মাগুরা আদর্শ কলেজে প্রায় দেড় কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম ও তসরুপের অভিযোগে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া অধ্যক্ষ শ্যামল কুমার বিশ্বাসকে পুনর্বহালের চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে কলেজের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, আর্থিক অনিয়মের তদন্তে অভিযোগের প্রমাণ মিললেও এখন পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান প্রশাসনিক বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বরং অপসারণের আট মাস পরও তাঁর বেতন-ভাতা চালু রয়েছে। কলেজ সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর অধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দেন শ্যামল কুমার বিশ্বাস। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ফি, উন্নয়ন তহবিল, কলেজ মার্কেটের ভাড়া ও অন্যান্য আর্থিক খাতের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন উঠতে থাকে। পরে কলেজ কর্তৃপক্ষ একটি অভ্যন্তরীণ অডিট কমিটি গঠন করে।
অডিট কমিটির প্রতিবেদনে কলেজের বিভিন্ন খাতে বড় ধরনের আর্থিক গরমিলের তথ্য উঠে আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়, স্নাতক (সম্মান) শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা ১ কোটি ৭৪ লাখ ৭৮ হাজার ৮০৯ টাকার বিপরীতে ব্যাংকে জমা হয়েছে ১ কোটি ১ লাখ ৮০ হাজার ৩০০ টাকা। প্রায় ৭৩ লাখ টাকার হিসাব পাওয়া যায়নি। একইভাবে উচ্চ মাধ্যমিক, বিএমটি ও স্নাতক (পাস) শাখার বিভিন্ন ফি বাবদ আদায়কৃত ১ কোটি ৪২ লাখ ১৬ হাজার ৬০০ টাকার মধ্যে ব্যাংকে জমা হয়েছে ৯৮ লাখ ৯৪ হাজার ২৩০ টাকা। এ খাতে প্রায় ৪৩ লাখ টাকার গরমিল পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া কলেজ মার্কেটের দোকান ভাড়া, লিজ এবং অন্যান্য আয়-ব্যয়ের খাতেও উল্লেখযোগ্য অসঙ্গতি ধরা পড়ে। কিছু ক্ষেত্রে যথাযথ অনুমোদন ছাড়া ব্যাংক হিসাব থেকে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে। আট মাসেও হয়নি দৃশ্যমান ব্যবস্থা কলেজের একাধিক সূত্র জানায়, অভ্যন্তরীণ অডিট কমিটি ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। তবে প্রতিবেদনটি দীর্ঘ সময় প্রকাশ করা হয়নি। পরে বিষয়টি নিয়ে চাপ সৃষ্টি হলে অধ্যক্ষকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন গোলাম কাবিয়ার।
তবে অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হলেও অভিযুক্ত অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে বরখাস্ত, বিভাগীয় মামলা কিংবা আইনগত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমনকি তাঁর বেতন-ভাতাও বন্ধ করা হয়নি।
ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ গোলাম কাবিয়ার বলেন, “আর্থিক অনিয়মের বিষয়টি তদন্তে উঠে এসেছে। কিন্তু তাঁকে এখনো চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়নি। ফলে নিয়ম অনুযায়ী তাঁর বেতন-ভাতা চলমান রয়েছে।”
পুনর্বহালের চেষ্টা নিয়ে প্রশ্ন
এদিকে কলেজসংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্র দাবি করেছে, একটি প্রভাবশালী মহল অভিযুক্ত অধ্যক্ষকে পুনর্বহালের জন্য বিভিন্নভাবে তৎপরতা চালাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, অনিয়মের অর্থ আদায়ের উদ্যোগের পরিবর্তে তাঁকে আবার দায়িত্বে ফেরানোর প্রচেষ্টা চলছে। যদিও এ বিষয়ে সরাসরি কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি, তবে কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীদের একটি অংশের মধ্যে এ নিয়ে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তাঁদের প্রশ্ন, আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে উঠে আসার পরও কেন অভিযুক্ত ব্যক্তিকে পুনর্বহালের আলোচনা হচ্ছে?তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ অভ্যন্তরীণ অডিট কমিটির আহ্বায়ক সহকারী অধ্যাপক মো. কবিরুল বাশার বলেন, “আমরা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করেছি। তদন্তে আর্থিক অনিয়মের বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। এরপর কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সেটি কলেজ প্রশাসন ও পরিচালনা কমিটির বিষয়।”
পরিচালনা কমিটির সভা আজ কলেজ পরিচালনা কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট শাহেদ হাসান টগর বলেন, “বিষয়টি নিয়ে আগামীকাল বৃহস্পতিবার পরিচালনা কমিটির সভা ডাকা হয়েছে। সভায় তদন্ত প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো উপস্থাপন করা হবে। এরপর কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”বক্তব্য দিতে রাজি নন অভিযুক্ত অধ্যক্ষ অভিযোগের বিষয়ে জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও শ্যামল কুমার বিশ্বাস গণমাধ্যমের কাছে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
কলেজের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, এত বড় অঙ্কের অর্থের অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পরও যদি কোনো জবাবদিহি না হয়, তাহলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাঁদের দাবি, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত শেষে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে এবং আত্মসাৎ হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নিতে হবে। মাগুরা আদর্শ কলেজের এই ঘটনাটি এখন শুধু আর্থিক অনিয়মের অভিযোগেই সীমাবদ্ধ নেই। তদন্ত প্রতিবেদন, প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা, বেতন চালু থাকা এবং পুনর্বহালের আলোচনা মিলিয়ে পুরো বিষয়টি নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে কলেজসংশ্লিষ্টরা, আর নজর এখন পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্তের দিকে।