তবে রাঙামাটিতে পর্যটন শিল্পের অপার সম্ভাবনা থাকলেও তা কাজে লাগাতে সরকারি উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। রাঙামাটি সদর উপজেলা, কাপ্তাই ও সাজেককে ঘিরে জেলার মূল পর্যটন শিল্প গড়ে উঠেছে। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও রাঙামাটির পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে দৃশ্যমান কোনো পর্যটনবান্ধব উদ্যোগ ও উন্নয়ন লক্ষ্য করা যায়নি। তবে বেসরকারিভাবে বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
অথচ ‘রূপের রানী’ খ্যাত রাঙামাটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা ও টেকসই পর্যটন উদ্যোগ এ খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।
রাঙামাটির ঝুলন্ত সেতু, কাপ্তাই হ্রদের নীল জলরাশিতে নৌভ্রমণ, পলওয়েল পার্ক, আরণ্যক হলিউডের রিসোর্ট, সুবলং ঝরনা, আসামবস্তি-কাপ্তাই সড়কসহ কাপ্তাইয়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে সারা বছরই এখানে ছুটে আসেন প্রকৃতিপ্রেমীরা। রাঙামাটির পাহাড়ি আঁকাবাঁকা উঁচু-নিচু সড়ক, দিগন্তবিস্তৃত সবুজ অরণ্য আর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ কৃত্রিম হ্রদ কাপ্তাই হ্রদও পর্যটকদের কাছে সারা বছরই আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।
বিশেষ করে আসামবস্তি-কাপ্তাই (বড়াদম) সড়কটি পর্যটকদের কাছে অন্যতম আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। সড়কের এক পাশে সবুজে ঘেরা উঁচু-নিচু পাহাড়, অন্য পাশে বিস্তীর্ণ কাপ্তাই হ্রদের নীল জলরাশি। দুই পাশের এই নৈসর্গিক দৃশ্য সহজেই পর্যটকদের নজর কাড়ে।
১৯৮৬ সালে শহরের তবলছড়ি এলাকায় বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের উদ্যোগে দুই পাহাড়ের মাঝখানে ৩৩৫ ফুট দীর্ঘ ঝুলন্ত সেতুটি নির্মাণ করা হয়। দেশে-বিদেশে সেতুটি ‘সিম্বল অব রাঙামাটি’ নামে পরিচিতি লাভ করেছে। তবে কাপ্তাই হ্রদের পানির উচ্চতার সঙ্গে সামঞ্জস্য না করে পরিকল্পনাহীনভাবে সেতুটি নির্মাণ করায় প্রতিবছর এটি পানির নিচে তলিয়ে যায়। এতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পর্যটকেরা সেতুতে ওঠার সুযোগ না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরতে বাধ্য হন। ফলে রাঙামাটির পর্যটন খাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
পর্যটন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখন পর্যন্ত রাঙামাটিতে ট্যুরিজমের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো সরকারি নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়নি। পর্যটন নগরী হিসেবে রাঙামাটিতে পর্যটন শিল্পের যে ধরনের উন্নয়ন হওয়ার কথা, তার জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতাও তেমন লক্ষ্য করা যায়নি। ফলে এ খাত যেভাবে এগিয়ে যাওয়ার কথা, সেভাবে এগোয়নি। এছাড়া রাঙামাটির পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট সরকারি স্টেকহোল্ডারদের সমন্বিত কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনাও নেই বলে জানিয়েছেন তারা।
এদিকে আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রায়ই রাঙামাটিতে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে অনেক দেশি-বিদেশি পর্যটক রাঙামাটি ভ্রমণে আসছেন না।
গরবা ট্যুরিজম, লাইফস্টাইল, রেস্তোরাঁ অ্যান্ড আর্ট গ্যালারির ফাউন্ডার ও সিইও বাদশা ফয়সাল বলেন, আমাদের প্রথম সমস্যা হলো, হিল ট্র্যাক্টসে পর্যটন খাতের জন্য সরকার এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা প্রণয়ন করেনি। বাস্তবায়নের প্রশ্ন তো পরের বিষয়। ফলে রাঙামাটিসহ পাহাড়ের পর্যটন খাত অনেকটা অপরিকল্পিত ও এলোমেলোভাবে গড়ে উঠছে।
তিনি বলেন, এখানে আঞ্চলিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিতিশীলতার কিছু সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে। পাশাপাশি জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা কিংবা রাঙামাটিতে কাজ করা এনজিওগুলোর পক্ষ থেকেও পর্যটন শিল্পকে বিকশিত করার জন্য তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগ এখনো আমরা দেখিনি। কোনো আমলেই টেকসই ও দায়িত্বশীল পর্যটন ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
