নগরীতে নির্মাণাধীন উড়াল সড়কসহ তিন লিংক রোড প্রকল্পের কাজ এখন দৃশ্যমান পর্যায়ে পৌঁছেছে।
প্রায় ৭১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি ইতোমধ্যে ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ)।
এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে খুলনার যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে বলে আশা করছেন বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ। তবে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে নগরীতে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হবে।
প্রকল্প সূত্র জানায়, মহানগরীতে যানজট কমানো, ভারী যানবাহনের বিকল্প চলাচল নিশ্চিত করা এবং নগরীর অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ সহজ করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে নগরীর প্রবেশ ও বহির্গমন পথগুলোতে প্রতিদিন দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়। বিশেষ করে গল্লামারি, নিরালা মোড়, রায়ের মহল ও সিটি বাইপাস এলাকায় যানবাহনের চাপ ক্রমেই বাড়ছে। নতুন এই ফ্লাইওভার ও লিংক রোড চালু হলে সেই চাপ অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রকল্পের আওতায় নিরালা আবাসিক এলাকা থেকে সিটি বাইপাস পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ চার লেনের আধুনিক সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। এই সড়কের মাঝামাঝি অংশে নির্মাণ করা হচ্ছে খুলনার প্রথম ফ্লাইওভার। বর্তমানে এ অংশের কাজ সবচেয়ে বেশি এগিয়েছে। ইতোমধ্যে পিলার স্থাপন, সড়কের ঢালাই, গার্ডার বসানো এবং সংযোগ কাঠামোর বড় অংশের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এ ছাড়া একই প্রকল্পের আওতায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে রায়ের মহল পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ দুই লেনের সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। এই অংশের অগ্রগতি প্রায় ৪০ শতাংশ। অন্যদিকে বাস্তুহারা এলাকা থেকে পুরাতন সাতক্ষীরা মোড় পর্যন্ত আরও প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কের কাজ ৬০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে ২০১৮ সালের জুলাই মাসে প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়। পরবর্তীতে সময় ও নকশায় কিছু পরিবর্তন আনা হলেও নির্ধারিত বাজেটের মধ্যেই কাজ শেষ করার চেষ্টা চলছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নগরীর অভ্যন্তরে প্রবেশ ও বের হওয়ার বিকল্প পথ তৈরি হবে। বর্তমানে যেসব ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও ভারী যানবাহন শহরের প্রধান সড়ক ব্যবহার করে যানজট সৃষ্টি করে, তারা সরাসরি সিটি বাইপাস ব্যবহার করতে পারবে। এতে নগরীর প্রধান সড়কগুলোর ওপর চাপ কমবে এবং যাতায়াত সময়ও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
ট্রাক চালক মনসুর হায়দার বলেন, প্রতিদিন গল্লামারি হয়ে শহরে প্রবেশ ও বের হতে হয়। যানজটের কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হয়। নতুন সড়কটি চালু হলে আমাদের সময় ও জ্বালানি দু’টোই সাশ্রয় হবে।
নিরালা এলাকার বাসিন্দা ও ব্যাংক কর্মকর্তা সৌরভ মজুমদার বলেন, আমি প্রতিদিন মোটরসাইকেলে করে ফকিরহাটে চাকরিতে যাই। গল্লামারি মোড়ে প্রায়ই তীব্র যানজট থাকে। নতুন সড়কটি পুরোপুরি চালু হলে কর্মঘণ্টা বাঁচবে এবং যাতায়াত অনেক সহজ হবে।
এদিকে ব্যবসায়ীরাও মনে করছেন, নতুন সড়ক চালু হলে পণ্য পরিবহনে সময় কম লাগবে এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে। বিশেষ করে মোংলা বন্দরমুখী যানবাহনের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে প্রকল্পের নকশা নিয়ে কিছু প্রশ্ন তুলেছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। তাদের মতে, ফ্লাইওভারের নিচ দিয়ে পর্যাপ্ত যান চলাচলের ব্যবস্থা রাখা হয়নি। বিশেষ করে নিরালা মোড়ের বর্তমান অবকাঠামো ভবিষ্যতের যানবাহনের চাপ সামাল দিতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের খুলনা চ্যাপ্টারের সেক্রেটারি আসিফ আহমেদ বলেন, নিরালা মোড় প্রশস্ত না করলে এবং কিছু অংশ পুনঃনকশা না করা হলে ভবিষ্যতে নতুন করে যানজটের সৃষ্টি হতে পারে। বড় প্রকল্পে ছোট নকশাগত সীমাবদ্ধতাও দীর্ঘমেয়াদে বড় সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের খুলনা মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক মাহবুবর রহমান মুন্না বলেন, সড়কটির কিছু নকশাগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে আরও প্রশস্ত সড়ক ও অতিরিক্ত লিংক রোড নির্মাণ করা প্রয়োজন ছিল। তবে এসব সমালোচনার মধ্যেও প্রকল্পটি ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে আশাবাদ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিনের যানজট ও ধীরগতির যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে ভোগান্তিতে থাকা নগরবাসী এখন দ্রুত কাজ শেষ হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।
খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী ও থ্রি-লিংক রোড প্রকল্পের পরিচালক মোরতোজা আল মামুন বলেন, ৩০০ মিটার দীর্ঘ ওভারপাসের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। ব্রিজের কাজ ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ এবং সড়কের কাজ ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ শেষ হয়েছে। কিছু কারিগরি ও সময়জনিত কারণে প্রকল্পের সময়সীমা বাড়ানো হলেও ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে পুরো প্রকল্প শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে খুলনার যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। নগরীর যানজট কমবে এবং নগরবাসী একটি আধুনিক সড়ক অবকাঠামোর সুবিধা পাবে।