ইরান শুধু একটি আধুনিক রাষ্ট্র নয়, বরং প্রাচীন পারস্য সভ্যতার উত্তরাধিকারের ধারক। হাজার বছরের ইতিহাস, সমৃদ্ধ সাহিত্য ও বিজ্ঞানচর্চা, এবং অসাধারণ স্থাপত্য—সবই দেশটিকে বিশ্বসভ্যতার এক গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত করেছে।
ইরান ও পারস্য সভ্যতা কী
ইরান হলো মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশ, যা আধুনিক রাজনৈতিক রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত। এটি পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতার কেন্দ্রগুলোর মধ্যে একটি, যার স্থায়ী সংস্কৃতি, সাহিত্য, বিজ্ঞান ও ধর্মীয় ঐতিহ্য আছে।
পারস্য সভ্যতা বা প্রাচীন পারস্য হলো ইরানের প্রাচীন সভ্যতার নাম। এটি খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৫০০০ বছর আগে শুরু হয় এবং বিশ্বের প্রথম বৃহৎ সাম্রাজ্যগুলো—যেমন আকেমেনীয় সাম্রাজ্য—এখান থেকেই গড়ে ওঠে। সংক্ষেপে, ইরান বর্তমান রাষ্ট্র, আর পারস্য সভ্যতা হলো সেই অঞ্চলের প্রাচীন ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার, যা আজও বিশ্বসভ্যতার উপর গভীর প্রভাব ফেলেছে।
ইতিহাসের আয়নায় ইরান
বিশ্ব রাজনীতিতে 'ইরান' শব্দটি উচ্চারিত হলে এর সঙ্গে যুক্ত হয় 'পারস্য সাম্রাজ্য' শব্দ দুটিও। এমনকি, ১৯৭৯ সালে ইরানে গণবিপ্লব সংগঠিত হলে তখন সংবাদমাধ্যমে প্রচার করা হয়েছিল—রেজা শাহের পতনের মধ্য দিয়ে ইরানে প্রায় ২,৫০০ বছরের রাজতান্ত্রিক শাসনের অবসান হয়েছে।
সংক্ষেপে ইমাম খামেনি হিসেবে বহুল পরিচিত ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ ধর্মীয়নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খামেনির নেতৃত্বে সে বছর বিপ্লব-পরবর্তী ইরান ইসলামী প্রজাতন্ত্রের রূপ নেয়। প্রায় ৪৭ বছর পর সেই শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে সর্বস্তরের জনগণ তীব্র আন্দোলনে যোগ দেওয়ায় বিশ্ব রাজনীতিতে ইরান ও এর ইতিহাস আবারও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
ইতিহাস বলছে—খ্রিষ্টপূর্ব ৫৫৯ থেকে ৩৩০ সাল পর্যন্ত পারস্য পরিচিত ছিল হাখামানিশ বা আকামেনিদ সাম্রাজ্য নামে। সেসময়ের মানচিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়—পারস্য সাম্রাজ্যের সীমানা বিস্তৃত ছিল পূবে ভারতের পাঞ্জাবের বিপাশা নদীর তীর, উত্তরে মধ্য-এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল এবং দক্ষিণে আরব উপদ্বীপের উপকূল পর্যন্ত।
এই সাম্রাজ্যের পশ্চিমে ছিল ইউরোপের গ্রিস-বুলগেরিয়া-রোমানিয়া ও ইউক্রেনের কৃষ্ণসাগর-ঘেঁষা এলাকা এবং 'আফ্রিকার শিং' সোমালিয়া, জিবুতি ও ইথিওপিয়া এবং লোহিতসাগর-ঘেঁষা সুদান ও মিশর হয়ে লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলে ভূমধ্যসাগর উপকূল পর্যন্ত।
এই পারস্য সাম্রাজ্যের ভেতরে ছিল আজকের আফ্রিকার ৭ দেশ—সোমালিয়া, জিবুতি, ইরিত্রিয়া, ইথিওপিয়া, সুদান, মিশর ও লিবিয়া; ইউরোপের ৭ দেশ—সাইপ্রাস, গ্রিস, উত্তর মেসিডোনিয়া, বুলগেরিয়া, রোমানিয়া, ইউক্রেন, ও রাশিয়া এবং এশিয়ার ২৬ দেশ—তুরস্ক, জর্জিয়া, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, ইরান, ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, জর্ডান, ফিলিস্তিন, ইসরায়েল, সৌদি আরব, ওমান, আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, কাজাখস্তান, উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, তাজিকিস্তান, কিরঘিজিস্তান, চীন ও ভারত।
অর্থাৎ, আধুনিক যুগের ৪০ দেশ প্রাচীনকালের পারস্য সাম্রাজ্যের অংশ হয়েছিল। তাই ইতিহাসের অনেক পাঠক পারস্য সাম্রাজ্যকে বিশ্বের প্রথম 'পরাশক্তি' হিসেবে দেখেন।
