আল জাজিরাকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে রুবিও বলেন, ইরানকে তাদের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পুরোপুরি ত্যাগ করতে হবে। তিনি ন্যাটো মিত্রদের অসহযোগিতায় ক্ষোভ প্রকাশ করে সামরিক জোটের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
ইরানের সঙ্গে আলোচনা চলছে
তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ না থাকলেও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আলোচনা সচল রয়েছে। রুবিও বলেন, “ইরানের ভেতরকার কিছু পক্ষ এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান হচ্ছে, যা মূলত মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।”
রুবিও দাবি করেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযান দ্রুত এগোচ্ছে। ইতিমধ্যে ইরানের বিমান ও নৌবাহিনীর বড় অংশ ধ্বংস করা হয়েছে। এখন মূল লক্ষ্য হলো ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং ড্রোন তৈরির কারখানাগুলো নিশ্চিহ্ন করা, যা নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দ্রুত এগোচ্ছে।
তিনি আরও জানিয়েছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট সবসময় আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজাকে অগ্রাধিকার দেন। তবে একই সময়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে দ্রুত যুদ্ধবিরতি না হলে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো নিশ্চিহ্ন করা হবে।
ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বন্ধের দাবি
রুবিও স্পষ্ট করেছেন, ইরানকে তাদের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করতে হবে এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ানো ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎপাদন বন্ধ করতে হবে। তিনি বলেন, “ইরানি শাসনব্যবস্থাকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক হতে দেওয়া যাবে না।”
রুবিওর মতে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের জন্য একটি সরাসরি হুমকি। তিনি বলেছেন, “ইরান যেসব স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়ছে, সেগুলোর একমাত্র উদ্দেশ্য হলো সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত এবং বাহরাইনকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো।”
তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, ইরান চাইলে বেসামরিক কাজে পারমাণবিক শক্তি উৎপাদন করতে পারে, কিন্তু এমন কোনো ব্যবস্থা রাখা যাবে না যা দিয়ে দ্রুত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি সম্ভব। “তাদের সব ধরনের অস্ত্র কর্মসূচি এবং পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করতে হবে,” বলেছেন রুবিও।
বিপরীত যুক্তি: তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্লেষণ
তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক হাসান আহমাদিয়ান ইরানকে আক্রমণাত্মক হুমকি হিসেবে উপস্থাপনের প্রচেষ্টাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। তিনি বলেন, “গত তিন শতাব্দীতে ইরান শেষ কবে প্রতিবেশীদের আক্রমণ করেছে?”
রুবিও জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরান ইস্যুতে ‘দ্বিমুখী নীতি’ অনুসরণ করছে। একদিকে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে কূটনৈতিক আলোচনার পথ খোলা রাখা হচ্ছে, অন্যদিকে ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো নিশ্চিহ্ন করার হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন।
মাসের প্রয়োজন নেই, কয়েক সপ্তাহেই লক্ষ্য অর্জন
রুবিও জানিয়েছেন, মার্কিন সামরিক অভিযান দ্রুত এগোচ্ছে। “প্রথম লক্ষ্য ছিল ইরানের বিমান বাহিনী ধ্বংস করা, যা সম্পন্ন হয়েছে। দ্বিতীয় লক্ষ্য ছিল নৌবাহিনী, যার বড় অংশই অর্জিত হয়েছে। এখন মূল লক্ষ্য ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ও ড্রোন তৈরির কারখানাগুলো ধ্বংস করা। আমাদের নির্ধারিত সময়ের চেয়ে এগোচ্ছে, এটি কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সম্ভব।”
মোজতবা খামেনির অবস্থান নিয়ে ধোঁয়াশা
রুবিও বলেন, ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির বর্তমান অবস্থান অস্পষ্ট। “আমরা জানি না তিনি আদৌ ক্ষমতায় আছেন কি না। বলা হচ্ছে তিনি ক্ষমতায়, কিন্তু কেউ তাকে দেখেনি বা কোনো বক্তব্য শোনা যায়নি।”
শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন নয়, তবে রাজনৈতিক পরিবর্তন স্বাগত
রুবিও জানিয়েছেন, বর্তমান সামরিক অভিযানের আনুষ্ঠানিক লক্ষ্য রেজিম চেঞ্জ নয়। তবে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, যদি ইরান রাজনৈতিক পরিবর্তনের দিকে যায় তবে যুক্তরাষ্ট্র তা স্বাগত জানাবে।
তিনি বলেন, “ইরানিরা কি বর্তমান ধর্মীয় শাসনের চেয়ে ভালো নেতৃত্ব পাওয়ার যোগ্য? একশভাগ যোগ্য। নেতৃত্বের পরিবর্তন হলে আমরা ব্যথিত হব না। রাজনৈতিক পরিবর্তন সহজ করতে যুক্তরাষ্ট্র অংশ নিতে আগ্রহী।”
ন্যাটো মিত্রদের সমালোচনা ও জোট পুনর্বিবেচনা
রুবিও উল্লেখ করেছেন, যুদ্ধের সময় কিছু ন্যাটো সদস্য দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে আকাশপথ এবং সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করতে বাধা দিয়েছে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, যদি বিপদের সময়ে মিত্ররা সহযোগিতা না করে, তবে যুদ্ধ শেষে জোটের কার্যকারিতা পুনঃমূল্যায়ন হবে।
রুবিও বলেন, “স্পেনের মতো দেশগুলো আমাদের আকাশপথ ব্যবহার করতে দিচ্ছে না এবং নিজেদের ঘাঁটিও ব্যবহার করতে দিচ্ছে না। এতে প্রশ্ন আসে— এই জোট থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাপ্তি কী?”
রুবিও আরও যোগ করেন, “ন্যাটো যদি কেবল ইউরোপকে রক্ষা করার ব্যবস্থা হয়, কিন্তু প্রয়োজনের সময়ে ঘাঁটি ব্যবহার করার অনুমতি না দেয়, তবে এটি ভালো কোনো বন্দোবস্ত নয়।”
সূত্র: আল-জাজিরা