চুল্লির পাশে সারি করে রাখা মাটির তৈরি থালা। একটু দূরে শুকানো হচ্ছে ফুলের টব ও ফুলদানি। কারখানার ভেতরে একের পর এক মাটির দলা যাচ্ছে মেশিনে। মুহূর্তের মধ্যে বদলে যাচ্ছে সেই মাটির আকৃতি। কোথাও চলছে রঙের কাজ, কোথাও আবার তৈরি পণ্য পোড়ানোর প্রস্তুতি।
তালা উপজেলার মাঝিয়াড়া গ্রামের একটি কারখানায় এখন এভাবেই ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন মৃৎশিল্পীরা। একসময় যে পেশা ছিল পাল সম্প্রদায়ের পারিবারিক ঐতিহ্য, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে সেই পেশাই নতুন করে সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
কারখানাটিতে তৈরি হচ্ছে থালা, বাটি, কাপ-পিরিচ, মগ, জগ, বোতল, ফুলদানি, ফুলের টব ও টেরাকোটাসহ বিভিন্ন ধরনের মাটির পণ্য। এসব পণ্যের অনেকগুলো দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে কিছু পণ্য বিদেশেও যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
কারখানায় গিয়ে দেখা যায়, মাটির তৈরি পণ্য শুকানোর জন্য খোলা জায়গায় সাজিয়ে রাখা হয়েছে। শ্রমিকেরা ব্যস্ত পণ্যে রঙের প্রলেপ দেওয়ার কাজে। আর ভেতরে জিগার মেশিনে তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন আকৃতির পাত্র।
কারুশিল্পী কামরুল ইসলাম জানান, কারখানায় ছয়টি জিগার মেশিন রয়েছে। তিন বছর ধরে তিনি এখানে কাজ করছেন। শুরুতে কাজ শিখতে সময় লাগলেও এখন মেশিনে বিভিন্ন ধরনের পাত্র তৈরি করতে পারেন।
তিনি বলেন, এই ঘুরতে থাকা যন্ত্রকে জিগার মেশিন বলে। এখানে ছয়টা জিগার মেশিন আছে। আমি তিন বছর ধরে এখানে কাজ করি। এখন সব কাজ শিখে গেছি।
কারখানার শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পণ্য তৈরির শুরুতে খাল-বিল থেকে সংগ্রহ করা মাটি মেশিনে ছেঁকে প্রস্তুত করা হয়। পরে নির্দিষ্ট ছাঁচে বসিয়ে জিগার মেশিনের সাহায্যে পাত্রের আকার দেওয়া হয়। এরপর কয়েক ধাপে শুকানো, রঙ করা ও পোড়ানোর কাজ সম্পন্ন হয়।
মাটির থালায় রঙের প্রলেপ দেওয়ার কাজ করছিলেন অর্চনা পাল। তিনি জানান, অভিজ্ঞদের কাজ দেখে তিনি এই কাজ শিখেছেন।
অর্চনা বলেন, কাজ আমি দেখে দেখে শিখেছি। মিশ্রণে খয়ের, সোডা, রংমাটি আর পানি আছে।
মৃৎশিল্পী নমিতা পাল বলেন, আগে মাটি প্রস্তুত করতে অনেক শারীরিক পরিশ্রম করতে হতো। এখন মেশিনের কারণে সেই কাজ সহজ হয়েছে। একইসঙ্গে কম সময়ে বেশি পণ্য তৈরি করা যাচ্ছে।
তার ভাষ্য, বিভিন্ন ডিজাইনের ছাঁচে পণ্য উৎপাদনে সময় কম লাগে। পরিশ্রমও কম। সবচেয়ে বড় কথা, পণ্যের ফিনিশিং ভালো হচ্ছে। দামও ভালো পাচ্ছি।
এই পেশার সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্কের কথাও জানান ললিতা পাল। কারখানার বাইরে পণ্য শুকানোর কাজে ব্যস্ত থাকা ললিতা বলেন, তার ঠাকুরদাও মাটির জিনিস তৈরি করতেন। পরে পরিবারের কেউ আর এই পেশায় থাকেননি।
ললিতা বলেন, আমরা আবার আমাদের পাল সম্প্রদায়ের পুরোনো পেশা ফিরে পেয়েছি। আমার ঠাকুরদা মাটির জিনিসপত্র বানাতেন। তার মৃত্যুর পর বাড়ির আর কেউ এই পেশায় ছিলেন না। এখন আমি আবার এখানে এসে মাটির জিনিসপত্র বানাচ্ছি।
