
স্কুলের বেতন বা পরীক্ষার ফি দিতে না পারলে মা নিজে গিয়ে স্কুলের শিক্ষক ও অফিস সহকারীর সঙ্গে কথা বলতেন, যেন আমার কাছ থেকে টাকা চাওয়া না হয় এবং আমি পরীক্ষার সুযোগ পাই।
শৈশবে খেলাধুলা করতে গিয়ে কারও সাথে ঝগড়া হলে মা আমাকে নিজ হাতে শাসন করতেন। ফলে ধীরে ধীরে আমি এসব ভুল কাজ থেকে দূরে থাকতাম।
এভাবেই কেটেছে আমার শৈশব।
এসএসসি পরীক্ষার পর যখন পরিবারের অভাব-অনটন দেখে আমি নিজেই কাজে লেগে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই, তখন আমার মা আমাকে সাহস জুগিয়েছেন যাতে পড়ালেখা বন্ধ না করি। এরপর এক মামার মাধ্যমে পাশের থানায় একটি বাড়িতে গৃহশিক্ষক হিসেবে থাকার ব্যবস্থা করে দেন।
এসএসসি শেষে কলেজে ভর্তি হয়ে মা-বাবার দোয়া নিয়ে বাড়ি থেকে বের হই। তারপর শত কষ্টের মাঝেও আর পড়ালেখা বন্ধ করিনি। কলেজ শেষে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স পাশ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করি।
আমি এখন মা, বাবা, ভাইবোন, স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে একজন সফল ও সুখী মানুষ। আমি মনে করি, আমার এই দীর্ঘ পথচলায় মা-ই আমার অনুপ্রেরণা, আমার এগিয়ে চলার সাহস, আমার প্রথম শিক্ষক।