রাঙামাটিতে আমরা যারা দীর্ঘদিন ধরে পর্যটন খাতে কাজ করছি, সেই অভিজ্ঞ উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করে সরকার, জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থা, জেলা পরিষদ, জেলা প্রশাসন, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন, পর্যটন মন্ত্রণালয় ও ট্যুরিজম বোর্ডসহ সব পক্ষকে এক টেবিলে বসতে হবে। সবার সমন্বয়ে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন এবং তার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
লেখক ও সাংবাদিক হিমেল চাকমা বলেন, রাঙামাটির পর্যটন খাত যেভাবে এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, সেভাবে এগোয়নি। আশির দশকে রাঙামাটিকে সরকারিভাবে পর্যটন শহর হিসেবে ঘোষণা করা হলেও সময়ের সঙ্গে পর্যটন শিল্পের যে ধরনের উন্নয়ন ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন ছিল, তা আমরা দেখতে পাইনি। ফলে এ খাত এখনো অনেক ধীরগতিতে এগোচ্ছে।
তিনি বলেন, এর একটি বড় উদাহরণ হলো রাঙামাটির ‘সিম্বল অব রাঙামাটি’ হিসেবে পরিচিত ঝুলন্ত সেতু। আশির দশকে নির্মিত এই সেতুটি বর্তমানে কাপ্তাই হ্রদের পানিতে ডুবে আছে। বিভিন্ন সরকার ক্ষমতায় এলেও সেতুটিকে উঁচু করে পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার সমস্যা সমাধানে কোনো কার্যকর উদ্যোগ আমরা দেখিনি। ফলে রাঙামাটির পর্যটন খাত কতটা অবহেলার মধ্যে রয়েছে, ঝুলন্ত সেতুটিই তার একটি বড় উদাহরণ।
এ ছাড়া রাঙামাটির পর্যটন ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষায় সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনারও ঘাটতি রয়েছে। পৌরসভা, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, জেলা প্রশাসন, জেলা পরিষদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। এই সমন্বয়হীনতার কারণে রাঙামাটির পর্যটন খাত যেভাবে বিকশিত হওয়ার কথা, সেভাবে বিকশিত হচ্ছে না।
রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দীপন তালুকদার বলেন, আসলে রাঙামাটিতে পর্যটন এখনো সেভাবে একটি শিল্প হিসেবে গড়ে ওঠেনি। এ কারণে পর্যটন শিল্পকে পুরো রাঙামাটি পার্বত্য জেলায় ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য আমরা পরিকল্পনা করছি।
তিনি বলেন, আমরা প্রত্যেকটি ঝরনার যৌবন ফিরিয়ে আনতে চাই। এসব পর্যটন স্পটে যাওয়ার ক্ষেত্রে যেসব সমস্যা রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের জন্য প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সুবলং ঝরনায় সারাবছর পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করতে জাপানি পদ্ধতি গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পানি প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় কাজগুলো করে ঝরনাটিকে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা হবে।
রাঙামাটি পার্বত্য জেলার পর্যটনের দৃশ্যমান অন্যতম আকর্ষণ ঝুলন্ত সেতু। বছরের প্রায় তিন মাস এটি পানির নিচে থাকে। তাই সেতুটিকে পাঁচ থেকে ছয় ফুট উঁচু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সেতুটি কাঁচ দিয়ে নির্মাণ বা সংস্কার করা যায় কি না, সে বিষয়েও আলোচনা চলছে।
তিনি আরও বলেন, আমরা আশা করি, প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় রাঙামাটি পার্বত্য জেলাকে একটি সুন্দর পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে পর্যটন খাত আরও সমৃদ্ধ হবে এবং বিপুলসংখ্যক বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
পাহাড়, হ্রদ ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির কারণে রাঙামাটির পর্যটন শিল্পে যে সম্ভাবনা রয়েছে, তা কাজে লাগাতে এখন প্রয়োজন পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ। সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া না হলে সম্ভাবনাময় এই খাত কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন থেকে পিছিয়ে থাকবে।