রাজধানীর রামপুরা এলাকার বাসিন্দা সাজ্জাদ হোসেন জানান, তার গাড়িতে অকটেন নিতে চালককে প্রায় ৩২ ঘণ্টা লাইনে অপেক্ষা করতে হয়েছে। এ সময় চালকের ঘণ্টাপ্রতি ৮০ টাকা হিসেবে ৩০ ঘণ্টায় মজুরি দাঁড়ায় ২ হাজার ৪০০ টাকা। খাবার বাবদ খরচ হয়েছে আরও ১ হাজার টাকা। দীর্ঘ সময় লাইনে থাকার কারণে গাড়ি চালু রাখা ও নড়াচড়ার মধ্যে প্রায় ৮ থেকে ১০ লিটার জ্বালানি খরচ হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তিনি পান ৪০ লিটার অকটেন। সব খরচ যোগ করলে প্রতি লিটার জ্বালানির কার্যকর মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৩৫০ টাকার কাছাকাছি, যা ঘোষিত দামের চেয়ে অনেক বেশি।
জ্বালানি সংকট শুরুর পর অনেকেই ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার অর্ধেকে নামিয়ে এনেছেন। এক সপ্তাহের জ্বালানি দিয়ে দুই সপ্তাহ গাড়ি চালানোর চেষ্টা করছেন কেউ কেউ। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া গাড়ি বের করছেন না, শিশুদের স্কুলে আনা-নেওয়া ছাড়া ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। প্রতিদিনের যাতায়াতে অনেকে রিকশা, সিএনজি ও মোটরসাইকেলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে, ব্যবহার কমানোর পরও কেন সংকট কাটছে না? জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী সম্প্রতি দাবি করেছেন, দেশে জ্বালানির মজুত ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে এবং সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু মাঠপর্যায়ে দীর্ঘ লাইন, অপেক্ষা ও সীমিত সরবরাহের দৃশ্য নিয়মিতই দেখা যাচ্ছে।
অনেকেই বলছেন, তাহলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া লম্বা লাইনের ভিডিও, ছবি ও সংবাদ কি সবই বিভ্রান্তিকর?
সংকটের প্রভাব পড়েছে বিমানবন্দর সেবাতেও। সিলেট থেকে ঢাকায় আসা তানভীর হাসান নামে এক যাত্রী অভিযোগ করেন, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের পর ‘প্রায়োরিটি’ সুবিধা থাকা সত্ত্বেও তাকে র্যাম্প কার দেওয়া হয়নি। সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, জ্বালানি সংকটের কারণে র্যাম্প কার চালু রাখা সম্ভব হয়নি, যাত্রীদের বাসে পরিবহন করা হচ্ছে।
এদিকে জ্বালানি সরবরাহের প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ খাতেও। ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে কোথাও কোথাও দৈনিক ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। এতে জনজীবনে বাড়ছে দুর্ভোগ।
এ পরিস্থিতিতে সরকারের পদক্ষেপ নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন নাগরিকরা। তারা জানতে চান, জ্বালানি তেলের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে কী ধরনের কার্যকর বা ‘রেডিকাল’ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত সরকারি গাড়িতে চলাচলকারী নীতিনির্ধারকদের কাছে হয়তো সংকটের বাস্তব চিত্র এখনো পুরোপুরি পৌঁছায়নি।
এদিকে স্বাস্থ্য খাতেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। হাম রোগে শিশু মৃত্যুর ঘটনা বাড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে, যা সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সমন্বয়হীনতার ফল বলেও দাবি করছেন কেউ কেউ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, তদারকি জোরদার এবং চাহিদা-সরবরাহের বাস্তব চিত্র প্রকাশ করা না হলে এ ধরনের বিভ্রান্তি ও ভোগান্তি আরও বাড়তে পারে। দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।