মাটির পণ্য তৈরির এই পরিবর্তন স্থানীয় মানুষের কাছেও কৌতূহল তৈরি করেছে। কারখানার পাশে ঘাস কাটতে আসা আবুল কাশেম সরদার বলেন, আগে পাল সম্প্রদায়ের মানুষকে হাতে মাটির পাত্র তৈরি করতে দেখেছেন। কিন্তু মেশিন ব্যবহার করে একই কাজ করা যায়, তা তার জানা ছিল না।
কারখানায় তৈরি পণ্য পোড়ানোর জন্য রয়েছে বড় গোলাকার চুল্লি। মাটি ও ইট দিয়ে তৈরি এই চুল্লিতে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ পণ্য পোড়ানো হয়। সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রথমে হালকা আগুন দেওয়ার পর ধীরে ধীরে তাপ বাড়ানো হয়। প্রাথমিক এই ধাপকে কারিগরেরা ‘তাওনা’ বলে থাকেন। পুরো প্রক্রিয়ায় সময় লাগে প্রায় ৯ থেকে ১২ ঘণ্টা।
কারখানায় কাজ করা নারী শ্রমিকদের কয়েকজন জানান, তাদের মধ্যে অনেকে মাসে প্রায় ছয় হাজার টাকা মজুরি পান। সংসারের ব্যয় মেটাতে এই আয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
মাটির পণ্যের প্রতি আগ্রহ থেকেই কারখানায় এসেছিলেন সাতক্ষীরা শহরের আহসান রাজীব। তিনি বলেন, মাটির তৈরি এসব পণ্য ঘর সাজানোর পাশাপাশি উপহার হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। নতুন নকশা ও আধুনিক রঙের কারণে মানুষের আগ্রহ আবার বাড়ছে।
কারখানাটির সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা চন্দ্র শেখর দাশ বলেন, বাজারের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে উৎপাদন করতে না পারায় একসময় ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প সংকটে পড়ে। এখন আধুনিক মেশিন ও ছাঁচ ব্যবহারের ফলে নতুন ধরনের পণ্য তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে।
চন্দ্র শেখর দাশ বলেন, দেশের বিভিন্ন জায়গায় এসব পণ্য যাচ্ছে, ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় অনেক সময় অর্ডার অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করাও সম্ভব হচ্ছে না।
উন্নয়ন প্রচেষ্টার পরিচালক শেখ ইয়াকুব আলী জানান, সাতক্ষীরা, খুলনা ও যশোরের একাংশের প্রায় ৬০০ পালকে সংগঠিত করে আধুনিক পদ্ধতিতে মাটির পণ্য তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। ২০২১ সালে বিশ্বব্যাংকের একটি প্রকল্পের সহায়তায় কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। প্রকল্প শেষ হলেও কাজ থেমে নেই।
তিনি বলেন, পাল সম্প্রদায়ের বাইরের মানুষও এখন এই পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। উৎপাদিত পণ্য বিক্রির আয় ও লভ্যাংশ থেকেই শ্রমিকদের মজুরি দেওয়া হচ্ছে।
সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজ বলেন, মাঝিয়াড়া গ্রামের মৃৎশিল্পীদের কাজ তিনি সরেজমিনে দেখেছেন। ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, কাদামাটিকে নানা রূপ দিয়ে সেখানে নান্দনিক সব মাটির তৈজসপত্র তৈরি করা হচ্ছে। এই শিল্প টিকিয়ে রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে যেকোনো সহযোগিতার প্রয়োজন হলে আমরা অবশ্যই তাদের পাশে দাঁড়াব।