মোটা দাগে ইরানের রাজনৈতিক ইতিহাস খ্রিষ্টপূর্ব ৫৫৯ সাল থেকে ধরা হয়। সেই হিসাবে ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের আগ পর্যন্ত তথা প্রায় ২,৫০০ বছর সেখানে রাজতন্ত্র ছিল। তাই সেসময় গণঅভ্যুত্থানে পারস্য-রাজ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির পতনকে ২,৫০০ বছরের রাজতন্ত্রের পতন হিসেবে দেখা হয়।
এক বাক্যে বলা যায়—খ্রিষ্টপূর্ব ৫৫৯ সালের পারস্য সম্রাট প্রথম সাইরাস থেকে শুরু করে ১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দের শেষ শাহ (সম্রাট) মোহাম্মদ রেজা পাহলভি পর্যন্ত ইরানের বহু শাসক দুনিয়াজুড়ে আলোচিত হয়েছেন।
এরমধ্যে, খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩০ সালে গ্রিক বীর হিসেবে জগৎ-খ্যাত মেসিডোনিয়ার রাজা আলেক্সান্ডার দ্য গ্রেটের হাতে পারসিক সম্রাট তৃতীয় দারিয়ুসের পতন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এর ৭ বছর পর বেবিলনে মহাবীর আলেক্সান্ডারের মৃত্যুর পর পারস্য সম্রাটদের উত্থান ও বিস্তার ইতিহাসের পাঠকের কাছে আজো বেশ আকর্ষণীয়।
১৯৭১ সালে ইরান সরকার সাইরাসের ক্ষমতায় আসার ২,৫০০ বছর পূর্তিতে জাঁকজমক অনুষ্ঠান করেছিল।
বিশ্ব সভ্যতায় ইরানের অবদান
ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থগুলোয় বেশ কয়েকজন ইরানি সম্রাটের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে সাইরাস দ্য গ্রেট ও দারিয়ুস দ্য গ্রেটের নাম উল্লেখযোগ্য। প্রাচীন ইরানের স্থাপত্য নিদর্শন এইসব মহান শাসকদের হাতে গড়ে উঠেছিল।
মধ্যযুগে 'নেপোলিয়ন অব পার্সিয়া' উপাধিপ্রাপ্ত শাসক নাদির শাহ তার অনন্য সামরিক কৌশলের জন্য ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছেন। ১৭৩৬ সাল থেকে ১৭৪৭ সালের মধ্যে তিনি ইরানকে নতুন উচ্চতায় তুলেছিলেন। সর্বশেষ, ইমাম খোমেনি ইরানের রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে সারা পৃথিবীতে আলোড়ন সৃষ্টি করেন।
ইরানের মাটিতে অনেক নামজাদা মানুষের জন্ম। বিজ্ঞানচর্চায় ইবনে সিনা, আল-বিরুনি, কাব্য-দর্শনে ফেরদৌসি, ফরিদ উদ্দিন আত্তার, জালালুদ্দিন রুমি, ওমর খৈয়াম, সাদি শিরাজি, আল-গাজালি ও হাফিজ শিরাজি এবং বিপ্লব-পরবর্তী ইরানে 'দ্য টেস্ট অব চেরি'-খ্যাত চলচ্চিত্রকার আব্বাস কিয়ারোস্তমির কথা বলা যেতে পারে।
কবি হাফিজ শিরাজির প্রভাব এতটাই ছিল যে বাংলার সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহ (রাজত্ব: ১৩৯০–১৪১১) ইরানি কবিকে চিঠি লিখে তার রাজধানী সোনারগাঁও আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। বয়স-ভারাক্রান্ত কবি আমন্ত্রণ রক্ষা করতে না পারায় দুঃখ প্রকাশ করে সুলতানকে একটি কবিতা লিখে পাঠিয়েছিলেন।
এ কথা সবাই জানেন যে, ইরানের ফারসি ভাষাকে বাংলায় মুসলিম শাসকরা রাজ-ভাষার মর্যাদা দিয়েছিলেন। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ তথা ব্রিটিশ উপনিবেশবিরোধী প্রথম স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় পর্যন্ত ফারসি এদেশের তথা ভারতীয় উপমহাদেশের সরকারি ভাষা ছিল।
শিল্প ও স্থাপত্যকলায় ইরানের খ্যাতি সুবিদিত। ১৫০১ সাল থেকে ১৭৩৬ সাল পর্যন্ত ইরানে সাফাভি রাজবংশের শাসনামলে দেশটির মধ্যাঞ্চলীয় শহর ইসফাহন মুসলিম বিশ্বের জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রবিন্দু হয়েছিল। এই শহরের বিশাল মসজিদ-মাদরাসা, প্রাসাদ, সরকারি ভবন, বাজার ইত্যাদি দেখতে প্রতিবছর বিশ্বের লাখো পর্যটক ভিড় করেন।
শুধু ঐতিহাসিকই নয়, ইরানের আছে প্রাগৈতিহাসিক ঐতিহ্যও। ২০২৫ সালের ১৫ জুলাই, লন্ডনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইরান ইন্টারন্যাশনালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের খোররমাবাদ উপত্যকা ইউনেস্কোর বিশ্ব-ঐতিহ্যের তালিকায় উঠেছে। প্রায় ৬৩ হাজার বছর আগে এই উপত্যকায় মানুষের উপস্থিতি ছিল। এটি ইরানে ২৯তম ইউনেস্কো বিশ্ব-ঐতিহ্য সাইট বলেও প্রতিবেদনে জানানো হয়।
