বরং নির্বিঘ্ন যাতায়াত ব্যবস্থা ও নিরাপদ রাস্তা মানুষের আবশ্যক অধিকারগুলোর একটি। মানুষের এই অধিকার সংরক্ষণে সচেষ্ট হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ আমল।
আবু জার (রা.) বলেন, মহানবী (সা.) বলেছেন, আমার উম্মতের সমস্ত আমল বা কাজ-কর্ম (ভাল-মন্দ উভয়ই) আমার সামনে পেশ করা হয়েছিল। আমি দেখলাম তাদের সমস্ত উত্তম কাজের মধ্যে রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু দূরীকরণও একটা উত্তম কাজ। আর আমি এও দেখলাম যে, তাদের খারাপ আমলের মধ্যে রয়েছে মসজিদের মধ্যে কাশি বা থুথু ফেলা এবং তা মিটিয়ে না ফেলা। (মুসলিম, হাদিস : ১১২০)
উল্লিখিত হাদিসে রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু দূরীকরণকে উত্তম কাজ আখ্যা দেওয়া হয়েছে। কারণ এতে জনগণের যাতায়াত নিরাপদ ও সহজ হয়। মানুষের কল্যাণ হয়। মানুষের কল্যাণে কাজ করাও এক ধরনের ইবাদত। রাস্তা থেকে জনদুর্ভোগ সৃষ্টিকারী বস্তু সরানোও এক ধরনের সদকা। হাদিস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন যে, মানুষের প্রত্যেক জোড়ার প্রতি সদকা রয়েছে, প্রতি দিন যাতে সূর্য উদিত হয় দু’জন লোকের মাঝে সুবিচার করাও সদকা, কাউকে সাহায্য করে সাওয়ারীতে আরোহণ করিয়ে দেয়া বা তার উপরে তার মালপত্র তুলে দেয়াও সদকা, ভাল কথাও সদকা, সালাত আদায়ের উদ্দেশ্যে পথ চলায় প্রতিটি কদমেও সদকা, রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করাও সদকা। (বুখারি, হাদিস ; ২৯৮৯)
যখন রাস্তা থেকে কষ্ট দূর করা এত বড় নেক আমল, তখন ইচ্ছাকৃতভাবে কষ্ট সৃষ্টি করা কত বড় অপরাধ—তা সহজেই অনুমেয়। অহেতুক রাস্তা বন্ধ করার অনেক পদ্ধতি হতে পারে, কেউ অবৈধ ভাবে দোকান-পাট বসিয়ে অবরোধ করে, কেউ আবার বিকল্প ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও অযথা নির্মাণ সামগ্রী রেখে রাস্তায় চলাচলে বিঘ্নতা সৃষ্টি করে। কেউ আবার বাড়ির বর্জ্য রাস্তায় ফেলেও দুর্ভোগ সৃষ্টি করে। যেভাবেই হোক, অহেতুক মানুষের দুর্ভোগ সৃষ্টি করার অধিকার কারো নেই।
হানাফি ফকিহ আল্লামা যাইলাঈ (রহ.) তাঁর ‘তাবইয়ীনুল হাকায়িক শরহু কানযিদ দাকায়িক’ গ্রন্থে ‘লিখেছেন, ‘যে ব্যক্তি জনসাধারণের রাস্তায় পায়খানা (নিষ্কাশন-ব্যবস্থা), নালা (পানির পাইপ/মিজাব), উঁচু স্থাপনা বা দোকান ইত্যাদি তৈরি করে, তা অপসারণ করার অধিকার সবার রয়েছে। অর্থাৎ, যে কোনো ব্যক্তি, সে প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ-বুদ্ধিসম্পন্ন স্বাধীন মুসলিম হোক বা অমুসলিম জিম্মি হোক, সে এর অপসারণ দাবি করতে পারবে। কারণ, তাদের প্রত্যেকেরই নিজের এবং তাদের বাহনসহ ওই রাস্তা দিয়ে চলাচলের অধিকার রয়েছে। তাই তারা এসব অপসারণের দাবি জানাতে পারবে।’ (তাবইয়ীনুল হাকায়িক শরহু কানযিদ দাকায়িক)
তবে হ্যাঁ, রাষ্ট্রের প্রয়োজন কিংবা জননিরাপত্তা বিবেচনায় কোনো রাস্তা বন্ধ বা সংকুচিত করার প্রয়োজন পড়লে তাতে অবশ্যই রাস্তার আদব বজায় রাখতে হবে। এক্ষেত্রে ইসলামের একটি নীতি আছে, জরুরি প্রয়োজন কখনো কখনো কিছু কিছু নিষিদ্ধ বিষয়কে সাময়িকভাবে বৈধ করে। (আল আশবাহ ওয়ান নাজাইর)
হাদিস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, আবু জার (রা.) থেকে বর্ণিত, আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমরা রাস্তায় বসা থেকে বেঁচে থাকো। তাঁরা বললেন, হে আল্লাহর রাসুল (সা.)! (পথের উপরে) আমাদের মাজলিস না করে উপায় নেই, তথায় বসে আমরা (দরকারি) আলোচনা করে থাকি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, নিতান্তই যদি তোমাদের তা করতেই হয়, তবে রাস্তার হক আদায় করবে। তাঁরা বললেন, রাস্তায় হক কি? তিনি বললেন, দৃষ্টি নিচু করা, কষ্টদায়ক জিনিস সরিয়ে ফেলা, সালামের উত্তর দেওয়া এবং ভালো কাজের আদেশ দেয়া ও মন্দ কর্ম থেকে নিষেধ করা। (মুসলিম, হাদিস : ৫৪৫৬)
অতএব, আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব হলো, রাস্তার হক ও আদব রক্ষা করা এবং এমন কোনো কাজ না করা, যা মানুষের কষ্টের কারণ হয়। রাসুল (সা.) বলেছেন, আমি এক লোককে একটি গাছের কারণে জান্নাতে আনন্দ ফুর্তি করতে দেখেছি। এ গাছটি সে রাস্তার উপর হতে দূর করেছিল, যেটি মানুষকে কষ্ট দিত। (মুসলিম, হাদিস : ৬৫৬৫)।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে রাস্তার হক আদায় করার তাওফিক দান করুন।