একসময় জীবিকার সন্ধানে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ দুবাইয়ে কাজ করতেন আল আমিন। কিন্তু করোনা মহামারির সময় দেশে ফিরে এসে পড়েন অনিশ্চয়তায়। কাজ নেই, আয়ের পথ বন্ধ। তবুও হতাশ হয়ে বসে থাকেননি তিনি। চাকরির পেছনে না ছুটে নিজের কিছু করার স্বপ্ন থেকেই শুরু করেন নতুন উদ্যোগ।নিজ বাড়ির পাশেই ছোট্ট একটি টিনশেড ঘরে গড়ে তোলেন ফাইবার দিয়ে মোটরসাইকেল যন্ত্রাংশ তৈরীর ছোট্ট একটি কারখানা। আর এখান থেকেই তিনি প্রতি মাসে আয় করেন প্রায় ১ লাখ টাকা।
পটুয়াখালী সদর উপজেলার কমলাপুর ইউনিয়নের চরবলইকাঠী গ্রামে আল আমিনের ছোট্ট কারখানার অবস্থান। কারখানাটি পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, তিনিসহ আরও দুই কর্মচারী মিলে তৈরি করছেন মোটরসাইকেলের ট্যাংক। বেশ কয়েকজন মোটরসাইকেল নিয়ে অপেক্ষা করছেন পার্টস কেনার জন্য। মেরামতের জন্য ক্রেতাদের রেখে যাওয়া ট্যাংকগুলোর ভেতরের অংশে ফাইবার বসিয়ে সুন্দর রঙে সাজিয়ে শুকোতে দিয়েছেন রোদে।
নিজের তৈরি ট্যাংক কতটা মজবুত- এ প্রশ্ন উঠতেই ঘটে যায় চমকপ্রদ এক ঘটনা। পণ্যের গুণগত মান দেখাতে আল আমিন শুকাতে দেওয়া একটি ফাইবার ট্যাংকের ওপর উঠে দাঁড়ান। এরপর পুরো শরীরের ওজন দিয়ে কয়েকবার লাফিয়ে দেখান। কিন্তু এতেও ট্যাংকটির কোনো ক্ষতি হয়নি। উপস্থিত সবার কাছেই দৃশ্যটি তার তৈরি পণ্যের মজবুতি ও মানের এক বাস্তব প্রমাণ হয়ে ওঠে।
জানা যায়, শুরুতে স্থানীয় বাজারে তার তৈরি এ যন্ত্রাংশগুলো বিক্রি হলেও জেলার গণ্ডি ছাড়িয়ে এখন তার সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে অন্যান্য জেলাতেও। পটুয়াখালী ছাড়িয়ে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হচ্ছে তার তৈরি পণ্য। এমনকি অনলাইনেও অনেক বাইকার অর্ডার দিয়ে এগুলো কিনছেন।
গ্রাহকরা বলছেন, সাধারণত নতুন পার্টস কিনতে ১০–১৫ হাজার টাকা খরচ হয় এবং তা দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু আল আমিনের ফাইবার পার্টস সুলভমূল্য, দীর্ঘস্থায়ী এবং ৮–১০ বছর পর্যন্ত ব্যবহারযোগ্য। এছাড়া সে গ্যারান্টিসহ সেবা দেন, যদি নষ্ট হয় তাহলে আবার নতুন করে মেরামত করে দেন। আল আমিনের কারখানায় সবচেয়ে বেশি চাহিদা মোটরসাইকেলের ফুয়েল ট্যাংক মেরামতের।
পার্শ্ববর্তী গলাচিপা উপজেলা থেকে আসা মো. ফেরদৌস বলেন, আমার শখের সুজুকি গাড়িটির তেলের ট্যাংক ফুটো হইয়া গ্যাছে। কোথাও ট্যাংকি পাই নাই। এরপর লোকজনের কাছ থেকে এই জায়গার খোঁজ পেয়ে ট্যাংকি নিয়া আসছি। এখন আমার ট্যাংকিতে কাজ করাইয়া আগের মতো করে দিছে। আমি খুবই খুশি।
ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালক সুমন ইসলাম বলেন, আমার মোটরসাইকের ট্যাংক এখান থেকে ঠিক করালাম। তারা গ্যারান্টি দিয়া দিছে ১০ বছরের। এর মধ্যে কোনো সমস্যা হইলে আবার তারা দেখবে। এমন সুবিধা তো সব জায়গায় পাওয়া যায়না। তাছাড়া এখানে খুব কম দামে মোটরসাইকেলের অনন্য পার্টস ও পাওয়া যায়। এজন্যই আমরা এখানে আসি।
প্রতিবেশী তাফাদ্দুল বলেন, দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ মোটরসাইকেলের মালামাল কিনতে আমাদের গ্রামে আসে এটা খুব ভালোই লাগে। তবে আল-আমিনকে সরকারীভাবে সহযোগিতা করলে আরও ভালোভাবে ও ব্যবসাটা পরিচালনা করতে পারবে।
আল-আমিনের কাজে সহযোগিতা করা নাজমুল বলেন, আমি পড়াশোনার পাশাপাশি চাচাকে এই কাজে সাহায্য করি। এতে আমার নিজের পড়ার খরচও হয়ে যায়। তার কাছ থেকে কাজগুলো শিখতেছি আমি, যেন ভবিষ্যতে ফাইবার দিয়া আমিও ভালো কিছু করতে পারি।
উদ্যোক্তা মো. আল আমিন বলেন, বিদেশ থেকে দেশে এসে ভেবে পাচ্ছিলাম না কী করব। এরপর ফাইবার দিয়ে এ সব পার্টস তৈরি ও ট্যাংক মেরামতের কাজ শুরু করি। আলহামদুলিল্লাহ, এখন আল্লাহর রহমতে খুব ভালো সাড়া পাচ্ছি। যারা কাজ করে তাদের বেতন দিয়া খুব ভালোভাবেই চলছি। প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ আসে। আমি তাদের কাজগুলো সুন্দরভাবে করে দেই। ভবিষ্যতে ব্যবসা আরও বাড়াতে চাই। এজন্য সরকারী সহযোগিতা পেলে আরও উপকার হত।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক) পটুয়াখালী এর সহকারী মহাব্যবস্থাপক (ভারপ্রাপ্ত) মো. আলমগীর সিকদার বলেন, আমরা ইতোমধ্যে আল আমিনের কারখানাটি পরিদর্শন করেছি। তাকে বিভিন্ন কাগজপত্র জমা দিতে বলেছি। প্রতিষ্ঠানটি সচল রাখতে ভবিষ্যতে কোনো ধরনের আর্থিক সহায়তা বা অনুদানের প্রয়োজন হলে আমরা তা দেয়ার চেষ্টা করব।