প্রতিবেদন অনুসারে, ইরানের দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলীয় লরেস্তঁ প্রদেশে খোররমাবাদ উপত্যকা ছাড়াও সেখানে ৫ হাজারের বেশি প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকা আছে। এরমধ্যে ২,৬০০ শ-র বেশি এলাকা ইরান সরকার তালিকাবদ্ধ করেছে।
ইরানের ৩ হাজার বছরের বেশি পুরোনা নওরোজ বা নববর্ষের উৎসব অন্তত ১৮টি দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে উদযাপন করা হয়। ইরানের রাষ্ট্রভাষা ফারসির দুটি ভিন্ন রূপ—'দারি' প্রতিবেশী আফগানিস্তান ও 'তাজিক' প্রতিবেশী তাজিকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।
বহু ফারসি শব্দ এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার ভাষাগুলোয় প্রতিদিন ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলায় ব্যবহৃত খোদা, পয়গম্বর, নামাজ, রোজা ইত্যাদি হাজারো শব্দ ইরানের ফারসি ভাষা থেকে এসেছে।
ইরানের সাহিত্য-সংগীত, বাদ্যযন্ত্র, স্থাপত্য ও চিত্রকলার প্রভাব দেশটির তিন পাশের তিন মহাদেশকে সমৃদ্ধ করেছে। যেমন—ক্যালিগ্রাফি, মিনিয়েচার আর্ট, সুফি গান ও পোশাক এবং দিল্লির লালকিল্লা ও আগ্রার তাজমহলের কথা বলা যেতে পারে।
বলা বাহুল্য, ইরানের জাফরান ও গালিচা (কার্পেট) আজো দুনিয়াজুড়ে আভিজাত্যের প্রতীক।
প্রাকৃতিক-সম্পদে সমৃদ্ধ ইরান
প্রকৃতিও ইরানকে সম্পদ দিয়েছে উজাড় করে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর ইরানে একদিকে যেমন আছে মানবসৃষ্ট অনিন্দ্যসুন্দর অবকাঠামো তেমনি আছে খনিজপণ্য। তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংস্থা ওপেক-এর তথ্য মতে, পেট্রোলিয়াম ছাড়াও ইরানে প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা, ক্রোমিয়াম, তামা, আকরিক লোহা, সীসা, ম্যাঙ্গানিজ, জিঙ্ক ও সালফারের খনি আছে।
প্রায় ১৬ লাখ ৪৮ হাজার ১৯৫ বর্গ কিলোমিটারের দেশ ইরানের জনসংখ্যা ৮ কোটি ৬০ লাখের বেশি। দেশটি বাংলাদেশের প্রায় ১১ গুণ বড়।
গত ৫ জানুয়ারি দুবাইভিত্তিক সংবাদমাধ্যম গালফ নিউজ জানায়—মজুত খনিজ তেলের দিক থেকে ভেনেজুয়েলা ও সৌদি আরবের পর ইরানের অবস্থান। ২০২৫ সালের ৬ অক্টোবর বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, রাশিয়ার পর ইরানে আছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত।
এত সম্পদের পরও ইরানের নাগরিকদের অর্থনৈতিক সংকট বেড়ে যাওয়ায় সেখানে চলছে শাসকবিরোধী বিক্ষোভ। সেখানকার অর্থনীতি ভেঙে পড়ার খবর প্রতিনিয়ত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোয় প্রচারিত হচ্ছে। প্রতিবেদনগুলোয় বলা হচ্ছে—সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করছেন বিক্ষোভকারীরা। আর সরকার গণমানুষের আন্দোলনকে দমন করছে 'বিদেশি ষড়যন্ত্রের' কথা বলে। তবে, প্রাচীন পারস্য সাম্রাজ্যের গর্বিত উত্তরাধিকার ইরানকে কোনো অপশাসন বা বিদেশি আগ্রাসন দিয়ে বেশিদিন দমিয়ে রাখা যায় না এর সাক্ষী খোদ ইরানের ইতিহাস।
ট্রাম্পের হুমকি
আর এই সভ্যতাকে ধ্বংস করার হুমকি দিয়ে মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘আজ রাতে গোটা একটি সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে, যা আর কখনো ফিরে আসবে না।’
তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হাসান আহমাদিয়ান আল জাজিরাকে বলেন, ইরানের একটি ‘পুরো সভ্যতা’ ধ্বংস করে দেয়ার মার্কিন প্রেসিডেন্টের সবশেষ হুমকি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে তিনি ইরানের ওপর ‘আরও রাগান্বিত ও হতাশ’ হয়ে পড়েছেন।