বুধবার, ১ এপ্রিল ২০২৬ ১৮ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
Channel18

জাতীয়

জ্বালানি অনিশ্চয়তায় চাপে দেশ, দ্রুত পদক্ষেপে সরকারের তৎপরতা

জ্বালানি অনিশ্চয়তায় চাপে দেশ, দ্রুত পদক্ষেপে সরকারের তৎপরতা

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের উত্তেজনা, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে সম্ভাব্য বাধা এবং তেল-গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ও সরবরাহ দুটিই অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে।

এই প্রেক্ষাপটে আমদানিনির্ভর বাংলাদেশ স্বাভাবিকভাবেই বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। ফলে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সরকার ইতোমধ্যে জনগণের প্রতি পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়ে সহযোগিতা চেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়া, অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা পরিহার, ব্যক্তিগত যানবাহনের ব্যবহার কমিয়ে গণপরিবহন ব্যবহার, খোলাবাজারে জ্বালানি বিক্রি রোধে তৎপরতা বৃদ্ধি এবং জ্বালানি পাচার ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারি। এসব নির্দেশনা শুধু তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলার জন্য নয়, বরং দায়িত্বশীল জ্বালানি ব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে তোলারও ইঙ্গিত দেয়।

যদিও সরকারের পক্ষ থেকে ‘আপাতত জ্বালানি সংকট নেই’—এমন বার্তা দেওয়া হয়েছে, বাস্তবে দেশের বিভিন্ন স্থানে ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন ও সীমিত সরবরাহ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। অনেকেই অনিশ্চয়তার আশঙ্কায় অতিরিক্ত জ্বালানি মজুতের চেষ্টা করছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এই ‘প্যানিক বায়িং’ প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ, কারণ প্রকৃত ঘাটতির চেয়ে আতঙ্কজনিত চাহিদাই অনেক সময় বেশি সংকট সৃষ্টি করে।

জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের জরুরি পর্যালোচনা সভায় স্বীকার করা হয়েছে, সম্ভাব্য উৎসগুলো থেকে নির্ধারিত সময়ে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে জ্বালানি সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এর ফলে বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদনে সাময়িক প্রভাব পড়তে পারে, যা কৃষি ও শিল্প খাতের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাই সরকারকে একদিকে তাৎক্ষণিক সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় জোর দিতে হবে।

সংকট মোকাবিলায় সরকার বহুমুখী কূটনৈতিক উদ্যোগও নিয়েছে। ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে জ্বালানি আমদানি বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা চলছে। ভারতের কাছ থেকে অতিরিক্ত ৫০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল সরবরাহের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি চীনের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ব্রুনেই, আফ্রিকা ও আমেরিকার মতো বিকল্প উৎস থেকেও জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই বহুমুখী উৎস অনুসন্ধান ভবিষ্যতে সরবরাহ ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন জানিয়েছে, দেশে উৎপাদিত হওয়ায় পেট্রোল ও অকটেনের বড় ধরনের সংকটের সম্ভাবনা নেই। তবে ডিজেল সরবরাহ নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ থাকায় বিকল্প উৎসের দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে ভারত থেকে চুক্তির আওতায় জ্বালানি তেল আমদানি অব্যাহত রয়েছে এবং বিভাগীয় পর্যায়ে সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তবে কেবল আমদানির ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি এবং দেশীয় সম্পদের উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং জ্বালানি দক্ষ প্রযুক্তির প্রসারে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। সৌরবিদ্যুৎ ও বায়োগ্যাসের মতো বিকল্প উৎস গ্রামীণ পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ‘সাশ্রয়ী ব্যবহার’ নীতিই সবচেয়ে কার্যকর। সরকার ইতোমধ্যে অপ্রয়োজনীয় যানবাহন ব্যবহার সীমিত করা, আলোকসজ্জা কমানো এবং জ্বালানি ব্যবহারে সংযমী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। অনেক দেশ সংকট মোকাবিলায় রেশনিং পদ্ধতি চালু করেছে; বাংলাদেশেও সীমিত আকারে এমন পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে। যদিও এতে কিছু অসন্তোষের খবর পাওয়া গেছে, তবুও সামগ্রিক স্বার্থে এসব উদ্যোগ প্রয়োজনীয় বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশ্ব পরিস্থিতিও এই সংকটের গভীরতা বোঝায়। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল। যদিও পরে কিছুটা কমেছে, তবুও অস্থিরতা রয়ে গেছে। এলএনজির বাজারেও একই চাপ বিরাজ করছে। ভারত শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ কমিয়েছে, পাকিস্তান জ্বালানি ভর্তুকি কমানোর মতো পদক্ষেপ নিয়েছে। এতে স্পষ্ট, জ্বালানি সংকট এখন বৈশ্বিক বাস্তবতা।

বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো সীমিত বিকল্পের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। একদিকে জনগণের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে সরবরাহ নিশ্চিত করা, অন্যদিকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখা—এই দুইয়ের সমন্বয় সহজ নয়। তাই নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা, সতর্কতা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ জরুরি।

সবশেষে বলা যায়, জ্বালানি সংকট মোকাবিলা শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়; এতে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। সাশ্রয়ী ব্যবহার, অপ্রয়োজনীয় ভোগ কমানো এবং গুজব এড়িয়ে চলা—এই সাধারণ পদক্ষেপগুলোই বড় পরিবর্তন আনতে পারে। সরকারের উদ্যোগ ও জনগণের সহযোগিতা একসঙ্গে কাজ করলে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। দীর্ঘমেয়াদে টেকসই জ্বালানি নীতি গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি স্থিতিশীল ও আত্মনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যেতে পারবে—এটাই এখন সময়ের দাবি।

আরও

ফ্যামিলি কার্ড নারী সদস্যকে কেন দেয়া হচ্ছে জানালেন প্রধানমন্ত্রী

জাতীয়

ফ্যামিলি কার্ড নারী সদস্যকে কেন দেয়া হচ্ছে জানালেন প্রধানমন্ত্রী

আগামী চার বছরের মধ্যে দেশব্যাপী চার কোটি পরিবারকে পর্যায়ক্রমে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী...

২০২৬-০৪-০১ ১৬:৫৬

ফুটপাত দখল করে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান : বনানীতে ডিএমপির উচ্ছেদ অভিযান শুরু

জাতীয়

ফুটপাত দখল করে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান : বনানীতে ডিএমপির উচ্ছেদ অভিযান শুরু

রাজধানীর বনানী এলাকায় ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত করতে উচ্ছেদ অভিযান শুরু করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। বুধবার (১ এপ্...

২০২৬-০৪-০১ ১১:৫৬

মধ্যপ্রা‌চ্যে চলমান সংঘাতে প্রবাসী শ্রমিকরা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়‌ছে

জাতীয়

মধ্যপ্রা‌চ্যে চলমান সংঘাতে প্রবাসী শ্রমিকরা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়‌ছে

গালফ অঞ্চলে চলমান সংঘাতের প্রভাব পড়েছে প্রবাসী শ্রমিকদের জীবনে। কাজ চালু থাকলেও নিরাপত্তা ঝুঁকি, আয় কমে যাওয়া এবং দ্রব্য...

২০২৬-০৪-০১ ১০:০১

জ্বালানি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ

জাতীয়

জ্বালানি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ

সরবরাহ সংকটের কারণে জ্বালানি খাতে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ।

২০২৬-০৪-০১ ১০:০০